ফ্যাকাশে হেসে ঘাড় নাড়ল বস্তু। নড়তেই দারুণ যন্ত্রণায় চোখ যেন ঠেলে বেরিয়ে এল। হাতঘড়িতে দেখল সাতটা বাজে। দু চারটে কথা বলে লোকটা দরজা ভেজিয়ে বেরিয়ে গেল।
ভাবগতিক দেখে মনে হল না বন্ডকে শত্রু মনে করা হচ্ছে। কে জানে কি মতলব কলম্বোর। রফায় আসতে চায় মনে হচ্ছে। উঠে বসল বস্তু। মুখ ধুয়ে সিগারেট ধরাল। ড্রয়ারের মধ্যেই তার রিভলবার ছাড়া সবকিছু পেল।
নটা নাগাদ চেনা নাবিকটা এসে বন্ডকে নিয়ে গেল অন্য এক সাজানো ঘরে। টেবিলের দু পাশে দুটো চেয়ার। নিকেল চকচকে ট্রলীতে থরে থরে সাজানো খাবার। পোর্টহোল খুলে বন্ড দেখল। অন্ধকার দিগন্ত। এক থোকা হলদেটে আলোক কণা।
খটাং করে হ্যাচওয়ের ছিটকিনি খুলে ঘরে ঢুকল কলম্বো। কৌতুক আর দুষ্টুমি যেন নেচে নেচে উঠছে দুই চোখে। চেয়ার টেনে নিয়ে বসতে বসতে বলল, বন্ধু আসুন, বসুন, খান, কথা বলুন। কাজের কথা হোক। কি নেবেন? জিন, হুইস্কি, শ্যাম্পেন? সারা বোলোগনা চষেও এমনি খাসা সসেজ কোথাও পাবেন না। আমার বাগানের অলিভ। সেঁকা চীজ, তাজা ডিম, রুটি, মাখন। সাদামাটা খাবার। কিন্তু খেয়ে তৃপ্তি পাবেন। আসুন, দৌড়ঝাঁপ তো কম হয়নি। ক্ষিদে নিশ্চয় পেয়েছে।
কলম্বোর সংক্রামক হাসি বন্ডকেও হাসাল। হুইস্কিতে সোডা মিশিয়ে নিয়ে বসল চেয়ারে। বলল, এত কাণ্ডকারখানার দরকার ছিল কি? সোজা পথেই তো দেখা করা যেত। আপনার শাঙাৎ ঐ হাঁদারাম মেয়েটাকেও বলিহারি যাই। যেচে আপনার ফাঁদে পা দেব বলেই তো এসেছি। চীফকে তখুনি বলেছিলাম। মেয়েটার কথাবার্তা সুবিধের নয়। এরকম একটা কিছু আঁচ করা গিয়েছিল বলেই ব্যবস্থা করে এসেছি। আগামীকাল দুপুর বারোটার মধ্যে ছাড়া না পেলে আন্তর্জাতিক পুলিশ আর ইটালিয়ান পুলিশ আপনাকে তুলোধোনা করে ছাড়বে।
ভড়কে গেল কলম্বো। বলল, ফাঁদে পা দিচ্ছেন যদি জানতেনই তো আমার তিন সাঙাকে এড়িয়ে পাচ্ছিলেন কেন? ওদের পাঠিয়েছিলাম আপনাকে আমার জাহাজে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এলেই পারতেন। অত ছুটোছুটি করার ফলে হল কি? না। আমার দলের একজন কমলো। আপনার খুলিও চুরমার হতে হতে বেঁচে গেল। বুঝি না কি দরকার ছিল এই প্রহসনের।
লোক তিনটের চেহারা মোটেই ভাল লাগেনি আমার। কারা খুনি আর কারা খুনি নয়–দূর থেকে দেখলেই চিনতে পারি। ভাবলাম, উজবুকের মত ঠ্যাঙাড়ে দিয়ে ঠেঙিয়ে ঢিউ করার মতল আপনার। ঠ্যাঙাড়ে আনার দরকার ছিল কি? লিলবম একাই তো আনতে পারত আমাকে।
