শত্রুর মারণাস্ত্রের ঝকঝকে নল ঈষৎ ঘুরে গিয়ে বন্ডকে তাগ করার আগেই এক সেকেন্ডের মধ্যে বন্ড দুবার গুলিবর্ষণ করল। নিষ্প্রাণ আঙুল তখনও ট্রিগার টিপে থাকায় এক পাক টলে গেল মেশিনগান, এলোপাথারি গুলিবর্ষণ করতে করতে লাশ নিয়েই আছড়ে পড়ল মাটিতে।
টেনে দৌড়াল বন্ড–লক্ষ্য গুদামের খোলা দরজা। মাঝপথেই সহসা পিছলে পড়ল পা-দড়াম করে সটান আছড়ে পড়ল মাটিতে। চোট লাগল মাথাও মুখে কালচে মত কি একটা তরল বস্তু ঝরছে। ধুত্তোর বলে চার হাতপায়ে ভর দিয়ে লাফিয়ে পড়ল বন্ড। ফের দৌড়াল গুদামের দিকে। একটু আগেই নিউজপ্রিন্টের পাহাড় হুড়মুড় করে এসেছে সেখানে। বন্ড গা ঢাকা দিতে চায় রোল গুলোর আড়ালে। একটা রোলের চাকলা উঠে গেছে মেশিনগানের বুলেট বর্ষণে। কালচে বস্তুর ধারা ঝরছে, মাখামাখি হয়ে গেছে বন্ডের মুখ। মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ। এ গন্ধের আঘ্রাণ এর আগেও একবার পেয়েছে বন্ড মেক্সিকোতে। কাঁচা আফিং। এ গন্ধ এত সহজে ভোলা যায় না।
মাথার খুব কাছ দিয়েই একটা বুলেট গিয়ে বিধল গুদোমের দেওয়ালে। ট্রাউজার্সে রিভলবার মুছে নিয়ে বন্ড ছিটকে গেল দরজার ভেতরে। কি আশ্চর্য। কেউ তো গুলি করল না। খোলা দরজায় ওর ছায়ামূর্তি লক্ষ্য করে দু-চারটে গুলি ভেতর থেকে ছুটে আসবে এই আশাই বন্ড করেছিল। কিন্তু কোথায় কি! নিবিড় শান্তি বিরাজ করছে ভেতরে। আলো নেভানো। তবে ফিকে আলোয় দু পাশে সাজানো নিউজপ্রিন্ট, মাঝখানে রাস্তা দেখা যাচ্ছে। সঙ্কীর্ণ গলিপথ। গলির শেষে একটা দরজা। যেন হাতছানি দিচ্ছে বন্ডকে।
প্রচণ্ড সেই প্রলোভনের মধ্যে মৃত্যুর গন্ধ পেল বন্ড। পা টিপে টিপে খোলা জায়গায় বেরিয়ে এল। গুলিবর্ষণ এখন আর ঘনঘন নেই। কুমড়োপটাস শরীর নিয়ে থপ থপ করে দৌড়ে এল কলম্বো। বন্ড বলল, দরজায় দাঁড়ান। ভেতরে যাবেন না। কাউকে ঢুকতে দেবেন না। আমি পেছনে যাচ্ছি। নেউলের মত ক্ষিপ্রচরণে গুদামের দেওয়াল ঘুরে দৌড়াল পেছনের দিকে।
প্রায় পঞ্চাশ ফুট লম্বা গুদামের শেষ প্রান্তে গিয়ে গতি হ্রাস করল বন্ড। খরগোশের মত হাল্কা পায়ে এগোল দেওয়ালে পিঠ দিয়ে। ঝটিতে উঁকি দিল পেছনের দরজার দিকে মাথা টেনে নিল সঙ্গে সঙ্গে। পেছনের দরজায় ওৎ পেয়ে রয়েছে একজন লোক। চোখ রয়েছে দরজার ছিদ্রে। হাতে একটা যন্ত্র। যন্ত্র থেকে তার বেরিয়েছে। দরজার তলা দিয়ে গেছে গুদামের ভেতরে। একটা মিশমিশে কালো হুডখোলা গাড়ি দাঁড়িয়ে গা ঘেঁষে। ইঞ্জিন চলছে মৃদুশব্দে। গাড়ির মুখ ফেরানো ধূলিধূসর রাস্তার দিকে।
লোকটা ক্রিস্ট্যাটাস।
হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল বন্ড। লক্ষ্য যাতে অব্যর্থ হয়, তাই দু-মুঠোর মধ্যে ধরল রিভলবার, দ্রুতগতিতে কয়েক ইঞ্চি সরে গিয়ে গুদামের কোণ পেরিয়ে গুলিবর্ষণ করল ক্রিস্ট্যাটেসের পা লক্ষ্য করে গুলি ফসকে গেল। পায়ের কয়েক ইঞ্চি দূর দিয়ে ধুলোয় আলোড়ন তুলে উধাও হল বুলেট এবং পরে শোনা গেল বিস্ফোরণের গুরুগুরু গর্জন। টিনের দেওয়ালের প্রচণ্ড ধাক্কায় শূন্য পথে ছিটকে গেল বন্ড।
