কলম্বোর চোখ থেকে চোখ সরাল না বন্ড টেপে তো আরো কথা আছে। সব কি মিথ্যে? ইংরেজের হয়ে লড়া ফুরিয়েছে। এখন তাদের বিরুদ্ধেই লড়ছেন টাকার লোভে।
ঘোৎ করে উঠল কলম্বো। তজনা দিয়ে মেশিনে খোঁচা মেরে–শুনেছি, সব শুনেছি। বস্তা বস্তা ধাপ্পা। বলেই আবার প্রচণ্ড ঘূষির চোটে ঝনঝন শব্দে নেচে উঠল টেবিলের গ্লাসগুলো। সে চিৎকার করল, মিথ্যে! মিথ্যে! সব মিথ্যে! বলেই চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে খপ করে তুলল হুইস্কির বোতল। হড় হড় করে আঙুল চারেক ঢালল বন্ডের গ্লাসে। ফের বসল চেয়ারে। শ্যাম্পেনের পুরো বোতলটা কাছে টেনে নিয়ে সংযত কণ্ঠে, সব অবশ্য মিথ্যে নয়। তর্ক করলাম না সেই জন্যই। বিশ্বাস করতেন না। ফাঁড়িতে টেনে নিয়ে যেতেন, ঝামেলায় ফেলতেন, আমাকে খুন করতে পারুন পারুন কেলেঙ্কারীর চুড়ান্ত করতেন। আমার কারবার ডকে উঠিয়ে ছাড়তেন। তাই ঠিক করলাম ফাঁকা কথায় কাজ নেই। হাতেনাতে আপনাকে দেখিয়ে দেব। যে সত্য খুঁজতে এসেছেন ইটালীতে, আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তা চাক্ষুষ দেখবেন। কাল ভোর হবার আগেই আপনার কাজ ফুরোবে, নটে গাছটি মুড়োবে।
বন্ড শুধু বলল, ক্রিস্ট্যাটোসের কথায় কোন মিথ্যে নেই কোথাও।
মাই ফ্রেন্ড, আমি স্মাগলার। চোরাই চালানদার। শুল্ক ফাঁকিতে ওস্তাদ। সত্যি শুধু এইটুকু। সারা ভূমধ্যসাগরে খুব সম্ভব আমার চাইতে উঁদে স্মাগলার আর কেউ নেই। ইটালীতে পাচার আমেরিকান সিগারেটের অর্ধেক আমি আনাই ট্যানজিয়ার থেকে। সোনা? ব্ল্যাক মার্কেটের একমাত্র সাপ্লায়ার হলাম আমি। হীরে? বেরুটে আমার নিজের জোগাড়ে রয়েছে–সরাসরি যোগাযোগ আছে সিয়েরা লিয়োন আর সাউথ আফ্রিকা পর্যন্ত। পুরোনো আমলে সোনা হীরে তত পাওয়া যেত না। তখন চালান দিতাম অরিও মাইসিন, পেনিসিলিন জাতীয় ওষুধপত্র। আমেরিকান প্রভাব যে সব হাসপাতালে, তার প্রতিটিতে ঘুষ দিতে হত। এমন কি সিরিয়া, পারস্য থেকে ডানা কাটা পরীদের এনে নেপলসের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতেও কসুর করিনি। জেল পালানো কয়েদীদেরও সীমান্ত পার করে দিয়েছি মোটা দাও পিটে। কিন্তু আবার কলম্বোর প্রচণ্ড ব্ৰজমুষ্টি নেমে এল টেবিলের ওপর। আফিং, কোকেন, মরফিন, হিরোইন-নো নেভার! জীবনে ওপথ মাড়াইনি। নোংরা জঘন্য পাপ। পাপ আর কোথাও নেই–আছে শুধু এতে। শূন্যে উঠল ব্ৰজমুষ্টিমাই ফ্রেন্ড, মায়ের নামে দিব্বি দিয়ে বলছি, ও ব্যবসা আমার নয়।
এতক্ষণে যেন অন্ধকারে হাতড়াচ্ছিল বন্ড। আলোর দিশা দেখা গেল সেই মুহূর্তে। কলম্বোর কথা অবিশ্বাস করা যায় না। লোভী বোম্বেটে বেচারীর ওপর মনটাও নরম হয়ে এল। ক্রিস্ট্যাটাস বড় জবর চাল চেলেছে। মুখে বলল, কিন্তু আপনাকে ফাঁসিয়ে ক্রিস্ট্যাটাসের লাভ কি?
