ছ মাস মহানন্দে কাটাল দুজনে। ওদের সুখ সবাইকেই সুখী করল। তারপর থেকেই শুরু হল গিন্নীর গজ গজানি। ককটেল পার্টি ফের কবে হবে? অমুকের স্ত্রী মার্কেটে যাবার সময়ে তাকে নিয়ে যায় সে নিয়ে যায়, না কেন? আর একটা পোমোশন না হওয়া পর্যন্ত বাচ্চা হলে মানুষ করার সঙ্গতি কোথায়? সারাদিন একা-একা আর ভাল্লাগে না, ইত্যাদি। তারপর শোনা গেল, বউ-এর মন জোগাতে হামেহাল মেহন করছে ফিলিপ। সকালে উঠে বউকে সকালের নাস্তা এনে দেওয়া থেকে শুরু করে বিকালে বাড়ি ফিরে ঘর ঝাট, সিগারেটের ছাই আর চকোলেটের মোড়ক পরিষ্কার কিছুই বাদ যাচ্ছে না। এমন কি সিগারেট আর মদ খাওয়া ছেড়ে দিল ফিলিপ। সাধু কারণে নয়-বউয়ের দামী পোশাকের পয়সা জোগাতে-নইলে অমুকের বউয়ের কাছে মান থাকছে না এয়ার হোসটেসের। কি করে যে বউকে খুশি করবে, দিনরাত তাই ভাবত ফিলিপ। শেষে ধরল গ। ডুবল এইতেই।
গলফ খেলা শিখতে শুরু করল রোডা। শেখায় ত্রুটি রইল না। ঘর্মাক্ত কলেবরে রোভার প্র্যাকটিসের বহর দেখে স্বয়ং গভর্নরও তারিফ করলেন বহুবার। তারপর এল একটা কমপিটিশন। রাডার জুটি হল যে, নামতার ট্যাটারসাল। বয়েসে ছোকরা। বড়লোকের ছেলে। দেখতে ময়ূরছাড়া কার্তিকের মত। ভাল সঁতারু। বজরা আর স্পীডবোটের মালিক। কাজেই বান্ধবীর অভাব নেই। এক শয্যায় চটপট না শুতে দিলে কোন মেয়েকেই বজরা, স্পীডবোট বা নাইট ক্লাবে নিয়ে যায় না। কাজেই কি চরিত্র বুঝতেই পারছেন।
রোডা আর ট্যাটারসাল বিস্তর খেটে জয়ী হল প্রতিযোগিতায়। আহ্লাদে আটখানা হয়ে বউকে অভিনন্দন জানাল ফিলিপ। জীবনে সেই শেষ অভিনন্দন জানানো হল গিন্নীকে-কেননা পরের দিন থেকে ট্যাটারসাল ছোরার সঙ্গে উড়তে শুরু করল রোডা।
রেখে-ঢেকে নয়। খোলাখুলি ফিলিপের সঙ্গে শুরু হল ব্যভিচার। নিষ্ঠুর আঘাতের পর আঘাত দিয়ে চলল গোবেচারা স্বামীকে দগদগে ঘায়ের ওপর পর-পর খোঁচা মারতে তিলমাত্র দ্বিধা করল না রোডা। এমন কি ছলছুতোয় শোবার ঘরও আলাদা করে নিল–কারণ ফিরতে তো প্রায়ই রাত হয়। গিন্নীর জন্য রাত জেগে বসে না থেকে আলাদা ঘরে ঘুমিয়ে পড়লেই পারে ফিলিপ।
ঢি ঢি পড়ল সমাজে এক মাসের মধ্যেই। কেলেংকারী চরমে ওঠার আগেই গর্ভনরের স্ত্রী নিজে একদিন বোডাকে বোঝালেন। ফিলিপকেও শক্ত হতে বললেন। বাড়িতে ঝগড়া, কান্না রোজ রাতের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। বউকে একরাতে। প্রায় গলা টিপেই মারতে গেল ফিলিপ। তার যে মুখ স্বর্গের সুখ ভাসত, বারমুডায় আসার বছর খানেকের মধ্যেই সে মুখে নরকের ছায়া দেখলাম। ফিলিপ বন্ধুবান্ধব কাউকে এ প্রসঙ্গে নিয়ে কথা বলতে দিত না–বলতে গেলই খেঁকিয়ে উঠত জখমী কুত্তার মত। একদিন বড় করে আমার মদ গেলালাম। কলতলায় গেল ফিলিপ। তারপরেই-ধড়াস করে কি যেন আছড়ে পড়ল। শুনেই দৌড়ালাম। দেখলাম, ক্ষুর দিয়ে কব্জির ধমনী কাটবার চেষ্টা করছে ফিলিপ।
