ফস করে লিজ বলল, কথাটা মিথ্যে নয়, মিল্ট। দামী দামী নমুনা না দেখাতে পারলে ট্যাক্সের ছিনেজেকরা কিন্তু তোমার এই বজরা আর যত বাজে খবর সবই বন্ধ করবার চেষ্টা করে আসছে গত পাঁচ বছর ধরে।
মানিক, আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে প্যান প্যান না করলেই ভাল করতে। ফল কি হল জানো? চাবুকের এ ঘা পাওনা। হল। আজ রাতেই পাওয়া মিটিয়ে দেব, কেমন?
তৃতীয় দিন ভোরবেলা শাগ্রিন দ্বীপ দেখা গেল দূর থেকে। সবুজের সঙ্গে সাদা মেশানো একটা বন্দু দূরদিগন্ত থেকে এগিয়ে আসছে। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল বন্ড।
নোঙর ফেলা হল দশ ফ্যাদম দূরে। স্পীডবোট চেপে পৌঁছানো হল দ্বীপে। যেন একটা ক্ষুদে প্রবাল দ্বীপ। ষাট বিঘে বালি আর প্রবাল। নেকলেসের মত পাথরের বলয়ের মধ্যে শান্ত পানি, অগভীর, চওড়ায় প্রায় পঞ্চাশ গজ। মেঘের মত কালো আকাশে পাখির দল ডাঙা ছেড়ে শূন্যে উঠল দ্বীপে নামতে। পাখির বিষ্ঠার অ্যামোনিয়া গন্ধ। সাদাটে চওড়া কাকড়ার সাঁতার।
সাদা বালির ওপর তাঁবু খাটানোর হুকুম দিলেন মিস্টার ক্রেস্ট। সাঁতারের মুখোশ পরে বন্ড আর ফাইডেল বার্বে ঝাঁপ দিল পানিতে। মিসেস ক্রেস্টও ডুব দিয়ে শামুক তোলার খেলায় মাতলেন। কে বলবে, গতদিন এই মেয়েটিই কেবিন থেকে বেরোয়নি। মিস্টার ক্রেস্ট শরীর খারাপের অছিলা দিয়েছিলেন।
পানির তলায় প্রতিটি জলচর জীবের চালচলন দেখতে দেখতে সাঁতরে চলল বন্ড। বন্ডের চোখ খুঁজছে হিলডাব্রান্ড মাছকে, মন কিন্তু ভাবছে লিজকে। স্বামীহত্যা না করে বসে মেয়েটা। চাবুকে ফের হাত দিলেই রিভলবার বা ছোরা নিয়ে হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে পিশাচ পতিদেবতার ওপর। বিচারে রেহাই পাবে লিজ। বন্ড কি ওর কানে সেই মন্ত্র দেবে? বলবে কি– লিজ, স্বামী হত্যা করতে চাও তো করে ফ্যাল। না, এমনও তো হতে পারে মেয়েটা ধর্ষকামী? পিটুনী না খেলে আনন্দ পায় না।
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে একপাক ঘুরে এল বন্ড। ফাইডেল বার্বেও পৌঁছে গেছে। বন্ডকে দেখেই বড় বড় শুক্তি দেখলাম। আকারে যেন ফুটবল। কাকাতুয়া মাছও বিস্তর। ভাবছি ফিরে গিয়ে লোক পাঠাব। জাহাজ ভর্তি করে নিলে, মোটা দাও পেটা যাবে।
তাঁবুতে ফিরে আসতেই মিস্টার ক্রেস্ট প্রায় ঢেঁকিয়ে উঠলেন শূন্য হস্ত দেখে। নিজেই পানিতে নামলেন। সঙ্গে ওদের একটা মুখোশ।
কিছুক্ষণ পরেই হাঁকডাক ভেসে এল। বন্ড আর ফাইডেল বার্বে গিয়ে দেখল হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে মিস্টার ক্রেস্ট চেঁচাচ্ছেন। দু দুটো ওস্তাদ পানি তোলপাড় করে যা পারেনি, মিস্টার ক্রেস্ট পানিতে নেমেই তা পেরেছেন। নীল পানির আবছা অঞ্চল, ঐখানে হিলডাব্রান্ডকে লুকিয়ে থাকতে দেখেছে।
বন্ড বলল, বেশ তো, ধরবেন কি করে?