মাটিতে পড়েই ফের উঠে দাঁড়াল সে। দুমড়ে-মুচড়ে অদ্ভুত তেড়াবেঁকা আকার নিয়েছে গুদাম, প্রচণ্ড শব্দে ভেঙে পড়ছে তাসের বাড়ির মত।
ক্রিস্ট্যাটোস গাড়িতে উঠে বসেছে এবং এর মধ্যেই এগিয়ে গেছে গজ বিশেক। পেছনের চাকায় ধুলো উঠছে ফোয়ারার মত। বন্ড দু-পা ফাঁক করে শিকারীর ধ্রুপদী ভঙ্গিমায় দাঁড়াল। ওস্তাদ বন্দুকবাজেরা নিশানা প্র্যাকটিস করতে গেলে এই ভঙ্গিই নেয়। খুব সাবধানে তাক করল। গর্জে উঠল ওয়াথার রিভলবার। একবার দু বার…তিনবার। শেষগুলি যখন ছুটল, ক্রিস্ট্যাটোস তখন পঞ্চাশ গজ দূরে। চলন্ত গাড়িতেই সিঁটিয়ে উঠে পেছনে হেলে পড়ল ওর দেহ। স্টিয়ারিং থেকে ঝাঁকি মেরে শূন্যে উঠল দু-হাত। সারস পাখির মত গলা লম্বা করে শূন্যে বার কয়েক মাথা ঠুকেই এলিয়ে পড়ল সামনে। ডান হাতটা এমনভাবে বেরিয়ে রইল, বাইরে যেন সিগন্যাল দিচ্ছে ডাইনে মোড় নেওয়ার। দৌড়াতে যাচ্ছিল বন্ড, ভেবেছিল গাড়ি এবার থামবে, কিন্তু মেঠো পথের গাড়ি-চলার গভীর খাতে চাকা বেঁধে যাওয়ায় অব্যাহত রইল গাড়ির এগিয়ে চলা। নিষ্প্রাণ ডান পা-টাও নিশ্চয় এক্সিলেটরে চেপে রয়েছে এখনো। তাই থার্ড গীয়ারের প্রচণ্ড বেগ নিয়ে বেগে উড়ে চলল হুডখোলা ল্যানসিয়া গাড়ি।
না-দৌড়ে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল বন্ড। মেঠো পথের ওপর দিয়ে ধুলোর ঝড় তুলে অতি দ্রুত মিলিয়ে যাচ্ছে ল্যানসিয়া। ভোরের কুয়াশার মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছে ক্রিস্ট্যাটোস। উলটে গেল না। টলমলও করল না–দূর হতে দূরে অপসৃত হল, যেন এক আশ্চর্য ভৌতিক গাড়ি ভূতুড়ে হাতের চালনায়।
সেফটি ক্যাচ লাগিয়ে ট্রাউজার্স বেল্টে রিভলবার খুঁজে রাখল বন্ড। ফিরে দেখল কলম্বো আসছে। আনন্দে আটখানা মূর্তি। মাড়ি পর্যন্ত বার করে সে কি দাঁতাল হাসি। কাছে আসতেই শিউরে উঠল বন্ড। কেননা, আচম্বিতে ওকে দু হাতে জাপটে দুগাল চুমুতে-চুমুকে ভরিয়ে দিল কলম্বো।
আরে, আরে করছেন কি মশাই, পরিত্রাহি ডাক ছাড়ল বন্ড।
অট্টহাসিতে আকাশ পর্যন্ত বুঝি কাঁপিয়ে দিল কলম্বো, ওরে আমার শান্তশিষ্ট ইংলিশম্যানরে! ডাকাবুকো ডানপিটে! ডরান না কাউকে, ভয় শুধু আবেগকে। কিন্তু আমি বলেই ধাই করে বুকে দুরমুশ পেটা ঘুষি মারল– এনরিকো কলম্বো-প্রেমে পড়েছি আপনার। ঢাক পিটে বলব সবাইকে-লজ্জা কিসের? বুক আমার দশ হাত। আরে মশাই, আপনি যদি ঐ ব্যাটা মেশিনগানারকে না খতম করতেন তাহলে রক্তগঙ্গা বয়ে যেত এতক্ষণে। কাউকেই আর জ্যান্ত ফিরতে হত না। আপনি থাকায় মরেছে শুধু দু জন, চোট খেয়েছে, বাকি প্রত্যেকেই। কিন্তু অ্যালবেনিয়ান ব্যাটারা সব পটল তুলেছে–ছ জন ছাড়া। ছ জনেই চো-চা দৌড় দিয়েছে গাঁয়ের দিকে। পালিয়ে যাবে কোথায়, সেখানেও পুলিশ ও পেতে আছে। ক্রিস্ট্যাটাস বাসটার্ডকেও মোটর সমেত যমের দক্ষিণ দুয়োর দেখিয়ে দিয়েছেন আপনি। আহা রে! সেকি গুলির বহর। দেখবার মত! মেন রোডে পড়লে চলন্ত মোটরের হালটা কি দাঁড়াবে তাই ভাবছি। হাত দেখিয়েছে। তো ডান দিকে, মরেও যেন সে খেয়াল থাকে। বাঁ হাতের কারবার বড়ই সর্বনাশা কিনা! সোল্লাসে বন্ডের কাঁধে থাপ্পড় মারল কলম্বো।
