ধীর গলায় কর্নেল বললেন, বুঝলাম। আপনার সময় নষ্ট হচ্ছে সে জন্য দুঃখিত। আমার জীবদ্দশায় কনটেন্ট বিক্রি হবে না। এখন আসতে পারেন। আমাদের আবার তাড়াতাড়ি ডিনার খাওয়ার অভ্যাস। এদিক দিয়ে যান। কাজেই গাড়ি পাবেন। চলুন, দেখিয়ে দিচ্ছি।
মেজর গোনজালিসের দেতো হাসিতেও এবার বুঝি একটা দাঁত কম দেখা গেল। দুই চোখে হুশিয়ার দৃষ্টি। দাঁড়ান, মশাই, দাঁড়ান, বলেই সংক্ষিপ্ত হুকুম দিল, আর কাটা কাটা হুকুমের সঙ্গে সঙ্গে খসে গেল খুশির মুখোশ। অস্বস্তি বোধ করে মিসেস হ্যাভলক আরও সরে দাঁড়ালেন স্বামীর পাশে।
লোক দুটো নীল রঙা প্যান-আমেরিকান থলি তুলে এগিয়ে এল সামনে। হাত বাড়াল মেজর গোনজালিস। একে একে টান পড়ল জীপার চেনে। সঙ্গে সঙ্গে হাঁ হল থলির মুখ। দুটো ব্যাগই মার্কিন ডলারে ঠাসা। আবার দু হাত দু পাশে ছড়িয়ে মেজর–একশ ডলারের নোট। আসল, জাল নয়। পাঁচ লক্ষ ডলার। আপনাদের টাকার হিসেবে অবশ্য এক লক্ষ আশি হাজার পাউন্ড। কর্নেল, দুনিয়ায় আস্তানা বাধবার ভাল জায়গার অভাব নেই। আমার বন্ধু মনে করলে আরও বিশ হাজার পাউন্ড জুড়ে দু লাখ পাউন্ড দিতে পারেন। এক সপ্তাহের মধ্যে জানাবেন কি করবেন। দলিল পত্র তো নেই, শুধু এক তা কাগজে আপনি সই করে দিন, বাকিটা আইনবিদরা করে নেবেন। আবার হাসি-রাজি তো? আপনি হ্যাঁ বললেই থলি দুটো রেখে বিদেয় হই। আপনিও ডিনার খেয়ে নিন।
আগের মত ক্রোধ আর বিতৃষ্ণা মিশানো চোখে বললেন, বেঁটে বন্ধু ছাড়া দুশমন। টাকা ঠাসা নোংরা দুটো থলি? টিমির সে কি রাগ! মুখের ওপর বলে দিল, বাপু হে, টাকা নিয়ে কেটে পড় চটপট।
মুখ নামিয়ে কর্নেল হ্যাভলক বললেন, ভেবেছিলাম কথায় ফাঁক রাখিনি। কোন দামেই এ সম্পত্তি বিক্রি হবার নয়। আমেরিকান ডলারের ওপর আর সবার মত আমার মোহ নেই। এখন বিদেয় হোন।
এবার মেজর গোনজালিস-এর হাসির হলকা উধাও হল। নরম গলায় বলল, কর্নেল, আপনার কথায় ফাঁক ছিল না, ছিল আমার কথায়। আমার বন্ধুর শেষ কথাটা এখনো বলা হয়নি। আপনি রাজি না হলে পরবর্তী পথ করতে যেন দ্বিধা না করি, এ নির্দেশ আছে আমার ওপর।
আচম্বিতে ভয় পেলেন মিসেস হ্যাভলক। কর্নেলের বাহুতে চাপ দিলেন সজোরে। কর্নেল বললেন, মেজর, আর হামলা করবেন না, যান। নাইলে পুলিশ ডাকতে বাধ্য হব।
গোলাপী জিভের ডগা দিয়ে ঠোঁট চেটে নিল, চোখে মুখে এখন কেবল নির্দয় নির্মমতা। বললে কর্কশ গলায়, আপনার জীবদ্দশায় তাহলে এ সম্পত্তি বিক্রি হবার নয়। কর্নেল, এই আপনার শেষ কথা? পেছনে দুই চেলার হাত পৌঁছাল খোলা শার্টের মধ্যে দিয়ে কোমরের কাছে। ধারাল পশব দুই চোখ নিবদ্ধ হল মেজরের তুড়ি দেওয়ার দুটি আঙুলের ওপর।