পানিতে বিষ ঢেলে। ব্রাজিলে এই দিয়ে মাছ ধরে। গাছের শেকড়ের নির্যাস। নাম রোটনন। এতে মাছের কানকোর মধ্যে রক্তবহা ধমনী-শিরাগুলো কুঁচকে যায়। দম বন্ধ হয়ে মারা যায় মাছ। মানুষের কিছু হয় না কানকো নেই বলে। জিম, তুমি গিয়ে দেখ। হিলডাব্রান্ডকে ল্যাজ নাড়তে দেখলেই আঙুলের ইশারা করবে। তবে আমি পানিতে রোটেনন ঢালব। পাঁচ গ্যালনের একটা মাত্র টিন ছাড়া আর নেই, কাজেই নষ্ট না হয়।
পানিতে মুখ ডুবিয়ে ওৎ পেতে রইল বন্ড। মিনিটের মধ্যে হিলডাব্রান্ডকে দেখা গেল ওর মুখের কাছে। মুখোশ দেখে সুট করে উধাও হল নীলচে কুয়াশার মধ্যে।
পানির নিচে বিচিত্র সাম্রাজ্য দেখে মনটা যেন কিরকম হয়ে গেল বন্ডের। পাঁচ হাজার মাইল দূরে একটা মিউজিয়ামের খেয়াল চরিতার্থ করার জন্য একটি মাত্র মাছ হত্যা করার দরকার। কিন্তু পানিতে বিষ ঢাললেই সেই বিশেষ একটির সঙ্গে শয়ে শয়ে হাজারে হাজারে জলচর জীবরা মারা পড়বে। নিজেকে অপরাধী মনে হল বন্ডের। মনে হল নাগাসাকির ওপর অ্যাটম বোমা ফেলার তোড়জোড় চলছে-ট্রিগার টেপার ভার বন্ডের ওপর।
হিলডাব্রান্ড আবার আসছে। জলজ উদ্ভিদের নীল কুয়াশার মধ্যে ল্যাজ নেড়ে বেরিয়ে এল উজ্জ্বল গোলাপী মাছটা। কাছে আসতেই পানির মধ্যেই মুখ রেখেই মুখোশের মধ্যে খেঁকিয়ে উঠল বন্ড, বেরো, বেরো, দূর হ। বলেই হারপুন দিয়ে মারল এক খোঁচা। পই পই করে আবার উধাও হল হিলডাব্রান্ড।
স্যাবটাজ করল বন্ড। মিস্টার ক্রেস্টের উদ্দেশ্য ব্যর্থ করার জন্য মাছটাকে দিল খেদিয়ে, তারপর ইশারা করতেই টিনভর্তি বিষ পানিতে ঢেলে দিলেন মিস্টার ক্রেস্ট।
কিছুক্ষণের মধ্যেই স্রোতের টানে ভেসে এল রাশি রাশি মৃতদেহ। মরা অক্টোপাস। বান মাছ তলপেট সাদা মাছ আরও কত জলচর জীব। থ হয়ে দেখতে লাগল বন্ড। মৃতদেহের সংখ্যা কমে আসছে। বেঁচে গেল হিলডাব্রান্ড।
সহসা নীল কুয়াশার মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল উজ্জ্বল গোলাপী সেই মাছটা। সিধে আসছে বন্ডকে লক্ষ্য করে। পানিতে হাত ডুবিয়ে জোরে হাত নাড়াল বন্ড। তবুও আসছে হিলডাব্রান্ড। সিধে হয়ে দাঁড়িয়ে ওর আসার পথেই হাঁটতে শুরু করল বস্তু। আশপাশে ভাসছে মরা মাছ। তার মধ্যে লাল কালো ভারি সুন্দর হিলডাব্রান্ড থমকে দাঁড়াল, কেঁপে উঠল থরথরিয়ে। পরমুহূর্তে ছিটকে এল বন্ডের দুপায়ের ফাঁকে। আর নড়ল না।
মিস্টার ক্রেষ্টের হাতে বন্ড মাছটা তুলে দিল। তারপর ঝাঁপ দিল পানিতে।
ফেরার পথে রাত্রে ভোজসভার আয়োজন করলেন মিস্টার ক্রেস্ট। খেতে বসে আকণ্ঠ মদ গিলে যাচ্ছেতাই বলতে লাগলেন বন্ড আর ফাইডেল বার্বেকে। সব মদ মিশিয়ে প্রায় বোতল খানেক মদ গেলার পরও কথা জড়াল না। একটা গ্লাস টেবিল থেকে ঠিকরে গেল মেঝেতে। তারপরেই শুরু হল আক্রমণ। প্রথমে ঝেড়ে কাপড় পরালেন বন্ডকে। বর্তমান বিশ্বে শক্তিশালী রাষ্ট্র বলতে শুধু তিনটি–আমেরিকান, রাশিয়া আর চীন। ইংল্যান্ডে প্রাসাদের ধ্বংসস্তূপ আর একটা রাণী ছাড়া কিছু নেই। ফ্রান্সে মেয়ে সস্তা। ইটালীতে শুধু রোদ পোহানো। জার্মানিতে এখনো যৎসামান্য আছে বটে। কিন্তু দু দুটো যুদ্ধে হেরে ওরা ভূত হয়ে গেছে।
