রগড় জমবে ভালই। কিন্তু আমাকে টানাহ্যাঁচড়া কেন?
একঘেয়ে দিনগুলো আর কাটাতে পারছিলাম না বলে। ক্রেস্টকে শুনিয়ে দিলাম, আপনার মত দুদে ডুব সাঁতারু বড় একটা চোখে পড়ে না। শুনেই লাফিয়ে উঠলেন ভদ্রলোক। জানতাম আপনি এখানেই আছেন, শেষকালে একজন জেলের কাছে জানলাম, কে একজন ডাকাবুকো সাদা চামড়া নাকি আত্মহত্যার মতলব এটে সমুদ্রে ডুব দিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গেই বুঝলাম আপনিই সেই আত্মঘাতী পুরুষ।
অট্টহাসি হেসে বন্ড বলল, বুঝি না এরা কেন সমুদ্রকে এত ভয় পায়। সাঁতার জানে এমন সিসিলি সুন্দরীও মেলা ভার।
রোমান ক্যাথলিক তো। খালি গা হতে চায় না। আপনাকেও বলি, উপোষী হাঙরের পাল্লায় পড়লে মজাটা টের পেতেন। পাথুরে মাছ মাড়ালে তো কথাই নেই। সঙ্গে সঙ্গে ধনুকের মত দেহ তেউড়ে যেত সাংঘাতিক যন্ত্রণায়।
বন্ড বলল, জুতো পরলে বা পায়ে ন্যাকড়া জড়ালেই পাথুরে মাছকে টেক্কা মারা যায়।
মাসখানেক আগে বন্ডকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন M। হুকুম দিয়েছিলেন সিসিলি যেতে। বলেছিলেন, মালদ্বীপের জাহাজ ঘাঁটিতে বড় অশান্তি দেখা দিয়েছে। সিংহল থেকে কম্যুনিস্ট আসছে। ফলে স্ট্রাইক আর স্যাবোটাজ লেগেই আছে। যন্ত্রপাতি তছনছ হচ্ছে গোপনে। হয়ত ঘাঁটি সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে সিসিলিতে। জায়গাটা হাজার মাইল দক্ষিণে হলেও নিরাপদ। তা সত্ত্বেও একটা রিপোর্ট দেওয়া দরকার। তাই তোমায় পাঠাচ্ছি। বছর কয়েক আগেও কিছু গোলমাল ছিল ওখানে। জাপানি জেলে নৌকা। ইংল্যান্ডের দাগাবাজ, ফ্রান্সের সঙ্গে আঁতাত। যাক, গিয়ে দ্যাখ। নিরপেক্ষ রিপোর্ট পাঠাও। আর হ্যাঁ, বেশি রোদ লাগিও না। সর্দিগর্মি হবে।
দিন সাতেক আগেই রিপোর্ট লেখা শেষ করেছে বন্ড। লিখেছে, জায়গাটা সত্যিই নিরাপদ। তুলকালাম কান্ড ঘটতে পারে শুধু একটি কারণে। সে কারণটি হল, সিসিলি সুন্দরীদের ভুবনমোহিনী রূপ। পাওয়া যায় অঢেল–চাইলেই হল।
রিপোর্ট শেষ। হাত খালি। এখন কবে কাম্পালা জাহাজে মোম্বাসা যাওয়া হবে, তারই প্রতীক্ষা। গরমে প্রাণ আইঢাই করলেও রেহাই নেই।
বার্বে ভবনেই ডেরা নিয়েছিল বন্ড। সাতটা দিন কেটেছে তালকুঞ্জে আর সমুদ্র গোসল নিয়ে। সাঁতারের পোশাক ছেড়ে মালপত্র নিয়ে ওখান থেকেই দু জনে রওনা হল ক্রেস্টের বজরা অভিমুখে। দূর থেকে ওয়েভক্রেস্ট-কে দেখে আহামরি কিছু মনে হয় না। বন্ডের পাকাচোখ কিন্তু এক পলকেই বুঝেছিল। সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ি দেবার উপযুক্ত এ জাহাজ। দারুণ মজবুত। পলকা বজরা নয় মোটেই।
ডেকে উঠে বসবার ঘরে ঢুকল বন্ড। হিমেল হাওয়ার গা যেন জুড়িয়ে গেল। দামী দামী আসবাবপত্রে ঘর ঠাসা। এ ঘর যেন জাহাজে মানায় না–মানায় রাজপ্রাসাদে। নীলচে কার্পেট, রূপালী দেওয়াল। সাদাটে কড়িকাঠ। মস্ত গ্রামোফোনের পাশেই সাইনবোর্ডে থরে থরে সাজানো মদিরা সম্ভার। মাঝের টেবিলে হায়াসিনথ-এর গুচ্ছ! ম্যাগাজিনের স্তূপ।
কিহে জেমস্, কি বলেছিলাম?
