ছোট্ট স্পোর্টস গাড়ির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সশব্দে মোড় ফিরছে গাড়িটা। মিসেস হ্যাভলক বেঁচে থাকলে এখুনি চেঁচিয়ে উঠতেন– জুড়ি অনেকবার বলেছি ওভাবে মোড় ঘুরিসনি। বড় কাঁকর ছিটকোয়। ঘাসকাটা মেশিনের দফারফা হচ্ছে শুধু তোর জন্যই।
***
একমাস পরের ঘটনা। লন্ডন শহর। অক্টোবর মাস। শীতের সবে শুরু। রিজেন্ট পার্কে ঘাসকাটা চলছে। শব্দ ভেসে আসছে M এর অফিসঘরের খোলা জানালা দিয়ে। ঘাস কাটার এ যন্ত্র মোটরে চলে। জেমস্ বন্ড তাই ভাবছিল সাবেকী আমলের মেশিনের ট্যাং ট্যাং লোহার আওয়াজ বুঝি বিদায় নিচ্ছে ধরিত্রীর শব্দ জগৎ থেকে।
বন্ডের নানা ভাবনার মধ্যে M কাজের কথায় এসেও আসতে পারছেন না। বন্ড জানিয়েছিল, হাতে কাজ নেই। তাই খুশি মনে কাজ প্রত্যাশা করছিল। অফিস টাইমে ডিউটিতে থাকার সময়ে M কখনো নাম ধরে ডাকেন না। তখন জেমস্ বন্ডের নাম 007। কিন্তু আজ সে নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেছে। M বন্ডকে নাম ধরে ডেকেছেন। হয়ত ব্যক্তিগত কিছু, হয়ত হুকুম নয় অনুরোধ করবেন M। বন্ড নিজেও লক্ষ্য করল, M-এর সাংঘাতিক স্বচ্ছ, তুহিন শীতল চোখের আকাশে একটা উদ্বেগ ভাসছে।
চেয়ার ঘুরিয়ে বসলেন M। দেশলাইয়ের বাক্স জোরে টেবিলে নিক্ষেপ করলেন। লাল চামড়ার ওপর দিয়ে হড়কে এল বন্ডের সামনে। বন্ড খপ করে ধরে ফের ফিরিয়ে দিল টেবিলের মাঝে। M হেসে বললেন, জেমস, আমাদের সকলেই জানে কার কি কাজ, তাই না? কিন্তু আমি বড় একা।
ভুরু কুচকে বন্ড বলল, বুঝেছি, অ্যাডমিরালকে হুকুম দিয়ে হয়। তাই তিনি একা। বাকি সবাই শুধু হুকুম তামিল করেই খালাস।
পাইপ নামালেন M গোড়ায় একজনকে মজবুত হতেই হবে। সে শুধু ঠিক করবে এবার কি করণীয়। চল্লিশের পর মজবুত থাকা যায় না। তখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার অনেকে ভগবানের কাঁধে চাপিয়ে নিশ্চিন্ত। কষ্ট পায়, ট্র্যাজেডি : ঘটে। অসুখে ভোগে। জেমস, বিপজ্জনক সে বয়স এখনো তোমার আসেনি। তুমি এখনো দেহে এবং মনে মজবুত। সে হিসেব জানা আছে।
প্রশ্নটা নেহাতই ব্যক্তিগত, মোটেই পছন্দ হল না বন্ডের। বউ নেই, ছেলেপুলেও নেই। ট্র্যাজেডি কি জিনিস সে জানে না। কোন অসুখ বিসুখও কখনো হয়নি। তাই দ্বিধা জড়িত কণ্ঠে, ইয়ে ব্যাপারটা কি জানেন, কাজ যাই হোক না কেন, কারণটা যদি ন্যায্য হয়, তাহলে যে কোন শক্ত অবস্থায় খাড়া থাকবার ক্ষমতা আমার আছে।
দেখলে তো, অধীর কণ্ঠ M-এর, তুমিও আমার হুকুমের প্রত্যাশায় বসে, আমি যা বলব, তার এক পাও বাইরে যাবে না। আমাকেই ভাবতে হবে কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায়। বলে সামলে নিলেন নিজেকে, কি আর করা যায়। আমার চাকরিই তো তাই।
M-এর জন্য দুঃখ হল বন্ডের। এই প্রথম M-কে ভেঙে পড়তে দেখল সে। নিশ্চয় M এবার নিজেই কোন ঝামেলায় পড়েছেন। কিন্তু কিসের ঝামেলা? বন্ড শুধাল–স্যার, আমাকে দিয়ে কিছু হবে কি?
