আর ফেপ্রিন্স মেয়েটি এসেছে পোর্ট মেরিয়া থেকে। সাদা আর কালো চামড়ার মিলনে বর্ণসংকর। দেখতে বেশ ছিমছাম। ফেপ্রিন্স আগাথার কাছে কাজ শিখছে।
মিসেস হ্যাভলক বললেন–আগাথা, বোতল ভরা শুরু করা যাক। এ বছর পেয়ারা একটু আগেই উঠেছে দেখছি।
আজ্ঞে হ্যাঁ। কিন্তু বোতল যে আরো চাই।
কেন? গত বছরেই তো হেনরি থেকে সেরা বোতল দু ডজন এনে দিলাম।
আজ্ঞে হ্যাঁ। কিন্তু কিছু বোতল চুরমার হল এই সেদিন।
সেকি! কে ভাঙল?
তা তো জানি না, রূপার ট্রে নিয়ে মিসেস হ্যাভলকের মুখের ভাব দেখল আগাথা।
জ্যামাইকাতে ভাঙচুর যে হামেশাই ঘটে এবং নষ্টামির মূল যে চিরকালই নিপাত্তা থাকে, মিসেস হ্যাভলক তা জানেন। কাজেই কতা না বাড়িয়ে বললেন, যাক গে, যা যাবার গেছে। এবার কিংসটন গেলে আরো কয়েকটা বোতল এনে দেব।
আজ্ঞে হ্যাঁ বলেই উধাও হল বাড়ির ভেতর।
মিসেস হ্যাভলক এবার সেলাইয়ে মন দিলেন। চোখ রইল জাপানিজ হ্যাট আর মাংকি ফিডল –এর মস্ত ঝোঁপের দিকে। পুরুষ পাখি দুটো এসেছে। খানদানি কায়দায় ল্যাজ তুলে ফুলের ঝোঁপের এদিক ওদিক ঘুরছে। গাছের মগডালে বসে একটা পাখি সান্ধ্য-সংগীত শুরু করেছে।
পোর্টল্যান্ড-এর ব্লু মাউন্টেনের একেবারে পূর্ব অঞ্চলে ক্যানডল ফ্লাই পীক পাহাড়ের সানুদেশে বিশ হাজার একর জায়গা নিয়ে গড়ে উঠেছে এই কনটেন্ট। হ্যাভলক পরিবারে কনটেন্ট এসেছে পুরস্কার স্বরূপ। আদি হ্যাভলক। কনটেন্ট পুরস্কার পান অলিভার ক্রমওয়েলের কাছ থেকে। দ্বীপের যে কটা প্রাইভেট সম্পত্তি আছে, তার মধ্যে সব চাইতে সমৃদ্ধ হল কনটেন্ট। এত ভাল তত্ত্বাবধান কোথাও নেই। বাড়িটাও দো আঁসলা টাইপের। মেহগনি কাঠের থাম, পুরোনো পাথরের দোতলা বাড়ি। দু পাশে একতলা ছাউনি। জ্যামাইকার বিশেষ ধরনের চওড়া ঝোলানো ছাদ। রূপালি দেবদারুর পাতলা তক্তা দিয়ে ছাওয়া। ঢালু বাগান বারান্দার সামনেই। বাগান যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে বিশ মাইল ব্যাপী জঙ্গল। প্রান্তে সমুদ্র।
স্লীপার নামিয়ে কর্নেল হ্যাভলক বললেন, গাড়ির আওয়াজ শুনলাম মনে হচ্ছে।
মিসেস হ্যাভলক দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, পোর্ট অ্যানটোনিওর ফেডেরা এলে চটপট বিদেয় কর বাপু। ইংল্যান্ড নিয়ে ওদের নাকিকান্না আর সইতে পারি না। রাতের খাবার জুড়িয়ে হিম হয়ে গিয়েছিল মনে আছে? আমি যাই। আগাথাকে দিয়ে বলে পাঠাব মাথা ব্যথা করছে।
ড্রইংরুমের দরজায় আবির্ভূত হল আগাথা। গা ঘেঁষে এল আরও তিনটে লোক। ঝটিতি বলল আগাথা কিংসটন থেকে এসেছেন। কর্নেলকে দরকার।
