কান ঝালাপালা হল বন্ডের। তাই মুখটিপে শুধু বলল, আমেরিকা সম্বন্ধেও একটা শুনি।
কি?
আমেরিকা ছিল শিশু, হয়েছে সরাসরি স্থবির। বুদ্ধি পাকানোর সুযোগ ঘটেনি।
বাঃ, কথাটা মন্দ নয় তো। বলে স্ত্রীর দিকে তাকালেন মানিক, এই কথাটাই তুমি সেদিন বলছিলে না?
শংকা ঘনিয়ে এল লিজের চোখে। বলল, আমি তো ঠাট্টা করেছিলাম। খবরের কাগজে কমিক ছবি দেখে। বলেছিলাম যততো ছেলেমানুষী।
ঠাট্টাটা ভালই। মনে থাকবে। নিশ্চয় মনে থাকবে মানিক।
বন্ডের ইচ্ছে হল একটা ঘুষি মেরে থামিয়ে দেয় মাতালটাকে। কিন্তু তার আগেই ভদ্রলোক ফাইডেল বার্বেকে ফিজে, বলিহারি যাই তোমাদের এই দ্বীপমালাকে। ম্যাপে প্রথমবার দেখে ভেবেছিলাম মাছির বিষ্ঠা। মানুষ এখানে থাকে কি করে? এলাম শুধু তোমাদের ফ্যামিলির কেচ্ছা শুনে। তোমাদের কে একজন না কি শ-খানেক জারজ সন্তানের জন্ম দিয়েছে।
আমার কাকা, গ্যাসটন। ফ্যামিলির নাম ডুবিয়েছেন উনি। জিনিসটা কারোরই ভাল লাগেনি। আমাদের অবস্থাও খারাপ হয়েছে ওর জন্য।
অবস্থা? কড়ির কারবার নাকি?
না। একশ বছর আগে কচ্ছপ আর মুক্তো চালান দেওয়া হত। এখন নারিকেল।
পরিবারের জারজদের কুলি বানায় নিশ্চয়? মন্দ নয়। এরকম কুলির দল তো আমিও বানাতে পারি। বলেই তাকালেন বউয়ের পানে। নতুন নষ্টামি শুরু হওয়ার আগেই বন্ড ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
ডেকে গিয়ে দাঁড়াল খোলা হাওয়ায়। দশ মিনিট পরে লিজ ডেকে এসে দাঁড়াল।
ক্লান্ত কণ্ঠ লিজের, শুতে যাচ্ছিলাম। তারপর ভাবলাম খোলা হাওয়ায় একটু ঘুরে যাই।
বেশ করেছেন। আমি তো ডেকে দাঁড়াই তারা দেখবার জন্য। এত তারা একসঙ্গে জীবনে দেখিনি।
জানেন তো, ছোটবেলায় আমি ভাবতাম তারাগুলো আসলে আকাশের ছিদ্র।
বেশ করতেন। বৈজ্ঞানিকদের সব কথা বিশ্বাস না করাই ভাল। আপনার দেশ কোথায়?
নিউ ফরেস্ট। রিংউড। ইচ্ছে আছে আবার সেখানে যাবার।
যান না। এখানে তো আপনার মন বিষিয়ে উঠেছে দেখছি।
বন্ডের বাহুতে হাত রাখল লিজ, ও কথা বলবেন না। লোকজন আমার ভাল লাগে। কথা বলতে ভাল লাগে। আপনার সঙ্গে এই যে কয়েক মিনিট কাটিয়ে গেলাম, একি ভোলবার। কিছু মনে করবেন না। হঠাৎ ইচ্ছে হল হাত ধরবার। এবার যাই, শুইগে।
সিল্ক মসৃণ স্বরটা ভেসে এল ঠিক পেছন থেকে বটে! বটে! শেষে ডুব সাতারুর সঙ্গে হলায় গলায়।
দেখা গেল, সেলুনের দরজার ফ্রেমে মিস্টার ক্রেস্টের দু হাত মাথার ওপরকার কাঠে। আলো পেছনে থাকায় মনে হচ্ছে যেন একটা মস্ত বেবুন দাঁড়িয়ে।
এক পা এগিয়ে এল বন্ড। নিশপিশ করে উঠল দু হাত। চট করে চোখ দিয়ে মেপে নিল মিস্টার ক্রেস্টের তলপেট কতখানি দূর। মুখে বলল, হট করে কিছু ভেবে নেওয়াটা ঠিক নয়, মিঃ ক্রেস্ট। মুখ সামলে কথা বলবেন। বড় বাড়াবাড়ি করছেন আজ রাতে। এখনো যে চোয়াল খুলে দিইনি, এই যথেষ্ট। মাতাল কোথাকার। যান, শুয়ে পড় ন।
