কলম্বিনা জাহাজের মাঝি মাল্লা বলতে বার জন। ছোকরা বয়েসী, লোহাপেটা চেহারা। কলম্বো নিজের হাতে মগভর্তি কফি আর রাম দিল প্রত্যেকের হাতে। সেলুন ঘরে তখন লণ্ঠন ঝুলছে। ঝাড়ের লণ্ঠন। ঘর ছাড়া গোটা জাহাজটা অন্ধকার। ট্রেজার আইল্যান্ড উপন্যাসে বর্ণিত উত্তেজনা আর ষড়যন্ত্রের আমেজ মন্দ লাগছে না। কলম্বো, বারো সাঙাতের প্রত্যেকের হাতিয়ার টেনে দেখল। পরখ করল। তারিফ করল। হাতিয়ার বলতে লাগার রিভলবার আর ভাঁজ করা ছুরি। দেখে শুনে বন্ডের মনে হল, মহা ঘোড়েল পোক এই এনরিকো কলম্বো। জীবনে অনেক ঝড়ঝাঁপটা মাথা পেতে নিয়েছে। অ্যাডভেঞ্চার, দুঃসাহস, রোমাঞ্চ ভরা জীবনে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা কষেছে অনেকবার। এ জীবন ক্রিমিন্যালের জীবন–অপরাধে সমাকীর্ণ। মুদ্রা আইন ভণ্ডুল করেছে, তামাকের একচেটিয়া ব্যবসার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছে, কাস্টমস আর পুলিশকে ঘোল খাইয়েছে। তা সত্ত্বেও লোকটার হাবভাবে এমন একটা নাবালক নাবালক ভাব যে বদমাইশের শিরোমণি বলে ঠিক মনে হয় না। কু-কাজগুলোকে ও করলে কিছু মনে হয় না। কি রকম যেন অপরিপত্ব নষ্টামির ছোঁয়াচ সব কিছুতেই।
ঘড়ি দেখল কলম্বো। বার স্যাঙাৎকে ঘর থেকে সরিয়ে লণ্ঠনের সলতে কমিয়ে দিল। ভোরের শুচি শুভ্র আলোর আভা তিমির রাতকে সবে স্নান করতে শুরু করেছে। বন্ডকে নিয়ে ডেকে উঠল। ঢিমেতালে মিশমিশে কালো পাথুরে উপকূল ঘেঁষে এগোচ্ছে জাহাজ। সামনের দিকে তাকিয়ে কলম্বো বলল, মোড় ঘুরলেই বন্দর। এখন কেউ দেখতে পায়নি আমাদের। জেটিতে ঠিক এই জাহাজের মতই আরও একটা জাহাজ দেখার আশায় আছি। র্যাম্পের ওপর দিয়ে দেখবেন হয়ত বিস্তর নিউজপ্রিন্ট কাগজের রোল নেমে যাচ্ছে সরাসরি জাহাজ থেকে গুদামের ভেতর। নিরীহ দর্শন। কাগজ। পাহাড়ের মোড় ঘুরেই পুরোদমে গিয়ে পাশে ভিড়ব আমরা। রেলিং টপকে যাব ও জাহাজে। মারপিট হবেই। মাথাও ভাঙবে। গুলি চলবে কিনা জানি না। ওরা না চালালে চালাব না। যদি চালাইতো আপনি হাত লাগাবেন। তাতে যদি আপনার মৃত্যু হয় জানবেন আপনি শহীদ হয়ে গেলেন। কেননা আপনার দেশের শত্রু। মরতে আমিও ভয় পাই না। ও জাহাজ অ্যালবেনিয়ার জাহাজ। মাঝিমাল্লাও অ্যালবেনিয়ার, দুদে গুণ্ডাসব।
অলরাইট।
বস্তের মুখের কথা ফুরোতে না ফুরোতেই ইঞ্জিন রুম টেলিগ্রাফে টং করে আওয়াজ হল। পায়ের তলায় থর থর করে কেঁপে উঠল পাঠাতন। পাহাড়ের মোড় ঘুরে ক্ষুদে জাহাজটা দশ নট গতিবেগে ধেয়ে গেল বন্দর অভিমুখে।
