সিগারেট ধরিয়ে দ্বিধার ভাবটা গোপন করার চেষ্টা করল বন্ড। মিস্টার ক্রেস্টের মুখবিবরে ঠাসা সেই মাছটার দৃশ্য ভোলা যায় না কিছুতেই। কাজটা কার? লিজের? না, ফাইডেলের?
কাষ্ঠ হাসি হেসে ফাইডেল, ব্রাভো, মাই ফ্রেন্ড। আপনার মত কপাল হলে আমি বর্তে যেতাম। কিন্তু মনটা খুব খচ খচ করছে একটা ব্যাপারে। মাছটার কথা ভেবেছেন? মস্ত ঝুঁকি কিন্তু। আমেরিকার সেই মিউজিয়াম থেকে টেলিগ্রাম এলে কি খুব স্বস্তি পাবেন? মাছ না পাওয়া পর্যন্ত জীবন অতিষ্ঠ করে তুলবে।
চকমকির মত কঠিন হয়ে ওঠে বন্ডের চোখ। এ কথার মানে হত্যাকারী ফাইডেল নয় লিজ।
কিন্তু সহজ সুন্দর গলায় লিজ বলল, হিলডাব্র্যান্ড বৃটিশ মিউজিয়ামে যাবে।
স্তব্ধ হল ইঞ্জিনের গুমগুম শব্দ। ঝনঝন করে নোঙরের শেকল নামল শান্ত উপসাগরে।
.
একান্ত গোপনীয়
জ্যামাইকার সবচেয়ে সুন্দরী পাখি হল ডক্টর হামিং বার্ড। কেউ কেউ বলে সারা পৃথিবীতে নাকি এর চাইতে সুন্দর পাখি আর নেই। ডক্টর হামিংবার্ডের আর এক নাম, স্টীমার টেল। পুরুষ পাখিরা লম্বায় ৯ ইঞ্চি। তার মধ্যে সাত ইঞ্চি শুধু পুচ্ছ। দুটো লম্বা কালো পালক আড়াআড়িভাবে বেঁকে পড়ে থাকে একটা অপরটার ওপর। পালকের ভেতরকার কিনারায় ঈষৎ বক্রতা–শামুক ডিজাইন প্রান্তদেশ সামান্য ঢেউ খেলানো। মাথা আর খুঁটি মিশমিশে কালো। ডানা গাঢ় সবুজ, দীর্ঘ চঞ্চু হলদে মিশানো উজ্জ্বল লাল, চোখ ঝকঝকে আস্থা জাগানো কুচকুচে কালো। দেহ পান্না সবুজ। এমন ঝলমলে যে বুকে রোদ্দুর পড়লে চোখ ধাধিয়ে যায়। জ্যামাইকার প্রিয় পাখিদের আটপৌরে নাম দেওয়ার রেওয়াজ আছে। তাই ট্রোকিলাস পলিটমাস কে ডক্টর বার্ড নামে ডাকা হয়। কারণ এ পাখির দু পাশে টানা কালো পালক দুটো দেখলেই ডাক্তারের কথা মনে পড়ে। পরনে কালো কুল-অলা কোট, সেকেলে ডাক্তার।
ডক্টর বার্ডদের দুটো পরিবারকে বিশেষ করে ভালবাসতেন মিসেস হ্যাভলক। বিয়ের পর কনটেন্টে আসার পর থেকেই এদেরকে উনি দেখেছেন। দুই পরিবারের ভালবাসা, বাসা বাঁধা, কোদল করা আর মধু খাওয়া–সবই। দেখেছেন। মিসেস হ্যাভলকের বয়স এখন পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে। আদিতে এসেছিল দুটি জুটি। পিরামাস আর থিসবি। জ্যাফনিস আর কোলি ছিল ওদের আটপৌরে নাম। তারপর থেকেই সব জুটিরই ঐ একই নাম থেকে গেছে। মিসেস হ্যাভলক চা খেতে বসে তাকিয়ে ছিলেন পিরামাসের দিকে। চওড়া ঠাণ্ডা বারান্দায় চায়ের আয়োজন সাজানো। চায়ে চুমুক দিতে দিতে মিসেস হ্যাভলক দেখছিলেন রণদেহী পিরামাসকে। কারণ, ড্যাফনিস পিরামাসের এতিয়ারে গোৎ খেয়ে ঢুকেছে মধুর লোভে। নিজের এলাকার মধু লুটে পুটে নেওয়ার জন্য। মাঠভরা হিবিসকাস আর বোগেন ভিলার রঙচঙে ফুলের ওপর উড়তে উড়তে উধাও হল আঙুর আল কমলার কুঞ্জ বনের দিকে। মিসেস হ্যাভলক জানেন, ওরা ফের আসবে।
