মাই ফ্রেন্ড, এবার কেটে পড়ার পালা। অ্যালবেনিয়ান জাহাজের সব কটা কল খুলে দিয়েছি। হু-হুঁ করে পানি ঢুকছে। তলিয়ে যাবে এখুনি। এ অঞ্চলে টেলিফোন কোথাও নেই। পুলিশ খবর পেতে-পেতেই আমরা লম্বা দেব। খবর তো দেবে জেলের দল। ওদের মোড়লকে টিপে দিয়েছি। অ্যালবেনিয়ানদের দু চক্ষে দেখতে পারে না ওরা। কাজেই আমরা পগারপার হব নির্বিঘ্নে।
বিধ্বস্ত গুদাম ঘরের ফাঁক ফোকর দিয়ে লেলিহান অগ্নিশিখা সবে দেখা দিয়েছে। সুমিষ্ট উদ্ভিজ্জ পোড়ার কুণ্ডলী পাকানো ধোয়ায় অন্ধকার হয়ে আসছে আকাশ। জেটিতে ফিরে এল কলম্বো আর বন্ড। অ্যালবোনিয়ান জাহাজ তলিয়ে গেছে। পানি ছল-ছল করছে ডেকের ওপর। হাঁটুপানি ভেঙে সেই ডেক পেরিয়ে কলম্বিনায় গিয়ে উঠল দুই মূর্তি। সেখানেও বিস্তর করমর্দন আর পিঠে থাবড়া সইল বন্ড। ইঞ্চিন চালু হল সঙ্গে-সঙ্গে। কিছুদূর যেতে না যেতেই পাহাড়ের গায়ে একদল জেলেকে দেখা গেল। কলম্বো ইটালিয়ান ভাষায় কি যেন বলল তাদের। সঙ্গে সঙ্গে ওরা হাত নেড়ে বিদায় জানাল। এক জনের মন্তব্য শুনে হাসির হররা ছুটল গোটা জাহাজে। হাসতে-হাসতে কলম্বো বন্ডকে বলল, ওরা আমাদের আবার আসতে বলছে। কেননা অ্যানকোনার সিনেমার চাইতে আমরা নাকি জমাটি খেল দেখিয়ে গেলাম।
হঠাৎ নিজেকে বড় নোংরা মনে হল বন্ডের। উত্তেজনাও যেন উধাও হল রক্ত থেকে। নিচে গিয়ে দাড়ি কামাল ধার করা ব্লেডে, শার্ট পালটাল ধার করা শার্ট পরে। পোর্টহোল খুলে দিয়ে দেখল সবুজ উপকূল আর. নীল সমুদ্র। রিভলবারের পোড়া বারুদের গন্ধে কিন্তু তখনও জিঘাংসা, মৃত্যু আর আতংকের স্মৃতি।
সেলুনে গেল বন্ড। দেখল পর্বত প্রমাণ ডিমভাজা, মাংসের চপ, কফি আর রাম নিয়ে জবর ঘাট শুরু করেছে। কলম্বো। বন্ডকে দেখেই মুখভর্তি টোস্ট চিবোতে-চিবোতে বলল, হে বন্ধু, অ্যাদ্দিনে কিস্তিমাৎ করা গেল। গুদামভর্তি কত আফিং পুড়লো জানেন? পুরো এক বছরের সাপ্লাই। কাঁচা আফিং এখান থেকে যেত নেপলসে ক্রিস্ট্যাটাসের কেমিক্যাল কারখানায়। ক্রিস্ট্যাটাস মিথ্যে বলেনি। কারখানা আমারও আছে মিলানে। মাল পাচারের সুবিধের জন্যই এ কারখানা আমারই। বাদবাকি যা কিছু বলেছে ক্রিস্ট্যাটোস, সবই নিজের কীর্তি চালিয়েছে আমার নামে। উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপিয়েছে। ক্রিস্ট্যাটোসই কাঁচা আফিং থেকে হিরোইন বানিয়ে চ্যালা চামুণ্ডাদের দিয়ে লন্ডনে চালান দেয়, আমি নই। জাহাজভর্তি পাহাড় প্রমাণ কাঁচা আফিংয়ের দাম কমসে কম দশ লাখ পাউন্ড। অর্থাৎ মাল বিক্রি হয়ে গেলেই ক্রিস্ট্যাটাস পাচ্ছে দশ লাখ পাউন্ড। মাই ডিয়ার জেমস্, আসল ব্যাপারটা তাহলে বলি আপনাকে। দশ লাখ পাউন্ডের মাল কিনতে একটা কানাকড়িও খরচ হয়নি ক্রিস্ট্যাটোসকে। কেন জানেন? উপহার, রাশিয়ার