করমর্দন করে বন্ড বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। হোটেলে যেতে যেতে ভাবতে লাগল আগামীকালের কন্ফারেন্সের কথা। মিটিং আছে মিয়ামীর উপকূল প্রহরী আর গোয়েন্দা দপ্তরের সঙ্গে। একদিন এসব ভালই লাগত, রোমাঞ্চ বোধ হত। কিন্তু এখন সব কিছুই নিরর্থক, একঘেয়ে মনে হল।
.
হিলডাব্রান্ড একটি দুষ্প্রাপ্য মাছ
গভীর পানির জগতের স্ট্রিঙ-রে মানেই মূর্তিমান বিভীষিকা। ভোঁতা নাক থেকে মারাত্মক লেজ পর্যন্ত লম্বায় দশ ফুট। এক পাখনার ডগা থেকে আর এক পাখনার ডগা পর্যন্ত ছ ফুট। গাঢ় ধূসর রঙ। ঈষৎ বেগুনী আভা মেশানো সোনালি বালির বুক থেকে উঠে কিছুদূর সাঁতরে যেতেই দূর থেকে মনে হল যেন একটা কারো ভোয়ালে ঢেউয়ের তালে ভেসে ভেসে যাচ্ছে।
কৃত্রিম পাখনা লাগিয়ে সাতরাচ্ছিল বন্ড। চোখ স্ট্রিঙ-রের ওপর। খাবার দরকার না হলে মাছ মারে না বন্ড। কিন্তু স্ট্রিঙ-রেকে সে মারবেই। কারণ স্ট্রিঙ-রে সত্যিই শরীরী আতংক।
এপ্রিল মাস। সকাল দশটার মিঠে আমেজ আকাশে বাতাসে। সিসিলি দ্বীপপুঞ্জের মাহে দ্বীপের একটি অগভীর হ্রদে, হারপুন বন্দুক নিয়ে নেমেছে বন্ড। চোখের আড়াল করছে না স্ট্রিঙ-রেকে। ও জানে, একটু পরেই ক্লান্ত হয়ে ফের বালিতে ঢুকে ঝিমোবে। পানির তলে ঐ মূর্তিমান বিপদ।
ছায়ামায়ায় আগুনের মত জ্বলছে ভারত মহাসাগরের দানবাকার অ্যানিমোন গুল্ম। ঝিকিমিকি করছে হীরে মানিকের মত মাছের দল। প্রবাল স্তূপের সেকি বাহার। বন্ডের চোখ কিন্তু এসব নিয়ে আর তন্ময় নয়। স্ট্রিঙ-রে নীল দর্পণের মত শান্ত পানিতে ঢেউ তুলে ফিরেছে জিরোবে বলে। অতি সন্তর্পণে মাথা তুলল বন্ড। গগলস্-এর পানি বার করে তাকাল সামনে। কিন্তু স্ট্রিঙ-রেকে আর দেখা গেল না।
ডগায় ক্ষুদে ত্রিশূল গাঁথা শক্তিশালী হারপুন বাগিয়ে এবার শুরু হল ড্রিঙ-রেকে খোঁজার পালা। এগোতে হচ্ছে খুব সাবধানে। পানি তোলপাড় হলেই আবার উধাও হবে ট্রিঙ-রে। আবছা অন্ধকারে অন্য বিপদের আশঙ্কাও করছে বন্ড। অবশ্য পানিতে রক্ত মিশলেই হাঙর জাতির আগমন সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। তা না হলে–
আচমকা মসৃণ বালির ওপর দুটি মাত্র ফুটো দেখল বন্ড। নাকের গর্তের মত দুটি ছিদ্র। গর্ত ঘিরে থির থির করে। বালি কাঁপছে। গর্তের ঠিক পেছনেই বালি খানিকটা উঠে রয়েছে–অর্থাৎ স্ট্রিঙ-রের লুকানো দেহ। ল্যাজের ধাক্কাটা কোনদিকে আসতে পারে হিসেব করে নিল বন্ড। তারপরেই হারপুন বন্দুক নামিয়ে টিপল ট্রিগার।
ওপর দিকে বালি লাফিয়ে উঠল। সেকেন্ড কয়েক কিছুই দেখা গেল না। পরক্ষণেই টান টান হল হারপুনের দড়ি। ঐতো ড্রিঙ-রে। বিষাক্ত পাখনা নেড়ে পালাচ্ছে হারপুন গাথা শরীর নিয়ে। বিষযুক্ত যে পাখনায় মৃত্যু ঘটেছে ইউলিসিসের। যার ধাক্কায় আস্ত গাছ সুদ্ধ উপড়ে আসতে পারে, যার একটিমাত্র ঝাঁপটায় ভারত মহাসাগরের বিষ। ছড়ানো পানিতে মৃত্যু অনিবার্য–তার ছোঁয়াচ থেকে বেশ খানিকটা তফাতে রইল বন্ড। এককালে স্ট্রিঙ-রের ল্যাজ দিয়ে দাস ব্যবসায়ীরা চাবুক বানাতো। সিসিলিতে এ চাবুক রাখা বেআইনি হলেও ঘরে ঘরে তা আছে, ব্যভিচারিণী স্ত্রীদের শায়েস্তা করার জন্য। মারাত্মক সেই ল্যাজের ঝাঁপটা যেন ক্রমশ কমে আসছে। অগভীর পানিতে এসে আচম্বিতে শূন্যে লাফিয়ে উঠল স্ট্রিঙ-রে, আছড়ে পড়ল বালির ওপর। রোদ্দুরে সাদা পেট উল্টে খাবি খেতে লাগল অতিকষ্টে।
যমালয়ের পথ দেখতে পেয়েছে স্ট্রিঙ-রে। কিন্তু ভারি মাছটাকে নিয়ে বন্ড এখন করে কি?
