ফিলিপ মাস্টার্স বাড়ি ফিরল সেই সময়ে।
থামলেন গর্ভনর। তারপর বললেন, আপনি বিয়ে করেননি। সব নর-নারীর সূত্রের যোগ কিন্তু একটা জায়গাতেই ঠেকে আছে। বিবাহিত জীবনে সব অপরাধ ক্ষমা করা যায়। এমন কি খুন করার ক্ষমাও পাওয়া যায় কিন্তু মনুষ্যত্বের অভাব ঘটলে বিবাহ ভেঙে যায়। কয়েকশ দম্পতির ক্ষেত্রে আমি একই কাণ্ড দেখেছি। একজন অসুস্থ না সুস্থ, জীবিত মৃত, মানবিকতার এই সহজ অনুসন্ধিৎসাও যখন অপর জনের মধ্যে জাগে না, সহজতম মনুষ্যত্বের যখন এইভাবে মৃত্যু ঘটে, বিবাহ তখন ভাঙতে বাধ্য। ল অভ দি কোয়ানটাম অভ সোলেস নাম করণ করেছি এই থিয়োরীর।
বন্ড বলল, ভারি চমৎকার নাম তো। মনে দাগ রেখে যায়। কোয়ানটাম অভ সোলেস স্বাচ্ছন্দ্যের পরিমাপ। বন্ধুত্ব না প্রেম টিকে থাকে শুধু এই আরামের পরিমাপের ওপর। মানুষ এই আছে এই নেই। পরস্পরের প্রতি দরদ যখন শূন্য হয়, মৃত্যুকামনা তার জায়গা নেয়–কোয়ানটাম অভ সোলেস দাঁড়ায় শূন্যের ঘরে।
গর্ভনর বললেন, ফিলিপ মাস্টার্স, যে মুহূর্তে বাংলোর চৌকাঠ পেরোচ্ছে। সেই মুহূর্তে কেউ তার বউকে হুঁশিয়ার করে দিলে ভাল হত। ওপর ওপর দেখেও কিছু বোঝেনি রোডা। যদিও ফিলিপের সে গোঁফ আর নেই, চুল আবার আগের মতই উস্কখুস্ক। চিবুকের রেখা শক্ত। রোড়া সাদাসিধে একটা ফ্রক পরে বই নিয়ে বসেছিল। রোডা এমনভাবে বসেছিল যাতে ফিলিপ ঘরে ঢুকলেই বই থেকে চোখ তুলবে বোডা। কিন্তু আগ বাড়িয়ে কথা বলবে না। যেন সাত চড়ে রা টি নেই মুখে। এমনি বিনীতভাবে তাকিয়ে থাকবে। ফিলিপ আগে কথা বললে রোড়া উঠে গিয়ে সামনে দাঁড়াবে। স্বাগত জানিয়ে একে একে সব খুলে বলবে আর অঝোরে কাঁদবে। ফিলিপ তখন ওকে বুকে টেনে নেবে। প্রতিশ্রুতির পর প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাবে রোন্ডা। জীবনে আর হ্যাঁন করব না ত্যান করব না।
হুবহু সেইভাবেই বোবা চোখে বই থেকে মুখ তুলল রোডা। ফিলিপ নিঃশব্দে গিয়ে দাঁড়াল ম্যান্টল পিসের সামনে। আনমনা চোখে চাইল রোডার দিকে। উদাসীন শীতলতা ছাড়া আর কিছু নেই চোখে। পকেট থেকে এক তাড়া কাগজ বার করে বলল, এ বাড়ির প্ল্যান। দু ভাগ হল বাড়ির ঘরদোর। তোমার, তোমার ভাগে রান্নাঘর আর তোমার শোবার ঘর। আমার ভাগে এই ঘর-আর বাড়তি শোবার ঘর। আমি যখন থাকব না তখন বাথরুমে যেতে পার। কাগজটা রোডার খোলা বইয়ের ওপর ফেলে–আমার ঘরে আর কখনো ঢুকবে না। আমার বন্ধু-বান্ধব এলে অবশ্য আসবে। রোড়া কিছু বলার আগেই ফিলিপ বলল, প্রাইভেটে তোমার সঙ্গে আমার এই শেষ কথা। এরপর তুমি কথা বললেও আমি জবাব দেব না। কিছু বলবার থাকলে চিরকুট লিখে