বস্তুটা তুলে নিল বন্ড। ভারি ধাতুর পাতে লাগানো একটা চাবি। পাতে খোদাই করা হোটেলের নাম আর ঘরের নম্বর :
অ্যালবার্গো ভ্যানিযেলি। রুম ৬৮
ফর ইওর আইজ অনলি (পার্ট ২)
কোয়ানটম অভ সোলেস–সান্ত্বনার পরিমাপ
জেমস বন্ড বলল, বিয়ে যদি করি তো করব এয়ার-হোসেটেসকে, এই আমার বরাবরের ইচ্ছে।
ডিনার পার্টি শেষ হতে চলেছে। রাত তখন সাড়ে-নটা। অন্য দুই অভ্যাগতকে প্লেন ধরিয়ে দিতে গেছে গর্ভনরের এ.ডি.সি.। সু-সজ্জিত ড্রইংরুমের আরামদায়ক চেয়ারে বসেছিলেন গভর্নর আর বন্ড। আরামদায়ক চেয়ারে বসেও মোটেই আরাম পাচ্ছিল না বেচারী বন্ড। মনে মনে পছন্দ হাতলঅলা শক্ত কুশনের চেয়ার-এমন চেয়ার যাতে বসলে মাটিতে পা ঠেকে থাকবে। নরম সোফায় বসে তাই যুত হচ্ছিল না মোটই।
ন্যাসো জায়গাটাও মোটেই মনে ধরেনি বন্ডের। এ তল্লাটে বড় লোক ছাড়া যেন কেউ থাকে না। শীতকালে যারা বেড়াতে আসে, তারাও নিজেদের টাকার পাহাড়, অসুখ-বিসুখ আর চাকর-বাকরের সমস্যা ছাড়া আলোচনাই করে না। জমিয়ে আড্ডা মারতে জানে না কেউ। যে দু জনকে এই মাত্র এ.ডি.সি. প্লেনে চড়িয়ে দিতে গেল, তারাও এ নিয়মের ব্যতিক্রম নয়। মিস্টার এবং মিসেস হার্ভে মিলার টাকার কুমির। নিবাস কানাডায়। বউটা খুব সম্ভব ইংরেজ মেয়ে। কিন্তু এত বকবক করে যে কান ঝালাপালা করে দেয়। থিয়েটার নিয়ে বন্ডের কাছে আলোচনা করতে গিয়ে নিজেই বেকুব বনেছে। কেননা, দুবছর হল থিয়েটারের মঞ্চ চোখেও দেখেনি বন্ড। একবারই গিয়েছিল, তাও একজনের পিছু নিয়ে। ফলো করতে গিয়ে থিয়েটার দেখতে হয়েছিল।
বন্ডের অনুমান বেরসিক এই দম্পতাঁকে সঙ্গদান করার জন্যই বন্ডকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন গভর্নর। নেহাত্ব কর্তব্য। সাতদিনও হয়নি এ অঞ্চলে এসেছে বন্ড। রুটিন মাফিক কাজ। কিউবাতে ক্যাসট্রেী বিদ্রোহীদের কাছে গোলাবারুদের এন্তার চোরাই চালান যাচ্ছে আশপামের রাষ্ট্র থেকে। আমেরিকা দু-জাহাজ হাতিয়ার ধরে ফেলতেই ক্যাসট্রোর। সমর্থকরা ঘাটি নিয়েছে জ্যামাইকা আর বাহামায়। বন্ডের ওপর ভার পড়েছিল এ ঘাঁটি ভেঙে দেওয়ার। ধরপাকড়ের ধার দিয়েও যায়নি ও। রাতের আঁধারে দু-জাহাজ হাতিয়ার পাচার বন্ধ করেছে অভিনব উপায়ে। পুলিশ লঞ্চে চেপে জাহাজে পৌঁছেছে। অন্ধকারে গা মিশিয়ে ডেকে উঠেছে। প্রতিটি ভোলা পোর্টহোলের মধ্যে দিয়ে এক-একটা থারমাইট বোমা ফেলে নিমেষে চম্পট দিয়েছে। দূর থেকে দেখা গেছে পানির ওপর অগ্নিদেবের প্রলয় নৃত্য। M-এর হুকুম অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে বন্ড, কিন্তু অতি অল্প সময়ের মধ্যে।
গভীর রাতের প্রচও অগ্নিকাণ্ডের হোত যে জেমস বন্ড স্বয়ং, এ তথ্য পুলিশ প্রধান আর সঙ্গী দু জন অফিসার ছাড়া আর কেউ জানে না। এমন কি গভর্নরকেও কিছু বলা হয়নি। ভদ্রলোক শান্তিকামী মানুষ, অশান্তি দিয়ে অশান্তি নিবারণের পন্থায় বিশ্বাসী নন। এই কারণেই বন্ডকেও তার মনে ধরেনি মোটেই। বন্ডের সূঙ্গে প্রথম করমর্দনের মধ্যেই বিতৃষ্ণাটা প্রকাশ করে ফেলেছেন। যে যাই বলুক, বন্ডের মত বিপজ্জনক লোকের সঙ্গে মাখামাখি করে নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যতটা তো নষ্ট করতে পারেন না গভর্নর!