পুরোধা ব্যক্তি আগাথাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে এল। মাথায় তখন পানামা টুপি। কিনারাটা যেন বড্ড বেশি দুমড়ে উঁচু করা। বাঁ হাত দিয়ে টুপি নামিয়ে পেটের কাছে রাখল লোকটা। এগিয়ে এল লোকটা। হাত বাড়িয়ে দিল কর্নেলের দিকে। বলল, আমি মেজর গোনজালিশ। আসছি হাভানা থেকে। কর্নেল, ধন্যবাদ গ্রহণ করুন।
উচ্চারণটা অদ্ভুত। জ্যামাইকার ট্যাক্সি ড্রাইভাররা যেমন কথা বলার আমেরিকান ঢং নকল করে, অনেকটা তেমনি। কর্নেল হ্যাভলক দাঁড়িয়ে মেজরের প্রসারিত হাত আলতো করে ছুঁলেন। দরজার দু পাশে দাঁড়ানো দুজনকে দেখলেন। দু জনেরই হাতে দুটো নতুন হোল্ডঅল। প্যান আমেরিকান বিমানযাত্রীরা যে ধরনের ব্যাগ রাত্রে ব্যবহার করে–অবিকল তাই। কর্নেলের চোখের সামনেই হোল্ড অল দুটো মেঝেতে নামিয়ে রাখল দেখে মনে হল দুটো ব্যাগেই গুরুভার কিছু রয়েছে। দুজনের মাথায় চ্যাটাল সাদা ক্যাপ। কপালে টানা চক্ষুন্ত্রাণ স্বচ্ছ আর সবুজ। পায়ে হলদেটে জুতা।
মেজর বলল, আমার দুই সেক্রেটারি।
পকেট থেকে পাইপ বার করলেন কর্নেল। তামাক ঠাসতে ঠাসতে চোখ রইল মেজর আর তার দুই সেক্রেটারির ওপর। মেজরের চোখা চোখা পোশাক। ঝকঝকে জুতা আর অপর দু জনের নীল রঙের জিনস্ আর ক্যালিপসো শার্ট। ভাবলেন, কি কায়দায় এদের স্টাডিরুমে ড্রয়ারে রাখা রিভলবারের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া যায়।
মুখে বললেন, বলুন কি করতে পারি?
দুহাত দু পাশে ছড়িয়ে দিলেন মেজর গোনজালিস। দু চোখে কৌতুক খেলে গেল, বলল কাজটা স্রেফ ব্যবসা নিয়ে কর্নেল। হাভানার এক বিশেষ ভদ্রলোকের আমি প্রতিনিধি। চমৎকার মানুষ। আপনার ভালই লাগবে। উনিই পাঠিয়েছেন আমাকে আপনার জমিজমার দর জানতে।
মিসেস হ্যাভলক এতক্ষণ মেজরের কথা শুনছিলেন। এবার স্বামীর গা ঘেঁষে দাঁড়ালেন। গলায় হৃদ্যতা এনে বললেন, মেজর, প্রস্তাবটা খুবই লজ্জাকর। এত ধূলো মাড়িয়ে এতটা পথ এলেন শুধু এই কথা বলতে আপনার বন্ধুর উচিত ছিল খবর নিয়ে আগে জানা। তিনশ বছর হল আমার স্বামীর পরিবার এখানে রয়েছে। কাজেই কনটেন্ট বেচবার কোন প্রশ্নই ওঠে না। আপনার বন্ধুর মাথায় এমন ধারণা এল কোত্থেকে।
ছোট অভিবাদন জানাল মেজর। হাসিমুখে ফিরল কর্নেলের দিকে। মিসেস হ্যাভলকের কথা না শোনার ভান করে– আমার বন্ধুটি শুনেছেন। জ্যামাইকায় যে কটা সেরা এস্টেট আছে, কনটেন্ট তাদের অন্যতম। আমার বন্ধু কিন্তু দারুণ উদার। যে কোন ন্যায্য দাম আপনি হাঁকতে পারেন।
কর্নেল হ্যাভলক দৃঢ় গলায় বললেন, মিসেস হ্যাভলক যা বললেন, তা শুনেছেন নিশ্চয়। এ সম্পত্তি বিক্রি হবে না।
হেসে ফেলল মেজর গোনজালিস। এমনভাবে বলল যেন দুগ্ধপোষ্য বালককে কিছু বোঝানো হচ্ছে–কর্নেল বোধহয় আমাকে ঠিক ধরতে পারেননি। কনটেন্ট ছাড়া জ্যামাইকার আর কোন সম্পত্তি কেনার অভিপ্রায় আমার বন্ধুর নেই। জমিজমা কিনে জ্যামাইকায় ডেরা বাধাতে চান।