চায়ের কাপ নামিয়ে মিসেস হ্যাভলক পাটুম পেরিয়াম স্যান্ডউইচ তুলে নিয়ে বললেন, সত্যি, ওদের দেখলে ভয় হয়, ভালোও লাগে।
ডেইলি গ্রীনার কাগজের ওপর তাঁকালেন হ্যাভলক, কাদের কথা বলছ।
পিরামাস আর ড্যাফনিস।
তা যা বলেছ, নামগুলো অবশ্য একটু বোকা বোকাই মনে হল, বললেন, মনে হচ্ছে এবার আসরে নামবে বাটিসটা। ক্যাসট্রা চাপ দিয়েই চলেছে–কমানোর লক্ষণ নেই। আজ সকালে বারক্লেতে চ্যাপ বলছিল এর মধ্যেই কাঁড়ি-কাঁড়ি টাকা বাজারে আসছে। সহজ টাকা নয়, হুমকি দেওয়া টাকা। বেলেয়ার না কি বিক্রি হয়ে গেছে। দাম শুনলে চক্ষু চড়ক গাছ হবে। যে বাড়ি আসছে বারের বড় দিনের মধ্যেই লাল পিঁপড়ের চাপ হবে, সেই বাড়ি সমেত গরু ভেড়া চরবার মাঠের হাজার খানেক বিঘের দাম কিনা দেড় লাখ পাউন্ড। রাতারাতি মাথা না বিগড়োলে বিতিকিচ্ছিরি বু হারবার হোটেল কেনে না। এমন কথাও শুনেছি যে জিমি ফারকুয়ারসনও নাকি নিজের জায়গাজমি বেচবার খদ্দের পেয়ে গেছে। পানামা রোগে যে জমি ছেয়ে গেছে সে জমিরও খদ্দের জোটে।
উরসুলা বর্তে যাবে জমি বিক্রি হলে। বেচারী আর টিকতে পারছে না এখানে। তবে কিউবার লোকজন গোটা দ্বীপটা কিনে নেবে। এটাও তো ভাল ঠেকছে না। টিম, এত টাকা ওরা পাচ্ছে কোথা থেকে?
লুঠতরাজ, সমিতির ফান্ড, সরকারি টাকা–আল্লাহ জানে। চোর ডাকাতে তো ছেয়ে গেছে দেশটা। ডলার পালটানোর সুযোগ জ্যামাইকায় আছে। বেলেয়ার যে কিনেছে, বলতে গেলে সে সুইটকেশ ভর্তি টাকা উপুড় করে দিয়েছে আচেন হিমস এর অফিসে। গোলমাল মিটে গেলে বা ক্যাসট্রো এসে গেলে ফের বেচবে জমি। কিছু লোকসান হয় হোক, টাকাটা তুলে নিয়ে সরবে অন্য কোন চুলায়। বেলেয়ারের মত এমন ভাল জমি জমার শেষে এই হাল হল। ফ্যামিলির কেউ মনে করলে এ জমি কিনতে পারত।
বিলের ঠাকুরদার আমলে জমির আয়তন ছিল কিন্তু দশ হাজার একর। ঘোড়ায় চড়ে সীমানা পেরোতে লাগত ঝাড়া তিন দিন, বললেন মিসেস হ্যাভলক।
মোটা টাকা পেলেই বিল খুশি। এতক্ষণে বোধহয় লন্ডনের টিকিট কেটেও বসেছে। আদি বাসিন্দাদের আর একজন সরল। দুদিন পরে কেউ থাকবে না–আমরা ছাড়া। ভাগ্য ভাল, জুড়ির মন বসে গেছে এখানে।
তাতো বটেই, বললেন মিসেস হ্যাভলক। বলে ঘন্টা বাজালেন। ড্রইংরুম থেকে আগাথার পেছনে এল ফেপ্রিন্স। আগাথা নিগ্রো মেয়ে। নীলচে কালো রঙ। মস্ত বপু। মাথায় সাদা কাপড়ের সাবেকী ঘোমটা। আগাথা হ্যাভলক পরিবারের ঘর-সংসার দেখাশুনা করে।