সভয়ে মুখে হাত রাখলেন মিসেস হ্যাভলক। যা বলতে গেলেন কিন্তু ঢোক গিললেন সশব্দে। এও কি সম্ভব নিজের বাড়িতেই খুন করার হুমকি! তাই কোন মতে বললেন, হ্যাঁ, এই আমার শেষ কথা।
মেজর বলল, তাহলে সম্পত্তির বদলে মালিকের সঙ্গেই কথা বলবেন আমার বন্ধু। মানে, এবার কথা হবে আপনার মেয়ের সঙ্গে।
সঙ্গে সঙ্গে তুড়ি ধ্বনি শোনা গেল দুই আঙুলে। সামনে থেকে সরে দাঁড়াল মেজর। গুলিবর্ষণের সুবিধের জন্য। দুই স্যাঙাতের ঝকঝকে শার্টের নিচ থেকে বেরিয়ে এল দুটো বাদামী রঙের বাদুরে হাত। কদাকার দর্শন শশার মত চেহারা, ধাতব নল দুটো থরথর করে কেঁপে, গর্জে উঠল। নিষ্প্রাণ দেহ দু টো মেঝেতে আছড়ে পড়ার পরেও স্তব্ধ হল না গুলি বর্ষণ।
অবশেষে হেঁট হল মেজর গোনজালিস। কোথায় কোথায় বুলেট বিঁধেছে পরখ করল। তারপর তিন ব্যক্তি ঢুকল গোলাপী-সাদা ড্রইংরুমে। সেখান থেকে কারুকাজ করা মেহগনি হলঘর। সবশেষে জমকালো সদর দরজা চৌকাঠ পেরিয়ে আর তাড়াহুড়ো করল না তিন মূর্তি। ধীরে ঘুরে উঠে বসল কালো রঙের ফোর্ড কনসাল সিজন গাড়িতে। নাম্বার প্লেট জ্যামাইকার। মেজর বসল চালকের আসনে। পেছনের আসনে দুই বন্ধুকধারী। জোড়া খুনের ঠিক বিশ মিনিট পরে পৌঁছাল বন্দরের বাইরে। চোরাই গাড়িটা লুকানো হল রাস্তার ধারে ঘাসের আড়ালে। সেখান থেকে স্পল্পালোকিত পথে সিকি মাইল হেঁটে তিন বাটুর পৌঁছাল জেটিতে। প্রতীক্ষমান স্পীড বোটের চালু ইঞ্চিন বুঁদ বুদ করে পানি কাটছিল। তিন মূর্তি ওঠে বসতেই জানা গেল এগুলো জলযান। অদূরে ভাসছিল পঞ্চাশ টন ওজনের ক্রিসক্র্যায়াট, জাহাজ। নোঙর আধতোলা। ওপরে উড়ছিল মার্কিন পতাকা। দু দুটো ঝকমকে আন্তেনার শিক দেখেই বোঝা যায় এ জাহাজ টুরিস্ট জাহাজ। এসেছে হয় কিংসটন নয় মন্টেগু বে থেকে। তিন বাটকুল ডেকে ওঠেতেই স্পীডবোটকে তুলে নেওয়া হল ওপরে। দুটো ক্যানো ঘুরপাক খাচ্ছিল জাহাজের আশে পাশে-ভিক্ষা চাইছে। মেজর একটা পঞ্চাশ সেন্ট ছুঁড়ে দিতেই ন্যাকড়া পরা লোক দুটো ক্যানো ছেড়ে ডুব মারল পানিতে মুদ্রার খোঁজে। গর গর করে উঠল ইঞ্জিন। শুরু হল যাত্রা। তীর থেকে জেলেরা দেখল রাজহাঁসের মত পানি কেটে এগিয়ে চলেছে টুরিস্ট জাহাজ। তর্ক বির্তক শুরু হল জাহাজের যাত্রীদের নিয়ে। নিশ্চয় কোন ফিল্মস্টার জ্যামাইকায় ছুটি কাটিয়ে দেশে ফিরছে।
কনটেন্টে র চওড়া বারান্দায় সূর্যের শেষকিরণ যেন থমকে দাঁড়াল রক্তের দাগের ওপর। একটা ডক্টর বার্ড রেলিং পেরিয়ে এসে মিসেস হ্যাভলকের নিস্পন্দ হৃদপিণ্ডের খুব কাছে কি যেন নিরীক্ষণ করল। পরক্ষণেই উড়ে গেল ঝোপে।