কাজেই ভিজে ভিজে আসরকে একাই মাতিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল গর্ভনরের এ.ডি.সি,। ডিনার শেষে বিরক্তিকর হার্ভে মিলার দম্পতাঁকে এয়ার পোর্টেও নিয়ে গেছে। ঠিক তখন, কথায় কথায় বন্ড বলে ফেলেছিল বউ করলে এয়ার হোস্টেসকেই বউ করা উচিত। উড়োজাহাজের এই সেবিকা মেয়েরা নাকি যাত্রীদের বড়ই আদর-যত্ন করে। আসলে, বিয়ে করে গোলাম হওয়ার কোন ইচ্ছাই নেই বন্ডের। কফি এবং মদ্যপান শেষ না হওয়া পর্যন্ত ছুটি নেই। তাই সময় কাটানোর জন্যই এয়ার হোসটেস প্রসঙ্গ এনেছিল বন্ড।
গভর্নর চুরুটে ফের আগুন দিলেন, বললেন, আপনার মতই এয়ার-হোস্টেস-এর জন্য পাগল হয়েছিলেন ভদ্রলোক। সে কাহিনী শুনলে মন কাঁদে। শুনতে চান তো বলতে পারি।
গভর্নরকে কথা বলানোর সুযোগ পেয়ে লুফে নিল বন্ড। সোৎসাহে বলল, নিশ্চয়, বলুন না। বলে আর-এক পেগ। ব্র্যান্ডি নেবার উসিলায় সোফা ছেড়ে গিয়ে বসল হাতলঅলা উঁচু চেয়ারে।
চুরুটের নীলচে ধোয়ার দিকে তাকিয়ে শুরু করল গভর্নর।
ধরুন তার নাম মাস্টার্স, ফিলিপ মাস্টার্স। কর্মজীবনে বলতে গেলে আমার সমসাময়িক। এক বছরের সিনিয়র ছিলাম আমি। অক্সফোর্ডে স্কলারশিপ নিয়ে পড়েছে। তারপর দরখাস্ত করেছে কলোনীয়ান সার্ভিসে চাকরির জন্য। খুব একটা ধূর্ত না হলেও প্রচণ্ড খাটতে পারত ফিলিপ। কথাবার্তায় মনে দাগ রাখত। কাজেই ইন্টারভিউ বোর্ডে মনোনীত হলও। প্রথমেই যেতে হল নাইজেরিয়া। স্থানীয় লোকদের সঙ্গে গলাগলি বন্ধুত্ব হল দুদিনেই। নাইজেরিয়ার লোকদেরকে আপনজনের মত দেখেছিল বলে ভালবাসাও পেয়েছিল। স্থানীয় লোকদের এত কাছে টেনে নেওয়া সম্ভব হয়েছিল ওর মনের একটা বিচিত্র গঠনের জন্য। ঐ বয়সের ছেলেরা হয় মেয়ে-পাগল। ফিলিপ কিন্তু হল নাইজেরিয়াবাসী পাগল। সমাজের মেয়েদের দিকে কোন নজরই ছিল না ওর। এমনিতেই মুখচোরা। নিজে আগুয়ান হয়ে মেয়ে পটানোর বিদ্যেতে নেহাতই নাবালক। পড়াশুনোর ফাঁকে সময়ও পায়নি। চাকরিতে ঢুকেও সেই হাল হল। অর্থাৎ আকর্ষণটা মেয়েদের দিকে না গিয়ে গেল স্থানীয় বাসিন্দাদের দিকে।