উপহার। পুরো মালটা রাশিয়া ওকে, প্রেজেন্ট করেছে ইংল্যান্ডের সর্বনাশ করার জন্য। মারাত্মক ক্ষেপণাস্ত্রের সামিল এই জাহাজভর্তি আফিং ছড়িয়ে দেওয়া হবে ইংল্যান্ডের ঘরে ঘরে। নেশায় বুঁদ করে সর্বনাশ করা হবে তরুণ সমাজের। আফিং-এর অভাব নেই রাশিয়ায়। জাহাজ ভর্তি যত চান, পাবেন। দিয়েও ওদের ভাড়ার ফুরোবে না। ক্ষেপণাস্ত্রের জন্য আফিং চাষ হচ্ছে ককেসাস অঞ্চলে। অ্যালবেনিয়া ওদের বড় ঘাঁটি। আফিংয়ের অভাব নেই। অভাব শুধু ক্ষেপণাস্ত্রটিকে ইংল্যান্ডের বুকে নিয়ে ফেলার উপযুক্ত লোকবল, জোগাড়যন্ত্র ইত্যাদি। ক্রিস্ট্যাটোস ওদের সেই অভাব পূর্ণ করেছে। আফিং ক্ষেপণাস্ত্রকে সুকৌশলে নিয়ে গিয়ে ফেলছে ইংল্যান্ডে। রাশিয়া তার মনিব। মনিবের হুকুম মতই ট্রিগার টিপে আফিং ক্ষেপণাস্ত্রের। আজ মাত্র আধ ঘণ্টার মধ্যে গোটা ষড়যন্ত্রটাকে নাশ করলাম আমরা আপনার সঙ্গে হাত মিলিয়ে। নিশ্চিন্ত মনে দেশে ফিরতে পারেন এখন। গিয়ে বলতে পারেন। আফিং চালান আজ থেকে বন্ধ হয়ে গেল। হক কথাটাও বলবেন আশা করি। বলবেন, দুই দেশের লড়াইয়ের ভয়ঙ্কর এই চোরাই হাতিয়ারের উৎক্ষেপণ কেন্দ্র কিন্তু ইটালী নয়। আমাদের পরম শত্রু রাশিয়া রয়েছে সব কিছুর মূলে। ওদেরই গুপ্তচর দফতরের অভিনব রণকৌশল মনস্তাত্তিক লড়াইয়ের আশ্চর্য অস্ত্র এই আফিং চালান। বিনা পয়সা হিরোইন বিতরণ। অবশ্য এটা আমার অনুমান। আসল ব্যাপারটা জানার জন্য হয়ত আপনাকেই পাঠানো হবে মস্কোতে। ভায়া জেমস্ সে সুদিন যদি আসে, তাহলে আল্লাহ্ করুন যেন আপনার প্রিয় বান্ধবী লিলবমের মত অপরূপ একটা সঙ্গিনীও জুটে যায়, তাহলেই দেখবেন রহস্য আপনার হাতের মুঠোয় এসে ধরা দিচ্ছে।
তার মানে? মিস কম আমার বান্ধবী হতে যাবে কেন? ও তো আপনার।
প্রবলবেগে মাথা নাড়াতে-নাড়াতে কলম্বো বললেন, ভায়া জেমস, বান্ধবী আমার বিস্তর। ইটালীতে তো আপনাকে এখন দিন কয়েক থাকতেই হবে। রিপোর্ট লিখতে হবে, খুকখুক হাসি হেসে– আমি যা বললাম, তা বাজিয়ে দেখতেও হবে তো। আমেরিকান ইনটেলিজেন্সে গিয়ে দোস্তদের সঙ্গেও আধঘণ্টা নিশ্চয় কাটাবেন জীবন কাহিনী শোনাতে। ডিউটির ফাঁকে-ফাঁকে সঙ্গী তো চাই, নইলে আমার এমন সুন্দর দেশের সৌন্দর্য কে দেখাবে আপনাকে? অসভ্য দেশে গৃহস্বামীরা অনেক বউয়ের মধ্যে থেকে একটা বউকে বেছে নিয়ে সম্মানীয় অতিথিকে দেয় আপ্যায়নের জন্য। আমিও অসভ্য। আমার বউ নেই। কিন্তু লিলবমের মত বান্ধবী আছে বিস্তর। লিলবম বিলক্ষণ বুদ্ধিমতী। আমার নির্দেশের দরকার হবে না। আপনার পথ চেয়েই সে রয়েছে হয় তো। পকেট থেকে একটা বস্তু বার করে ঠ করে টেবিলে ফেলল কলম্বো। বুকে হাত রেখে বলল সিরিয়াস চোখে– অন্তর থেকে দিলাম। জানি, লিলবমের অন্তরও সায় দেবে।