খাকী শার্ট আর ট্রাউজার্স পরা বেটেখাটো মোটাসোটা একটা লোক হাসতে হাসতে বেরিয়ে এল তালগাছের ছায়া থেকে। বলল, সাবাস, মিঃ জেমস বন্ড।
বন্ড বলল, ফাইডেল, এ ব্যাটা তো দেখছি সহজে মরবে না। হারপুনটা গায়ে গেঁথে রয়েছে। কাউকে পাঠিয়ে দেবেন? কাহাতক দাঁড়িয়ে থাকা যায়।
ভাগ্যিস ঠিক জায়গায় হারপুন মেরেছেন। নইলে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে পাথরে আছড়াতো আপনাকে। যাক, লোক পাঠাচ্ছি আপনার হারপুন উদ্ধারের জন্য। ল্যাজটা দরকার না কি?
হেসে ফেলল বন্ড, নিয়ে করবে কি? ঘরে বউ তো নেই।
রাস্তার ওপর দাঁড়িয়েছিল ফাইডেলের স্টেশন ওয়াগন। সিসিলি দ্বীপপুঞ্জে প্রায় সবকিছুই বার্বে ফ্যামিলির দখলে। বার্বে এদের কনিষ্ঠতম কুবের। গাড়ির দিকে যেতে যেতে সে বলল, মিলটন ক্রেস্টের নাম শুনেছেন? মার্কিন কুবের। ক্রেস্ট হোটেল গ্রুপের মালিক। ক্রেস্ট ফাউন্ডেশনের কর্ণধার। এমন একখানা বজরার মালিক যার জুড়ি সারা ভারত মহাসাগরে নেই। নাম ওয়েভক্রোস্ট। দেখবার মত বজরা। সুন্দরী বউ থেকে পেল্লায় ট্রানসিসটর গ্রামোফোন পর্যন্ত, সবই আছে ঐ বজরায়। আগাগোড়া এয়ারকন্ডিশন করা। দামী কার্পেট পাতা ব্রেক ফাস্টে প্যারিসের সেরা শ্যাম্পেন। আরে মশাই কি যে নেই সেখানে তাই ভাবি। মিস্টার ক্রেস্ট বজ্জাত হলেন তো বয়ে গেল। বজরাটা তো আরাম দেয়।
আরাম দিক, না দিক তাকে আমার কি?
মাই ফ্রেন্ড, মিস্টার ক্রেস্টের সঙ্গে দিন কয়েক হাওয়া খেতে বেরোচ্ছি। আপনিও আসছেন। ডাকসাইটে সুন্দরী মিসেস ক্রেস্টও থাকছেন। যাচ্ছি শাগ্রিন দ্বীপে। বছর পাঁচেক ও তল্লাটে যেতে পারিনি। ক্রেস্টের খুব শখ হয়েছে যাবার। ভদ্রলোকের নাকি সামুদ্রিক নমুনা সংগ্রহের বাতিক। ফাউন্ডেশনের ব্যাপার। শানি দ্বীপে এমন কতকগুলো মাছ পাওয়া যায় যা নাকি দুনিয়ার আর কোথায়ও পাওয়া যায় না। রগড় কম নয় দেখে নিয়ে যাচ্ছি ওদের পথ দেখিয়ে।