মাই ফ্রেন্ড। ক্রিস্ট্যাটাস কু-বুদ্ধির জাহাজ। ও যে কত গভীর পানির মাছ তা কল্পনায় আনা যায় না। এতবড় দু মুখো খেলায় নজীর স্মাগলিং ইতিহাসে আর দুটি নেই। আমেরিকান গুপ্তচরদের চোখে ধূলো দেওয়ার জন্য মাঝে মাঝে এক আধটা চুনোপুঁটিকে ধরিয়ে দিতে হয়। কিন্তু সে চাল ইংলিশ খেলায় চলবে না। এত মাল পাচার হচ্ছে ইংল্যান্ডে যে কহতব্য নয় মোটা ব্যবসার মোটা চুনোপুঁটির দরকার। তাই এবারে বলি দেওয়া হচ্ছে আমাকে। দিলে ক্রিস্ট্যাটাস আড়ালেই থেকে যায়, ওর কারবারও রক্ষে পায়। দুদিন মেহনত করলে ভোলাম কুচির মত টাকা ওড়ালেই আমার টিকি ধরে ফেলতেন। আমার কাজ কারবারও ফাঁস হয়ে যেত। যতই ঝুঁকতেন আমার দিকে, ততই আসল রাঘব বোয়ালের কাছ থেকে দূরে সরে আসতেন। শেষকালে আমাকে ফাটকে পুরে তবে ছাড়তেন। আসল পালের গোদারা হেসে কুটিপাটি হত আপনার সফঝম্প আর আমার কুপোকাৎ অবস্থা দেখে।
ক্রিস্ট্যাটাস আপনাকে কুপোকাৎ করতে চায় কেন?
মাই ফ্রেন্ড, খবর গজ গজ করে আমার পেটে। আমি জানি না এমন খবর কিছু নেই। স্মাগলিং করতে গিয়ে মাঝে মাঝে ঠোকাঠুকি হয়। দু দলে মারপিটও হয়ে যায়। এই তো সেদিন এই জাহাজ নিয়েই একহাত লড়লাম অ্যালবেনিয়ার একটা বোটের সঙ্গে। ওদের এক ব্যাটাই প্রাণে বেঁচেছিল। অন্তর টিপুনি দিতেই তার পেট থেকে অনেক কথা বেরিয়ে এল। তারপর একটা সাংঘাতিক ভুল করলাম। শুওরটাকে টির্যানাতে ছেড়ে দিয়েছিলাম। সেই থেকে বাস্টার্ড ক্রিস্ট্যাটোসের নজর আমার পেছনে লেগেছে। তবে কি জানেন। নেকড়ের মত দাঁত খিঁচিয়ে হাসল কলম্বো– ও জানে না আরও একটা মারাত্মক খবর আমি জেনে গেছি। সেই খবর জেনেই যাচ্ছি কাল সকালে এক টক্কর লড়তে। সান্তা মেরিয়ার আনকোনার উত্তরে ছোট্ট একটা মাছ ধরার বন্দর আছে–হাতাহাতি হবে সেইখানেই। দেখা যাক–কে হারে কে জেতে।
নরম গলায় বন্ড বলল, এত খাটছেন নেবেন কত
এক পয়সাও নয়। কাকতালীয় বলতে পারেন, কিন্তু আপনার আমার স্বার্থ একই। শুধু একটা শর্ত। আজ যা বললাম, তা আপনি, আমি আর দরকার হলে আপনার লন্ডনের কর্তা ছাড়া আর কেউ যেন না জানে। কথাটা যেন ইতালীতে ফিরে না আসে। রাজি?
রাজি।
উঠে দাঁড়াল কলম্বো। ড্রয়ার খুলে বার করে আনল বন্ডের রিভলবার। নিন মাই ফ্রেন্ড, দরকার হলেও হতে পারে তাই কাছেই রাখুন। পারেন তো খানিকটা ঘুমিয়ে নিন। ভোরে রাম আর কফি পাবেন। হাত বাড়িয়ে দিল কলম্বো। হাতে হাত মেলাল বন্ড। নিমেষে বন্ধু হয়ে গেল দুজনে।