কলম্বো বাজে কথা বলেনি। পাথুরে জেটির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে একটা জাহাজ। পতপত করে উড়ছে পালগুলো। ডেকের পেছনের দিক থেকে কাঠের পাটাতন ঢালু হয়ে নেমে গিয়েছে ডাঙার ওপর গুদামের দরজায়। ঢেউ খেলানো টিনে ছাওয়া গুদাম। উন্মুক্ত দরজায় নিঃসীম অন্ধকার। ভেতরে টিমটিম করছে কয়েকটা বিদ্যুৎ বাতি। জাহাজের ডেকে থরে থরে সাজানো নিউজপ্রিন্টের পেল্লায় পেল্লায় রোল। ডেক ঠাসা এই রোলে। কাঠের ঢালু পাটাতনে একটা একটা রোল নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। নিজের ভারেই গড়িয়ে নেমে যাচ্ছে নিউজপ্রিন্ট, হুড়মুড় করে ঢুকে যাচ্ছে গুদামের মধ্যে। জনাবিশ পুরুষ ব্যস্ত তদারকির কাজে। হঠাৎ ঝাঁপিয়ে না পড়লে কাহিল করা মুশকিল হবে। কলম্বোর জাহাজ আর ও জাহাজের দূরত্ব মাত্র পঞ্চাশ গজ। ওদের দু জন এদিকেই তাকিয়ে আছে। একজন দৌড়ে নেমে গেল। তার আগেই তীক্ষ্ণ কণ্ঠে হুকুমজারী করল কলম্বো। ইঞ্জিন থামল। থেমেই ফের চালু হল উল্টোদিকে। ব্রীজের ওপর দপ করে জ্বলে উঠল একটা প্রকাণ্ড সার্চলাইট। গায়ে গায়ে ভিড়তেই সার্চলাইটের আলোয় দিন হয়ে গেল অ্যালবেনিয়ান ট্রলারের ডেক। গায়ে গা ঠেকাতে না ঠেকাতেই লোহার আঁকশি দিয়ে রেলিং-এ রেলিং আটকে দিল কলম্বোর সাঙাত্রা। দিয়েই টপকে গেল ও জাহাজে। পুরো ভাগে দেখা গেল এনরিকো কলম্বোকে।
বন্ড অন্য ফন্দি এটেছিল। শত্রুপক্ষের জাহাজে পা দিয়েই একদৌড়ে ডেক পেরিয়ে রেলিং টপকে মারল ঝাঁপ। বারো ফুট নিচেই পাথরের জেটি। বেড়ালের মত চার হাত পায়ের ওপর জেটিতে অবতীর্ণ হল বন্ড। কিছুক্ষণ আর নড়ল না। গুঁড়ি মেরে ভেবে নিল পরবর্তী পন্থা। ডেকের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু হয়ে গেছে। গোড়ার দিকের একটা গুলিতে চুরমার হল সার্চলাইট। ভোরের আবছা আলোয় অব্যাহত রইল ফায়ারিং। শত্রুপক্ষের একজন চার হাত-পা ছড়িয়ে দড়াম করে আছড়ে পড়ল ঠিক সামনেই।
লাইট মেশিনগান চালু হল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। গুদামের মুখ থেকে ঝলকে ঝলকে বেরিয়ে এল আগুন। আঁকে ঝাঁকে বুলেট সঙ্গে সঙ্গে ধেয়ে এল বন্ডকে লক্ষ্য করে। তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
সেই দিকেই দৌড়াল বন্ড। তবে জাহাজের ছায়ায় গা মিলিয়ে। তা সত্ত্বেও দেখে ফেলল মেশিনগানধারী। এক ঝাঁক বুলেট সঙ্গে সঙ্গে ধেয়ে এল বন্ডকে লক্ষ্য করে। ঝাঁপ দিল বন্ড। ঢালু পাটাতনের আড়ালে গিয়ে আছড়ে পড়ল উপুড় হয়ে। বুলেট এখনো আসছে। মারণ বুলেট। মাথা কুটছে মাথার ওপরকার ঢালু পাটাতনে। কেঁচোর মত বুকে হেঁটে এগিয়ে চলল বন্ড। স্বল্প পরিসর ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে আসছে। তবুও যেতে হবে বন্ডকে।
সহসা ধপাধপ দুমদাম শব্দ শোনা গেল মাথার ওপরে। গড়গড় দড়াম শব্দে কি যেন গড়িয়ে গড়িয়ে নামছে। বন্ড বুঝল কি ব্যাপার। কলম্বোর এক সাঙাৎ নিশ্চয় দড়ি কেটে দিয়েছে। কাঠের পাটাতনের ওপর দিয়ে গড়িয়ে দিয়েছে পাহাড় প্রমাণ সবকটা নিউজপ্রিন্ট রোল। এই হল সুবর্ণ সুযোগ। পাটাতনের ছাউনি থেকে ছিটকে গেল বন্ড বাঁদিকে। মেশিনগানধারী নিশ্চয় আশায় আছে বন্ড ডানদিকে বেরোবে। কেননা ঘাতক নিজেই রয়েছে সেই দিকে ওৎপেতে গুদামের দেয়ালের সঙ্গে গা মিশিয়ে।