আত্মহত্যার সেই প্রচেষ্টার পর সত্যিই আমরা ভয় পেলাম। গর্ভনরকে ধরলাম। তিনি বললেন, ফিলিপের চাকরিই থাকে কিনা সন্দেহ। কাজকর্ম তো গোল্লায় গেছে। সমাজেও তার বউ কেলেংকারী করে বেড়াচ্ছে। যাক, অনেক ধরাধরি করে ফিলিপকে ওয়াশিংটনে পাঠানো হল মাস পাঁচেকের মেয়াদে নতুন কাজের ভার দিয়ে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাচলাম সবাই। রোডা মাস্টার্সের ব্যভিচার নিয়েও মাথা ঘামানো বন্ধ করলাম।
রুমাল বার করে কপাল মুছলেন গর্ভনর। হুইস্কি ঢেলে নিজে গলায় ঢাললেন। বন্ডকেও দিলেন। দেখা গেল স্মৃতির রোমন্থর করতে গিয়ে বিলক্ষণ উত্তেজিত হয়েছেন তিনি। মুখ লাল হয়েছে, চোখেও চকমকির ঝিকিমিকি দেখা। দিয়েছে।
বন্ড বলল, ভারি নষ্ট মেয়ে তো। পাকা স্বৈরিণী। পরে অনুতাপ জেগেছিল নিশ্চয়?
নতুন একটা চুরুট ধরিয়ে নিয়ে গর্ভনর বললেন, না। অনুতাপের অবকাশ ছিল না। সময় ভালই কাটছিল। তাল গাছের বালিতে শুয়ে কেলি করা থেকে শুরু করে স্পীডবোটে চেপে মাঝ দরিয়ায় গিয়ে রোমান্স করা–সবই তো হচ্ছিল, বেশিদিন এ আনন্দ নাও টিকতে পারে। রোডা কি তা জানত না? নিশ্চয় জানত। এ কথাও জানত যে, সে সময় এসে ফিলিপের কাছে চোখের পানি ফেলে নাকিসুরে কেঁদে ক্ষমা চেয়ে নিলেই হবে খন। এখন তো মজা করে নেওয়া যাক। বাকি সময়টুকু কাটাবার জন্য দুদণ্ড ঘুমিয়ে নেওয়ার জন্য, জামাকাপড় পালটানোর জন্য স্বামীর বাংলো তো রইলই। ফিলিপ যদি বেঁকে দাঁড়ায় তো স্বামীর অভাব হবে না। আরো চটকদার স্বামী তুড়ি মারলেই পাওয়া যাবে গলফ ক্লাবে।
রোডার এই অহংকারকে যাচাই করার জন্যই যেন ট্যাটারসাল এবার সরে দাঁড়াল। গভর্নর আর তাঁর স্ত্রী ছোকরার বাপ-মাকে ঝেড়ে কাপড় পরিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে, তাঁরা উঠতে বসতে মান্য করতে লাগল ছেলেকে। কেলেংকারীর কেচ্ছায় যে কান পাতা দায়। ট্যাটারসালও দেখল, গরমের ছুটি কাটাতে মার্কিন সুন্দরীরা আসছে দ্বীপে। এ সময়ে একটু মুখ না বদলালে মেজাজ আসছে না। রোডাকে অছিলা দেখাল। বাবা হাত খরচ বন্ধ করে দেবে ভয় দেখিয়েছে। কাজেই আজ থেকে মেলামেশা বন্ধ। রোড টু শব্দটি করল না। ওতো জানত, এ ঘটনা একদিন-না-একদিন ঘটবেই। ইনিয়ে-বিনিয়ে কেঁদে এল গভর্নরের বউয়ের কাছে। কথা দিল এবার থেকে ফের ঘর-সংসারে মন দেবে। ফিলিপকে সুখী করবে। বাড়ি বসে রোজ মহড়া দিতে লাগল, ফিলিপ ওয়াশিংটন থেকে দিন পনের পরে ফিরলেই কিভাবে অনুতাপের কান্না কাঁদতে হবে। কি কি সাজানো কথা বলতে হবে। এয়ার হোসটেস সুলভ মিছরী ভিজানো গলায় সোহাগ চাইবে। আবার জোড়া বিছানা পাতবে ইত্যাদি।
