খরগোশের মত ক্ষিপ্রচরণে চোখের আড়াল হলেন মিস্টার ক্রেস্ট। মিসেস ক্রেস্ট বলল, কিছু মনে করবেন না ওর। কথায়। ওর ঠাট্টার ধরনটাই অমনি।
বন্ড হেসে বলল, ওঁর জানার এখন অনেক বাকি। আমেরিকাতেও এমন কথা বলেন?
আমেরিকানদের উনি ভালবাসেন। ঝাল ঝাড়েন কেবল আমার ওপর। তাও জাহাজে উঠলেই। ওঁর বাবা তো খাঁটি জার্মান। তাই ধারণা, ইউরোপীয়ান মাত্রেই ধ্বংসের পথে পা বাড়িয়েছে। তর্ক করে লাভ নেই বলেই চুপ করে থাকি।
বটে! আবার সেই বস্তাপচা জার্মান দম্ভ ইংরেজ বউকে নিশ্চয় তাহলে ক্রীতদাসী জ্ঞান করেন। আপনাদের বিয়ে হয়েছে কদ্দিন
দু বছর। ওঁরই একটা হোটেলে রিসেপসনিস্ট ছিলাম। উনি একদিন আমাকে দেখেই এত ভালবাসলেন যে কি বলব। যেখানেই যাই সেখানেই রাজরাণীর মত খাতির পাই।
খাতির জিনিসটা ওর খুবই পছন্দ, তাই না? তা ঠিক।
এবার আর হাসতে পারল না সুন্দরী। ভেতরে উনি কিন্তু ক্ষুদে নবাব। পান থেকে চুন খসলেই তুলকালাম কাণ্ড। ঐ রে, ইঞ্জিন চালু হয়ে গেছে। আপনি ডেকে যান, আমি আসছি।
বেরিয়ে এল বন্ড। দেখল, মাঠের সবুজ তীরভূমি ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। মিস্টার ক্রেস্ট কি পাড় মাতাল? মিসেস ক্রেস্ট কি যমের মত ভয় করে স্বামীকে দু বছর হল বিয়ে হয়েছে। কতই বা বয়স মেয়েটির। তিরিশের বেশি নয়। ছাইয়ের মত উজ্জ্বল চুল। বড় ভাসাভাসা চোখ। ঠোঁটে লিপস্টিক নেই। নখে রঙ নেই। স্বামীর হুকুম হয়ত সাজগোছ আচ্ছা, ভদ্রলোক পুরুষত্বহীন নন তো? বাইরের হাঁকডাক আর হম্বিতম্বি দিয়ে ভেতরের দুর্বলতাকে ঢাকবার চেষ্টাও হতে পারে। এ লোকের সঙ্গে চার পাঁচদিন এক জাহাজে থাকা তো চাট্টিখানি কথা নয়।
হ্যাল, জিম আমার বউ কোথায়? বোটডেক থেকে হাঁক শোনা গেল মিস্টার ক্রেস্ট-এর।
আসছেন।
এক লাফে বোট ডেক থেকে নিচের ডেকে নেমে এলেন মিস্টার ক্রেস্ট-জাহাজ দেখবেন তো চলুন ঘুরিয়ে দেখাচ্ছি।
শুরু হল জাহাজ পরিক্রমা। সবকিছুই মিস্টার ক্রেস্টের মুখস্থ। গড়গড় করে একাই বলতে লাগলেন টেকনিক্যাল খুঁটিনাটি। ঘুরতে ঘুরতে এলেন নিজের শোবার ঘরে। দরজায় টোকা না দিয়েই ঢুকলেন ভেতরে। দেখা গেল, ড্রেসিং টেবিলে বসে মিসেস ক্রেস্ট সাজগোজ করছে।
তোমাকে বললাম না মদের গ্লাস রেডি করতে। তা না করে সাজতে বসেছ? জিম এর জন্য এক পোঁচ বেশি রুজ লাগানো হচ্ছে বোধহয়? হামফ্রি বোগার্ট কণ্ঠে বললেন, মিঃ ক্রেস্ট।
মুখ আমসি করে উঠে মিসেস ক্রেস্ট–এই আসছি বলেই উধাও হল পাশের দরজা দিয়ে।
যেন কিছুই হয়নি। এমনিভাবে এ ঘরের বর্ণনায় মুখর হলেন মিঃ ক্রেস্ট। বন্ডের চোখ কিন্তু ডবল বেডের পাশের টেবিলে রাখা চাবুকটার ওপর। ফুট তিনেক লম্বা চামড়ার হাতলঅলা চাবুক। শংকর মাছের ল্যাজ দিয়ে বানানো।
বিছানা ঘুরে গিয়ে চাবুকটা তুলল বন্ড। বলল, পেলেন কোথায়? আজ সকালেই তো একটা শংকর মছ খতম করলাম।
শুকনো হাসি হেসে মিস্টার ক্রেস্ট বললেন, আরবরা শুনেছি বউ শায়েস্তা করে এটা দিয়ে। আমাকেও এক ঘায়ের বেশি কোনদিন দিতে হয়নি। এক ঘায়েই সিধে হয়ে যায় লিজ। চাবুক বটে। সাংঘাতিক কাজ দেয়।
শক্ত চোখে তাকায় বন্ড সিসিলিতে এ জিনিস ঘরে রাখা বেআইনি জানেন তো?
