আমার দেওয়া জড়োয়া গয়না আর ফার বেঁচে দিও।
খুবজোর পঞ্চাশ পাউন্ড হবে তাতে।
গতর খাঁটিয়ে রোজগার কর।
কাজ খুঁজতে সময় তো লাগবে। থাকব কোথায়? পনের দিনের মধেই এ বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে। উপোস করে থাকব আমি?
ফিলিপ ঠাণ্ডা চাহনিতে বলল, তুমি রূপসী, উপোস কখনও করতে হবে না।
ফিলিপ, একটু দয়া কর। গভর্নমেন্ট হাউসে গিয়ে ভিক্ষে করলে কি তোমার মুখোজ্জ্বল হবে?
দু চারটে টুকিটাকি জিনিস ছাড়া বাড়িতে নিজস্ব কিছুই ছিল না। ফার্নিচার সমেত ভাড়া নেওয়া বাংলো। আগের সপ্তাহ লিস্ট মিলিয়ে গেছে ফার্নিচারের। ফিলিপের নিজস্ব বলতে ছিল শুধু একটা পুরোনো মরিস গাড়ি আর রেডিওগ্রাম। বউয়ের চিত্তবিনোদনের শেষ চেষ্টা এই রেডিওগ্রাম। এইটা কিনে দেওয়ার পরেই গল খেলায় মাতে রোড়া।
গিন্নীর দিকে শেষবারের মত তাকাল ফিলিপ। বলল, বেশ, গাড়ি আর রেডিওগ্রাম তোমাকে দিলাম। গুড বাই, বলে নিজের ঘরে চলে গেল।
বন্ডের দিকে তাকালেন গভর্নর। ঠোঁটে হাসি নিয়ে বললেন, ভাবছেন, বিদায়কালে ফিলিপ উদারতা দেখিয়ে গেল, তাই না? শুনুন তাহলে। ফিলিপ বারমুড়া ছেড়ে যেতেই রোডা গয়না আর ফার নিয়ে গাড়ি হাঁকিয়ে পুরোনো জিনিসপত্র বেচাকেনার দোকানে গেল। গয়নায় পেল চল্লিশ পাউন্ড আর ফারের বদলে সাত পাউন্ড। গাড়ি বেচতে গিয়ে দেখা গেল, ফিলিপ গাড়িটা কিনেছে হায়ার পারচেজ চুক্তিতে। অর্থাৎ মাসে মাসে টাকা দিতে হচ্ছে তাও কয়েক মাসের টাকা বাকি। সব মিলিয়ে দু শ পাউন্ড হবে। ফিলিপকে উকিলের চিঠি দেওয়া হয়েছে শুনেই রোড়া কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। গাড়ি বেচা তো দূরের কথা দুশ পাউন্ডের দেনার দায়ে পেট্রোল সমেত গাড়ি ছেড়ে আসতেই সে রাজি। কিন্তু তা নিয়ে তো দুশ পাউন্ড ওঠে না। কোর্টে মামলা উঠবেই। ফিলিপের দেনার দায়ে রোডাকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে। যাক, অনেক কথা কাটাকাটির পর রোডা রেহাই পেল। এবার রেডিগ্রামের দোকান। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল। এই বস্তুটিও কেনা হয়েছে দফায় রফায় টাকা দেবার শর্তে। দেনা সেখানেও। অতিকষ্টে সেখানেও একটা রফায় এল রোডা। রেডিওগ্রাম তো গেলই নগদ দশ পাউন্ডও গেল। বাড়ি ফিরে সারাদিন মুখ গুঁজে কাঁদল রোডা। তার দর্প চূর্ণ হয়েছে। বিদায়কালেও ফিলিপ লাথি মেরে গেল।
একটু থেমে গর্ভনর বললেন, মানুষ মানুষকে যত ঘৃণাই করুক, যত অপছন্দই করুক আরাম বা সান্ত্বনা পেলেই সব ভুলে যায়। যার নাম দিয়েছি কোয়ান্টাম অভ সোলেস। সেই জিনিস খানিকটা ফিলিপকে দিলেই রোডার সাতখুন মাপ করে দিত ফিলিপ। কিন্তু নৃশংস ব্যবহার, নিষ্ঠুর আচরণ, নির্মম ঔদাসীন্য ছাড়া সে কিছুই পায়নি বোডার কাছে। অন্তর কতখানি বিষিয়ে গেলে মানুষ অতটা নির্মম হতে পারে। পৈশাচিক নিষ্ঠুরতার চরমতম নমুনা দেনা সমেত রেডিওগ্রাম আর গাড়িটা রোডাকে দিয়ে যাওয়া। ফিলিপ যখন নেই, তখনও যাতে ফিলিপের ঘৃণা রোডাকে দগ্ধে দগ্ধে মারে তার সুচারু ব্যবস্থা, নিখুঁত ফন্দি।
বন্ড বলল, ঘৃণার বিষে অন্তর নীল হয়ে গেলে এমনিই হয়। দুঃখ হচ্ছে মেয়েটার জন্য। তারপর কি হল?