বন্ডের চোখে অকৃত্রিম তারিফ সত্যিই এমন না হলে সাগরে অভিযান মানায়! হাওয়া কত তাজা দেখেছেন!
এ হাওয়া টিনভর্তি বাসি হাওয়া। তাজা হাওয়া পাবেন বাইরে।
কথাটা মিলটন ক্রেস্ট বললেন। কখন যেন ঘরে এসেছেন ভদ্রলোক। বছর পঞ্চাশ বয়স, মজবুত গড়ন, ফিকে বাদামী চোখ। ঢুলুঢুলু চোখে অপরিসীম তাচ্ছিল্য। কথা বলার ধরনে গা পিত্তি জ্বলে যায়। হামফ্রি বোগার্টের কণ্ঠস্বর মনে করিয়ে দেয় তার কণ্ঠস্বরে। ডানবাহুতে আঁকা উল্কি–নোঙরের ওপর উড়ছে ঈগল পাখি। বন্ড মনে মনে বলল, হেমিংওয়ে হবার ইচ্ছেও আছে কিন্তু আমার সঙ্গে জমবে না মোটেই।
কার্পেট মাড়িয়ে এসে হাত বাড়ালেন ক্রেস্ট আপনার নাম বন্ড? কি সৌভাগ্য আজ। ডুব সাঁতারে অ্যাকোয়ালা নেন, না এমনিই ডুব মারেন?
এমনিই। বেশি গভীরে যাই না। নিছক শখ।
বাকি সময়টা কি করেন?
সরকারি চাকরি।
সশব্দে অনুকম্পার হাসি হেসে বললেন, দাসত্ব আপনাদের রক্তে। বলিহারি যাই আপনাদের, মানে, ইংরেজদের। তামাম দুনিয়ায় আপনাদের টেক্কা মারতে পারে এমন খানসামা আর বাটলার তো দেখি না।
বন্ডের মেজাজ সপ্তমে চড়তে চড়তে আটকে গেল প্রায় বিবস্ত্রা এক সুন্দরীর আর্বিভাবে। রোদে জ্বলা সারা গা। পরনে এক চিলতে বিকিনি ছাড়া কিছুই নেই।
এই তো মানিক আমার। ছিলে কোথায় এতক্ষণ? শ্রীমুখ কতক্ষণ দেখিনি বলত? এসো আলাপ করিয়ে দিই। ইনি মিস্টার বার্বে। আর ইনি মিস্টার বন্ড। বলে রূপসীর দিকে হাত বাড়িয়ে–ইনি হলেন আমার স্ত্রী, মিসেস ক্রেস্ট। পঞ্চম মিসেস ক্রেস্ট। বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা তো, সন্দেহ হতে পারে আদৌ বউ ভালবাসে কিনা। তাই বলে রাখি, ভদ্রমহিলা স্বমী অন্ত প্রাণ। তাই না মানিক।
কি যে করা মিল্ট, ভুবনমোহিনী হাসি হেসে বলল মিসেস ক্রেস্ট। মিস্টার বন্ড, মিস্টার বার্বে, এক ঢোক সুরাপান হয়ে যাবে না কি?
এখন নয়, এখন নয়, সরব হলেন মিস্টার ক্রেস্ট। আগে যার যা কাজ বুঝিয়ে দিই।
যথা?
আমি হলাম গিয়ে ওয়েভক্রেস্টের ক্যাপ্টেন। মিস্টার বার্বে, কি বলে ডাকা যায় বলুন তো আপনাকে? ফাইডেল? উঁহু, বড় বড় নাম। আমি ফিডো বলেই ডাকব। আপনি আমার সঙ্গে ডিউটি দেবেন ব্রীজে। মিস্টার বন্ড, ডাক নাম কি আপনার? জেমস? আমি বলব, জিম। মিসেস ক্রেস্টকে স্বচ্ছন্দে লিজ বলে ডাকতে পারেন। মা ভৈঃ। দুজনে মিলে চটপট পাঞ্চ খাবার আগেই মদ্য পানের সরঞ্জাম সাজিয়ে ফেলুন তো। এবার যাওয়া যাক।
