গেছে কোথায়? ধীর গলা ধরে।
আমেরিকায়। উত্তর ভার্নমেন্টে। ক্যানাডিয়ান বর্ডারের ধারে কাছেই। একো হ্রদ বলে একটা জায়গা আছে। চারপাশে পাহাড়, মাঝে লেক। লোকজন আসার বালাই নেই। মোটা টাকায় হ্যামারস্টাইন সেই জায়গায়টা ভাড়া নিয়েছে।
খবরটা পেলেন কার কাছে।
এডগার হুভারকে কেস রিপোর্ট পাঠিয়েছিলাম। হুভার একে চেনে। মিয়ামি থেকে ক্যাসট্রো পর্যন্ত গুলিগোলার বহরে ও ব্যতিব্যস্ত। মার্কিন মুলুকের লুঠতরাজি টাকার স্রোতহ্যাভানায় জুয়া আর নাচের আড্ডায় আসবার পর থেকেই হাভানা নিয়ে টনক নড়েছে হুভারের। ওর কাছেই খবর পেলাম, হ্যাঁমারস্টাইন ছ মাসের ভিসা নিয়ে আমেরিকায় এসেছে। হুভারের খুব উৎসাহ ওকে জ্যামাইকায় চালান দেওয়ার। আমি এখানকার অ্যাটনী জেনারেলের সঙ্গে কথা বলে দেখলাম, হ্যাঁভানা থেকে সাক্ষী না আসা পর্যন্ত ওকে জ্যামাইকায় পাঠানো যাবে না। হ্যাভানা থেকেও কেউই আসবে না। হুভার ওর ভিসা বাতিল করতে চাইলে আমি রাজি হইনি পাহাড় অঞ্চলের কমিশনারকে ধরতে উনি একটা টহলদারী প্লেন পাঠিয়ে দিলেন একো লেক অঞ্চলের সীমানা বরাবর। প্লেন যা দেখবার সব দেখে এসেছে। অন্যান্য সাহায্যও ওঁর কাছে পাওয়া যাবে। এবার ভাবছি, কি করব। সে ভাবনা তো আমারই।
এতক্ষণে বন্ড বুঝল, কেন M এত উদ্বিগ্ন, কেন উনি মীমাংসায় পৌঁছোনোর ভারটা নিজের কাঁধে না রেখে অন্যের কাঁধে রাখতে চান। নিহত ব্যক্তিরা M-এর বন্ধু। হত্যাকারীর নামও জানেন M, এক্ষেত্রে খুনীর বিচারের ভার তিনি নিতে পারেন না। কোন বিচারকই নিতে পারেন না। পরিস্থিতিতে রায় দিতে হবে এমন একজনকে, যে হ্যাভলকদের চেনে না, হামারস্টাইনকে জানে না।
বন্ডই সেই ব্যক্তি। M চাইছেন বন্ড রায় দিক। দণ্ডের ভারও নিজের হাতে তুলে নিক। হ্যাঁমারস্টাইন জংলী আইন প্রয়োগ করেছিল নিরীহ অসহায় দুটি বয়োবৃদ্ধ মানুষের ওপর। এ অপরাধের সমুচিত শাস্তির বিধান একমাত্র জংলী আইনেই আছে। প্রতিহিংসা চিরকালেই প্রতিহিংসা–সেখানে মায়া-দয়া নেই।
বন্ড বলল, স্যারনির্দ্বিধায় বলছি, রক্তের বদলে রক্ত চাই। বিদেশী গুপ্তাদের শায়েস্তা করতে হলে ইংলিশ দাওয়াইয়ের চাইতে মিষ্টি মধুর আর কিছু নেই।
চেয়ে রইলেন M। উৎসাহ বা মন্তব্য–কোনটাই ধ্বনিত হল না নীরব কণ্ঠে।
বন্ড বলল, ফাঁসি নয়, এদের খুন করা দরকার।
বন্ডের দিকে আর তাকালেন না M। ক্ষণেকের জন্য শূন্য দৃষ্টি যেন ধাবিত হল অন্তরের অন্দর। এরপর হাত বাড়ালেন ওপরের ড্রয়ারের ভেতরে। বেরুল একটা পাতলা ফাইল। ওপরে যথাবিধি কিছুই লেখা নেই। অত্যন্ত গোপনীয় ফাইলের পরিচিত চিহ্ন সেই লাল তারাও নেই।