আরে, আরে! লোকটা বলে কি। বলতে বলতে পকেট থেকে একটা রূপার হুইসল বার করলেন মিস্টার ক্রেস্ট। এক পা এগোলেই ফুঁ দেব। বাঁশি বাজলেই তোমার দেহটা টপকে গিয়ে পড়বে সমুদ্রে। তারপর জাহাজটাকে ঘুরিয়ে এনে ঘুরন্ত প্রপেলার দুটো চালিয়ে দেওয়া হবে তোমার পেটের ওপর দিয়ে। গাঁট্টাগোট্টা মাঝিমাল্লা কেন রাখি, এবার বুঝেছ? মাথায় ঢুকেছে তো? তাঁদড়ামো না করে এস, ফের বন্ধু হয়ে যাই। মানিক, এস, শোবার সময় হয়েছে।
ভয়ার্ত হরিণীর মত গোৎ খেল লিজ। পিশাচ স্বামীর বাহুর তলা দিয়ে এক দৌড়ে উধাও হল ভেতরে।
কিছু মনে করো না। কেমন বলে মিস্টার ক্রেস্টও চলে গেলেন। শোবার ঘরে ঢুকে আলো নিভিয়ে দিলেন মিস্টার ক্রেস্ট।
শাওয়ারে বেশ করে গোসল করে আধঘণ্টা পরে ডেকে এল বন্ড। খোলা ডেকে শুতে বড় আরাম। তাই গাদা করা একটা ডানলোপিল গদি টেনে নিয়ে বিছানা পাতছে, এমন সময়ে নারীকণ্ঠের আর্ত চিৎকার ভেসে এল মিস্টার ক্রেস্টের শোবার ঘর থেকে। নিঃসীম যাতনায় ঝাঁকিয়ে উঠছে লিজ।
বিছানা ফেলে দৌড়াল বন্ড। ওর শোবার ঘরের দরজায় হাত দিয়েও হাত সরিয়ে নিল। করছে কি বন্ড? দাম্পত্য কলহে কেন সে নাক গলাচ্ছে অসহ্য হলে লিজ খতম করে দিক না শয়তানটাকে–বভরে তাতে কি?
ফিরে আসছে বন্ড, এমন সময় আর্ত চিৎকারটা আর একবার শোনা গেল। এবার আরো নিস্তেজ।
এ অবস্থায় ঘুম আসে না। কিন্তু আকাশের তারা দেখতে দেখতে কখন জানি বন্ড ঘুমিয়ে পড়েছিল। নাক ডাকার বিফল শব্দে কাঁচা ঘুম ভেঙে গেল।
বোট ডেকে দোলনা বিছানায় শুয়ে নাক ডাকাচ্ছে মিস্টার ক্রেস্ট। পোর্ট ভিক্টোরিয়া থেকে রওনা হবার পর থেকে বোট ডেকে উনি শুচ্ছেন। স্পীডবোট আর ডিঙি নৌকার মাঝে দোলনা বিছানা খাঁটিয়ে টেনে ঘুমোন। কিন্তু কোনদিন নাক ডাকে না। আকণ্ঠ মদের ওপর খান কয়েক ঘুমের বড়ি পড়েছে নিশ্চয়।
কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করল বন্ড। তিতিবিরক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত উঠে পড়ল বন্ড। ভাবল বিছানা নিয়ে ফাইডেল বার্বের কেবিনে শোবে মেঝের ওপর।
ঠিক এমনি সময়ে মাথার ওপরে বোট থেকে একটা ভারি বস্তু আছড়ে পড়ল ধড়াম করে। সঙ্গে সঙ্গে হচড় পাঁচড়ের আওয়াজ আর মারাত্মক ঘড়ঘড়ানি শব্দ। মিস্টার ক্রেস্ট কি দোলনা বিছানা থেকে পড়ে গেলেন ঘুমের ঘোরে?
অনিচ্ছাসত্ত্বেও বোট ডেকের সিঁড়িতে পা দিল বন্ড। কানে ভেসে এল আরও একটা ভয়ানক শব্দ। এক জোড়া। গোড়ালি খটাখট শব্দে উধাও হল দূরে ডেকের পাটাতনে পলায়মান শব্দের অর্থ কি, তা বন্ডের অজানা নয়।