এ জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের এখতিয়ার সিসিলির নয়। চলুন, গলা কাঠ হয়ে গেছে, একটু মদ খাওয়া যাক।
লাঞ্চের আগে ভডকা আর লাঞ্চের সঙ্গে বিয়ার খেলেন মিস্টার ক্রেস্ট। অত খেয়েও গলা কাঁপল না। টেবিল মাতিয়ে রাখলেন একাই। ফাউন্ডেশন বস্তুটা কি, তা বুঝিয়ে দিলেন। আমেরিকায় যার টাকা বেশি, যে ট্যাক্স ফাঁকি দিতে চায়, তাহলে সৎ উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত ফাউন্ডেশনের নামে এক কাড়ি টাকা গচ্ছিত রাখলেই হল। টাকাটা নিজের নামে বা আত্মীয়স্বজনের নামে রাখলে চলবে না। ক্রেস্ট ফাউন্ডেশনে এক কোটি ডলার রেখেছেন। সেই টাকা ভেঙে বৈজ্ঞানিক অভিযানের নামে বছরে তিনমাস সাত সমুদুর ঘুরে বেড়াচ্ছেন। শখও মিটছে আর টাকারও সদগতি হচ্ছে। দুষ্প্রাপ্য নমুনা সংগ্রহ করছেন ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের জন্য। টাকা ছড়ালেই নমুনা মেলে। মিস্টার। ক্রেস্ট গিয়ে সোজা গভর্নরকে একটা চেক লিখে দিলেন। দশ হাজার ডলার দান করছেন। সুইমিং পুল বানিয়ে বাচ্চাদের। সাঁতার শেখাতে হবে। প্রতিদানে পেলেন কাকাতুয়া আর কচ্ছপ। শামুকের অনেকগুলো নমুনা সংগ্রহ করলেন একজনকে পাঁচ হাজার ডলার চেক দিয়ে। সে তো এইভাবে খোলাম কুচির মত টাকা ছড়িয়ে এর মধ্যেই লম্বা ফর্দের তিনভাগ নমুনা জোগাড় করে ফেলেছেন।
বন্ড বলল, দেশে ফিরলে আপনাকে মেডেল দেওয়া উচিত। মাছ সম্বন্ধে কি যেন বলছিলেন?
ড্রয়ার খুলে টাইপ করা একটা কাগজ বার করলেন মিস্টার ক্রেস্ট।
শুনুন। দুষ্প্রাপ্য মাছ হিলডাব্রান্ডকে সর্বপ্রথম জাল ফেলে ধরেন প্রফেসর হিলডাব্রান্ড সিসিলি দ্বীপপুঞ্জের শাগ্রিন দ্বীপের কাছে ১৯২৫ সালের এপ্রিল মাসে। এ মাছ কাঠ বিড়াল জাতীয় মাছদের মধ্যে নাকি অনন্য। একটা মাছই আজ পর্যন্ত ধরা পড়েছে। লম্বায় ইঞ্চি ছয়েক। ঝকঝকে গোলাপী রঙ-তাতে আড়াআড়িভাবে কালো ডোরা। পাখনাগুলো। গোলাপী। ল্যাজ কালো। চোখ বেশ বড়, রঙ গাঢ় নীল। সাবধানে ধরা দরকার। পাখনাগুলো নাকি সাংঘাতিক রকম উঁচলল। এই হল হিলডাব্রান্ড মাছের কেচ্ছা। পুঁচতে একটা মাছের জন্য কয়েক হাজার ডলারের শ্রাদ্ধ। তা সত্ত্বেও কিনা রাজস্ব বিভাগে বছর দুয়েক আগে শুনেছিলাম ফাউন্ডেশনটাই নাকি চারশ বিশ কারবার।