কলতলায় রেখে দেবে। ঘড়ি ধরে খাবার দাবার যেন পাই ডাইনিং রুমে। আমার খাওয়ার পরে তুমি ডাইনিং রুমে আসবে। ঘরসংসার দেখার জন্য মাসে কুড়ি পাউন্ড তোমায় দেব। এ টাকা প্রতি মাসের পয়লা তারিখে আমার অ্যাটনীর মারফত পাবে। তোমাকে আমি ডিভোের্স করছি। একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ তোমার বিরুদ্ধে অনেক প্রমাণ সাজিয়ে কেস খাড়া করে দিয়েছে। বারমুডায় আমার মেয়াদ ফুরোবে আর এক বছর পরে। আমাদের বিবাহবিচ্ছেদ শুরু হবে এখন থেকেই। এই এক বছর সবার সামনে আমাদের স্বামী-স্ত্রীর মতই অভিনয় করতে হবে।
কথা শেষ করে পকেটে হাত গুঁজে বিনয় কোমল চোখে স্ত্রীর দিকে তাকাল ফিলিপ। রোডার চোখে তখন অশ্রুর ধারা বইছে। নির্বিকার গলায় ফিলিপ বলল, যদি বিশেষ কিছু বলবার থাক বলতে পার। নইলে রান্নাঘরে গিয়ে নিজের বলতে যা কিছু আছে সঙ্গে নিয়ে যাও–ডিনার খাব রোজ রাত আটটায়। এখন সাড়ে সাতটা বাজে।
থামলেন গভর্নর। চুমুক দিলেন হুইস্কিতে। বললেন, রোডা চেষ্টার ত্রুটি করেনি। কান্নাকাটি, মিনতি, অনুরোধ কিছুই কাজে লাগেনি। ফিলিপ কিন্তু অটল। শেষকালে রাজি হতেই হল রোডাকে। সঙ্গে কানাকড়িও নেই। দু বেলা খাওয়া আর রাত্রে মাথা গোঁজার জন্য এ প্রস্তাব মেনে নিতে হল। তারপর ফিলিপ কাজে ডুবে গিয়েছিল। আগের মতই তুখোড় কর্মবীর হওয়ার জন্য সবাই খুশি হয়েছিল। যাক, একটা সুখী দম্পতির সুখ তাহলে ফিরে এসেছে।
এক বছর দেখতে দেখতে কেটে গেল। ফিলিপের বদলির সময় এল। বহু বিদায় সম্বর্ধনায় স্বামী স্ত্রী হাজির হল যুগলে। ফিলিপ সবার কাছে বলল, রোডা জিনিসপত্রের বিলি ব্যবস্থা করে পরে যাবে। কিন্তু জাহাজে ফিলিপকে উঠিয়ে দিতে রোডা আসেনি দেখে অবাক হয়েছিলাম। ফিলিপ জানালেন, শরীর খারাপ, তাই আসেনি। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের খবর ইংল্যান্ড থেকে বারমুডায় এল। গভর্নরের স্ত্রীর কাছে হাউমাউ করে যোডা প্রথম সব কথা ফাঁস করল। ফিলিপের সর্বশেষ মারের কথাও বলল ফোঁপাতে ফোঁপাতে।
হুইস্কিতে ফের চুমুক দিলেন গভর্নর, যেদিন বারমুড়া ছেড়ে যাচ্ছে ফিলিপ সেই দিনই কলতলায় গিয়ে রোডার লেখা একটা চিরকুট পাওয়া গেছে কলতলায়। ফিলিপ ছিঁড়ে কুচিকুচি করে রেখে দিয়েছে বেসিনের তাকে। সেবার চিরকুটের ওপর ছিল, সন্ধ্যে ছ টায় বসবার ঘরে তার দেখা পাওয়া যাবে। যথাসময়ে রান্নাঘর থেকে চুপিসাড়ে ঘরে ঢুকল রোডা। আবেগ দিয়ে আগেই অনেক চেষ্টা করেছিল রোড়া স্বামীকে টলানোর, কিন্তু বৃথা। তাই মিনমিনে গলায়, কাছে মাত্র দশ পাউন্ড রয়েছে, ফিলিপ গেলে খাবে কি?