বন্ডের দিকে বারেক তাকিয়ে চেয়ার জানলার দিকে ঘুরিয়ে M বললেন, হ্যাভলকের কথা মনে পড়ে কি?
কাগজে পড়েছিলাম। জ্যামাইকার প্রধান দম্পতি। একরাত্রে মেয়ে বাড়ি ফিরে দেখল দুজনেই গুলিতে ঝাঁঝরা। খুব সম্ভব আততায়ীরা হ্যাঁভানার গুণ্ডা। সংসারে দেখাশুনা করে যে মেয়েটি, সে বলেছিল, তিনটে কিউবার মত দেখতে লোক এসেছিল। গাড়িটা চোরাই গাড়ি। সেই রাতেই বন্দর থেকে একটা বজরা প্যাটানের জাহাজের রওনা হয়েছিল। স্যার, আর জানি না। এ কেস আমার কাছে পাঠানো হয়নি।
না পাঠানোর কারণ ছিল। কেসটা আমার ব্যক্তিগত এখতিয়ারের। তাই কারো হুকুম ছিল না এ নিয়ে ঘামানোর। হ্যাভলক দম্পতি আমার স্থানীয় বন্ধু। ওদের বিয়েতে আমি বেটাম্যান ছিলাম। ১৯২৫ সালে মাল্টায় বিয়ে করেছিল ওরা।
অ।
হ্যাভলকরা লোক ভাল। স্টেশন সি-কে বলেছিলাম একটু চোখ রাখতে। কিন্তু ব্যাটিসটার স্যাঙাতদের টিকিও ছুঁতে পারল না। অথচ ক্যাসট্রো এখনো রয়েছে। ক্যাসট্রোর গুপ্তচরে তো সরকারী দপ্তর ছেয়ে গেছে। হ্যাভলকদের খুন করিয়েছে ভন হ্যাঁমারস্টাইন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষে জাল ছিঁড়ে যে কটা নাৎসী গা ঢাকা দিয়েছিল, অন হ্যাঁমারস্টাইন তাদের অন্যতম। লোকটা আগে ছিল হিটলারের গুপ্ত পুলিশ গেস্টাপোতে। ব্যাটিসটার চাকরিতে বহাল হয়ে হ্যাঁমারস্টাইন মন দিয়ে কাজ করেছে। অর্থাৎ চর-চক্ৰ উৎখাত। ব্ল্যাকমেল করে অনেক টাকাও জমিয়েছে। বেশ জমিয়ে বসেছিল। কিন্তু ক্যাসট্রোর জয় জয়কারে আসন টলছে। সবার আগে চম্পট দেওয়ার প্ল্যান করল হ্যাঁমারস্টাইন। কিউবার বাইরে টাকা পাঠাতে লাগল। জমিজমা কেনার ভার রইল গোনজালিস নামে এক অফিসারের ওপর। দু-দুটো খুনে স্যাঙাৎ অষ্টপ্রহর আগলে বেড়ায় গোনজালিসকে। গোনজালিসের কাজই হল সব চাইতে ভাল সম্পত্তি চড়া দামে কেনা। হ্যাঁমারস্টাইনের টাকার অভাব নেই, আর কুবুদ্ধিরও অভাব নেই। তাই টাকার প্রলোভনে ব্যর্থ হলে, গোনজালিস খোকাখুকুদের গায়েব করেছে। বিঘের পর বিঘে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। জ্যামাইকার অন্যতম সেরা সম্পত্তির মালিক হ্যাভলক দম্পতি। গোনজালিস সেখানে এসেছিল। হ্যাঁমারস্টাইনের হুকুম ছিল, মিষ্টি কথায় বেচতে না চাইলে যেন হ্যাভলকদের পরপারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তাদের পঁচিশ বছরের মেয়ের ওপর চাপ দেওয়া হয়েছে। তারপর যা হবার হয়েছে। সপ্তাহ দুয়েক আগে কুকীর্তির জন্য হ্যাঁমারস্টাইনকে বরখাস্ত করেছে ব্যাটিসটা। গোনজালিস হ্যাভলকদের রক্তে হাত রাঙিয়ে হাওয়া হয়েছে। সেই থেকে হ্যাঁমারস্টাইনও উধাও সঙ্গে তিন চ্যালা। ভাল সময়েই গেছে। কেননা ক্যাসত্ৰেী এল বলে।