এইবার বেরুল একটা রাবার স্ট্যাম্প আর প্যাড। প্যাডেস্ট্যাম্প টিপে ফাইলের কোণে ছাপ দিলেন M। তারপর ফাইল এগিয়ে দিলেন ভের দিকে।
জ্বলজ্বল করতে লাগল রক্ত রাঙা স্যানসেরিফ টাইল।
ফর ইওর আইজ অনলি, অর্থাৎ, একান্ত গোপনীয়।
কথা বললে না বন্ড। নীরবে সায় দিল। ফাইল তুলে নিয়ে মার্জার চরণে নিষ্ক্রান্ত হল ঘর থেকে। দুদিন পরে শুক্রবারের কমেট প্লেনে ময়ট্রিয়ন পৌঁছাল জেমস্ বন্ড। কমেটে আকাশে উড়তে মোটেই ভাল লাগে না বন্ডের। বড় উঁচুতে ওড়ে, ছোটেও শব্দের আগে, যাত্রীও একগাদা। আহারে, মান্ধাতা আমলের স্ট্রাটোক্রুজারের, সে-সব দিন কি আর আসবে। আটলান্টিক পেরোতেই লাগত দশ ঘন্টা। ডিনার খেয়ে টেনে ঘন্টা সাতেক নাক ডাকানো যেত বাকে। পশ্চিম দিগন্তের সোনালি আলোয় কেবিন ভরে উঠলে ধীরে-সুস্থে নেমে এসে বি.ও.এ.সি. মার্কা পেঁইয়া সকালের নাস্তা খাওয়ার সে মজা এখন আর নেই। এখানে সব কিছুই যেন পলক ফেলতে না ফেলতে ঘটে যায়। মাত্র ঘণ্টা দুয়েকের দুলুনি। আট ঘণ্টায় লন্ডন থেকে মনট্রয়ল।
মনট্রিয়লে নেমে প্লিমাউথ সেলুন হাঁকিয়ে রয়্যাল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশের সদর অফিসে পৌঁছাল বন্ড। জায়গাটার নাম ওটাওয়া। ধূসর রঙের পেল্লায় ইমারতের ভেতরে ঢুকে কমিশনারের সঙ্গে দেখা করতে চাইল। নিজের নাম বলল শুধু জেমস্। M-এর নির্দেশ ছিল তাই। একটা ছোকরা করপোর্যাল ওকে নিয়ে গেল চারতলায়। একগাল। আসবাবপত্রে ঠাসা একটি ঘরে একজন সার্জেন্টের হাতে ওকে সঁপে দিয়ে বিদায় নিল। সার্জেন্ট কার সঙ্গে যেন ইন্টারকমে কথা বলে নিল। তারপর মিনিট দশেক প্রতীক্ষা। অবশেষে ডাক পড়ল যে ঘরে, সে ঘরে ঢুকতেই জানালার সামনে থেকে ঘুরে দাঁড়াল নীলরঙা স্যুট পরা দীর্ঘকায় এক পুরুষ। দেখে বয়স বেশি মনে হয় না। পাতলা হেসে বলল, মিটার জেমস? আমার নাম কর্নেল…ধরুন, কর্নেল জল।
করমর্দনের পর কর্নেল বলল, আপনাকে স্বাগত জানাতে কমিশনার নিজে হাজির থাকতে পারলেন না বলে উনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন। সর্দিতে কাহিল হয়ে পড়েছেন ভদ্রলোক, কি ধরনের সর্দি বুঝতেই পারছেন, কৌতুক উজ্জ্বলিত চক্ষু কর্নেলের। কূটনৈতিক ঠাট বজায় রাখতে এমনি সর্দি সকলেরই হয়। ওঁর আদেশে আপনার সেবায় আমি রইলাম। সারাদিনটা যা বলবেন, তাই করব। বুঝলেন?
বড় বুঝল। হাড়ে-হাড়ে বুঝল। কমিশনার সব সাহায্যই দেবেন–কিন্তু দানা পরে। আঙুলের ছাপ কোথাও পড়বে না–অথচ কাজ হাসিল হয়ে যাবে। সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না। হুঁশিয়ার হল বন্ড।