উঠে দাঁড়ালেন গভর্নর, রাত বারোটা বাজে। চলুন আপনাকে এগিয়ে দিই। যেতে যেতে বলছি। ফিলিপের কি হল আগে শুনুন। চাকরিতে আগের মত মনপ্রাণ ঢেলে দিল কিন্তু আগের মত আর নাম হল না। রোজা তার মনকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। মানবিকতা জিনিসটা মুছে গিয়েছিল মন থেকে। তাই কিছুদিন পরেই সে অবসর নিয়ে ফিরে গেল তাদের কাছে যাদের কাছে সে ভালবাসা পেয়েছিল, যেখান থেকে এই কাহিনীর শুরু–সেই নাইজিরিয়ান।
মেয়েটার?
অবস্থা খুবই শোচনীয় হল। শুধু দাক্ষিণ্যের ওপর আর কতদিন চলে। আবার এয়ার হোসটেস হবার চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু অভব্যভাবে চাকরি ছাড়ার ফলে সে দরজাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। রূপ ভাঙিয়ে কিছুদিন রক্ষিতা হিসেবেও ছিল অনেকের কিন্তু বারমুডায় বার কয়েক হাতবদল হবার পর রূপোজীবীকে সাধারণ স্বৈরিণীর পর্যায়ে নামতেই হবে। রোডার সেই অবস্থা হল। পুলিশের নেক নজর পড়ল তার ওপর। ঠিক তখন বিধাতা আবার সদয় হলেন তার ওপর। দেখলেন অনেক সাজা পেয়েছে মেয়েটা, তাই গভর্নরের স্ত্রীর দয়ায় একটা চাকরী জুটল জ্যামাইকায়। হোটেল রিসেপশনিস্টের কাজ। বড় হোটেল। বহু ধনীর আবির্ভাব ঘটে সেখানে। এখানে এলেন একদিন কানাডার এক কোটিপতি। শীতকাল কাটিয়ে দেশে ফিরবার সময় রোডাকে কানাডায় নিয়ে বিয়ে করলেন। রোডা এখন তার সহধর্মিনী।
দারুণ কপাল তো। বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়া।
ঠিক তা নয়। জীবন বৈচিত্র্যে ভরা। ফিলিপের অনেক ক্ষতিই করেছে রোডা। তার সাজাও পেয়েছে। আসলে দায়ী হল ফিলিপের বাবা মা। ছেলেকে তারা ভঙ্গুর করে গড়েছিল। তাই ধাক্কায় গুঁড়িয়ে ফের মজবুত হয়েছিল ফিলিপ। রোডাকে বিধাতা পাঠিয়েছিলেন ওকে শক্ত করার জন্যই। রোড নিমিত্তমাত্র। যাক, রোডা এখন সুখী। তার স্বামীও সুখী। আজ রাতে তাদের মুখ আপনিও দেখেছেন।
বন্ড হেসে বলল, ধন্যবাদ এই গল্পের জন্য আমাকে ক্ষমা করবেন। মিসেস হার্ভে মিলারকে আমি সইতে পারছিলাম না কিছুতেই। এ কাহিনী শোনাবার পর তাকে কোনদিন ভোলা যাবে না। আচ্ছা শিক্ষা দিয়েছেন আমাকে। আজ থেকে আর কাউকে অবজ্ঞা করব না।
