লাফিয়ে শেষ কয়েকটা ধাপ উঠল বন্ড। দেখল, ফুটফুটে চাঁদের আলোয় চিৎপাত হয়ে পড়ে মিস্টার ক্রেস্ট। কাছে। গিয়ে যা দেখল তা অবিশ্বাস্য দেহ মন শিউরে উঠল।
দম আটকানো সেই বিকট মুখের দিকে বেশিক্ষণ তাকানো যায় না। দাঁতের ফাঁক দিয়ে বাইরে লটপট করছে লাল কালো একটা বস্তু। মিস্টার ক্রেস্টের জিভ ওটা নয় হিলডাব্রান্ডের ল্যাজ।
মারা গেছেন মিস্টার ক্রেস্ট। মারা গেছেন অতি ভয়ানকভাবে। নিশ্চয় হাঁ করে ঘুমোচ্ছিলেন ভদ্রলোক। সেই সময়ে মাছটাকে কেউ ঠেসে দিয়েছে মুখের ভিতর। কিন্তু সুতীক্ষ্ণ শলাকার মত পাখনা আরো গেঁথে গেছে গালে–চামড়া ফুটো হয়ে বেরিয়ে এসেছে। কি কদাকার কুৎসিতই না দেখাচ্ছে। ভয়ঙ্কর মৃত্যুতে রোমাঞ্চিত হল বন্ড।
আদূরে সাজানো সারি সারি কাঁচের জার। দুষ্প্রাপ্য নমুনাগুলো জারে ডুবিয়ে রাখা হয় ফরমালিনের মধ্যে। একটা জারের পলিথিন ঢাকনি মেঝেতে পড়ে–ভেতরের নমুনাটা উধাও।
গিয়ে দাঁড়াল লাশের পাশে। খুনি কে? ফাউডেল বার্বে, না, লিজ ক্রেস্ট খাবার টেবিলে বংশের কেচ্ছা নিয়ে ফাইডেল বার্বেকে মিস্টার ক্রেস্ট যেভাবে স্ক্রিপ করেছে। তার প্রতিশোধ কি? অথবা আর লিজা অত্যাচারী স্বামী নিধনের অভিনব এ পন্থা। দুষ্প্রাপ্য মাছ দিয়ে দুবৃত্ত স্বামী হত্যা।
কিন্তু এ যে চরম হঠকারিতা। তদন্ত হবেই। হলেই সব ফাঁস হয়ে যাবে। বন্ডও জালে জড়িয়ে পড়বে।
কাজেই নিজেকে বাঁচানোর জন্য লাশ পাচার করা দরকার এখুনি। বোট ডেকের দু পাশের সিঁড়ি। ওপাশে ইঞ্জিন ঘরের আওয়াজে পাইলট নিশ্চয় কিছু শোনেনি। হেঁট হয়ে দেখল বন্ড। চারফুট নিচে আপনার ডেক। মাত্র তিন ফুট চওড়া প্যাসেজের পরেই ছ ফুট উঁচু রেলিং। তারপর সমুদ্র। জিনিসটাকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যেন দোলনা ছিঁড়ে পড়ে গেছেন মিস্টার ক্রেস্ট, তারপর গড়িয়ে গিয়ে নিচের ডেক আর রেলিং টপকে তলিয়ে গেছেন সমুদ্রে।
সেলুন থেকে ছুরি এনে দোলনার দড়ি কাটল বন্ড। মেঝেতে রক্তের দাগ মুছল। কাঁচের জার থেকে দোলনা পর্যন্ত ফরম্যালিন পড়েছিল মেঝেতে তাও মুছল। লাশটাকে টেনে নিয়ে গিয়ে রাখল বোট ডেকের কিনারায়। সিঁড়ি বেয়ে এল নিচের ডেকে। লাশের তলায় দাঁড়িয়ে আলগোছে নিষ্প্রাণ বপুটাকে টেনে আনল কাঁধের ওপর। মাতালের মতই। হাত পা এলিয়ে রইল দেহটা, সমুদ্রের দিকে ফিরে রেলিং টপকে ছুঁড়ে দিল। শেষবারের মত দেখা গেল, রক্তমাখা পাখনা গাঁথা সেই বিকট মুখচ্ছবি।
ওৎ পেতে রইল বন্ড। ছুরি সমেত ফরমালিন আর রক্তে মাখা ভিজে ন্যাকড়াটা ছুঁড়ে দিল সমুদ্রে। নেমে এসে শুল ডানলোপিলোয়। ঘড়িতে তখন সওয়া দুটো। দশ মিনিট যেতে না যেতেই ঘুমিয়ে পড়ল অকাতরে।
সন্ধ্যে ছ টা নাগাদ নর্থ পয়েন্টে ফিরে এল ওয়েভক্রেস্ট। ডেকে পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিল ওরা তিনজন–বন্ড, ফাইডেল বার্বে আর লিজ। মাঝে দাঁড়িয়ে লিজ। সাদা ফ্রকে কালো বেল্ট, গলায় সাদা কালো রুমাল। শোকের পোশাক। তিনজনেই উদগ্রীব নিজের নিজের গোপন কথা বলার জন্য। কিন্তু মুখ খুলছে না কেউই। কাজেই আবহাওয়া। রীতিমত থমথমে। সেদিন সকালে যেন তিনজনে ষড়যন্ত্র করে বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়েছিল। বেলা দশটায় রোদ্দুরে চোখ খুলল বন্ড। গোসল সেরে গিয়ে দেখে, ফাইডেল বার্বে তখনো ঘুমে কাদা। মদের নেশা নাকি কাটতেই চাইছে না। ঘুম ভাঙার পরেই অবশ্য সবার আগে মনে পড়েছিল, মদের টেবিলে মিস্টার ক্রেস্টের রূঢ় আর ফ্যামিলি কে নিয়ে টিটকিরি। বলেছিল, একদিন না একদিন এই নোংরা মুখটা জন্মের মত বন্ধ করে ছাড়বে।
লক্ষণ দেখে বন্ড ঠিক বুঝল না যে ফাইডেলই খুনী। খাবার ঘরে গিয়ে নিজেই সকালের নাস্তা সাজিয়ে খেতে বসেছে, তখন লিজ এল। চোখের কোণে কালি। না বসে দাঁড়িয়েই সকালের নাস্তা খেতে লাগল। মুখচ্ছবি কিন্তু অত্যন্ত শান্ত এবং সহজ। ঘুম এত দেরিতে ভাঙল কেন? কাল রাতে ঘুমের বড়ি গিয়েছিল যে।
এগারটা বাজল। অথচ একটা জলজ্যান্ত নিষ্ঠুর নিধন নিয়ে কেউই কথা বলছে না দেখে বন্ড বলল, ব্যাপার কি? মিস্টার ক্রেস্ট কোথায়?
ভুরু কুচকে লিজ, কোথায় আর, নাক ডাকাচ্ছেন বোট ডেকের দোলনা বিছানায়।
ফাইডেল বলল, পাইলট হাউজেও যেতে পারেন।
বন্ড বলল, এখনো বোট ডেকে নাক ডাকা মানে রোদ্দুরে রোস্ট হওয়া।
লিজ বলল, তাও তো বটে। যাই গিয়ে দেখি। বলে পা দিল বোট ডেকের সিঁড়িতে। কয়েক ধাপ উঠেই থমকে গেল। উদ্বিগ্ন গলায়, জিম, উনি তো নেই এখানে। দোলনা বিছানা ছিঁড়ে ঝুলছে।
ফাইডেলের কথাই ঠিক। দেখি পাইলট হাউজে।
কিন্তু পাইলট হাউজ কেন, সারা জাহাজেও খুঁজে পাওয়া যায়নি মিস্টার ক্রেস্টকে, দোলনা বিছানা যখন ছেঁড়া তখন নিশ্চয় উনি ঘুমের ঘোরেই গড়িয়ে সমুদ্রে তলিয়ে গেছেন। ভয়ংকর পরিণতিটা, পরিণতি মুখ ফুটে বলার সঙ্গে সঙ্গে লিজ কান্নায় ভেঙে পড়েছিল।
ক্যানন পয়েন্ট ঘুরে এগোল ওয়েভক্রেস্ট। বন্ড দেখল ওদের দিকে কাস্টমস লঞ্চ আসছে। আগুনের মত খবরটা এখুনি ছড়িয়ে পড়বে।
ফাইডেল বার্বে বলল, ঘাবড়াবেন না। এরা আমার বন্ধু। চীফ জাসটি আমার কাকা। একটা স্টেটমেন্ট দিতে হবে সবাইকে। কাল হয়ত একটা তদন্ত হবে। রেহাই পাবেন পরশু।
তাই নাকি? ঘামের ফোঁটা চকচক করে লিজের চোখের নিচে। এ ঝামেলা মিটলে আর এক ঝামেলার শুরু। কোথায় যে যাব, তাই জানি না। জেমস্ আপনি তো মোম্বাসা যাচ্ছেন। একই সঙ্গে যাওয়া যাবে, কেমন?