মাথা নাড়তে নাড়তে কলম্বো বলল, লিল তো আর কিছুই চায়নি। শুধু আপনার পেট থেকে বেশ কিছু কথা বার করে নিতে চেয়েছিল। এখন যা ঘটল, তাতেও মর্মান্তিক চটেছে আমার ওপর। একে তো খাঁটি বন্ধু পাওয়া মুশকিল। তার ওপর এক বিকেলেই দু-দুটো শত্ৰু আমি বানালাম। সত্যি সত্যিই মুষড়ে পড়ে কলম্বো। ইয়া মোটা খানিকটা সসেজ ক্যাচ করে কেটে নিয়ে এক কামড়ে ছাড়িয়ে নিল বাইরের ছাল। মুখে ঠেসে চিবুতে লাগল কচ কচ করে। মুখভর্তি। তা সত্ত্বেও একগ্লাস শ্যাম্পেন গলায় ঢেলে আধচিবানো সসেজ ধুইয়ে নামিয়ে দিল পাকস্থলীতে। বলল, উদ্বেগ বাড়লেই খাওয়া বাড়ে আমার। কিন্তু যা খাই, তা হজম করতে পারি না কিছুতেই। এই মুহূর্তে আমার উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছেন আপনি। বলছেন, ইচ্ছে করলেই বিনা ঝাটে দেখা করা যেত। কিন্তু তা কি করে জানব বলুন। শুধু শুধু ম্যারিও মরল। মরার দোষটাও পড়ল আমার ঘাড়ে। অথচ ওকে আমি বলিনি মাইন পোঁতা জমি পেরিয়ে শর্টকার্ট করতে। দম করে টেবিলে ঘুষি মারল কলম্বো। না, না এ দোষ আমার নয়। দোষ আপনার। আপনিই তো কথা দিয়েছিলেন খুন করবেন আমাকে। মনে খুন বাইরে বন্ধুত্ব–একি হয়? খুন করব মনে করে কেউ বন্ধুর মত দেখা করতে পারে? বলুন, সত্যি কিনা? এক যাচকায় বেশ খানিকটা পাকানো রুটি টেনে নিয়ে মুখে ঠাসল কলম্বো, দুই চোখ জ্বলতে লাগল চুল্লীর মত।
বলছেন কি? বন্ড বিস্মিত।
বাকি রুটিটা খাওয়া হল না। ছুঁড়ে দিয়ে তড়াক করে দাঁড়িয়ে উঠল কলম্বো। উত্তেজিতভাবে পায়চারী শুরু হল সেলুনের এদিক থেকে ওদিক পর্যন্ত। কিন্তু চাহনি আটকে মইল বন্ডের ওপর। পরক্ষণেই একটানে একটা ড্রয়ার খুলল। ভেতরে একটা টেপ রেকর্ডার। বন্ডের চোখে চোখ রেখেই মেশিনটাকে বার করল। একটা সুইচ টিপল।
গলায় পি পি আওয়াজ শুনেই হুইস্কির গ্লাস ঠোঁটের কাছে তুলল বন্ড। চোখ রইল মেশিনের ওপর। পি পি কণ্ঠ বলছে, ঠিক খবর দেবার আগে শর্তটা জানানো দরকার ইয়েস? একই গলায়, আমেরিকান ডলারে মাই দশ হাজার ডলার। কাল লাঞ্চ খাবার আগেই ছোট নোটে পুরো টাকা আনবেন…যদি মরেও যান…এত কথা কোত্থেকে জানলেন কাউকেই বলতে পারবেন না…গ্যাংয়ের চাই লোকটা অতি জঘন্য। তাকে খুন করতে হবে। কান খাড়া করল বড়। এবার শোনা যাবে নিজের কণ্ঠ। অনেকক্ষণ বিরতি। এরপর আসছে শেষ শর্তে রাজি হবার পালা। কি বলেছিল বন্ড, কথা দিতে পারছি না। সে ভাবনা আপনার। কেউ যদি আমাকে মারতে আসে, আমি তাকে মারব। প্রাণে মারব। নইলে নয়।
খটাস করে মেশিন বন্ধ করল কলম্বো। এক ঢোকে হুইস্কি শেষ করল বন্ড। বলল, বারে। আমি যে খুন করব কথা দিয়েছি। শুনে তা বোঝা গেল না।
বিষণ্ণ চোখে তাকাল কলম্বো।–ইংলিশ ম্যানের এ কথার মানে আমার কাছে একটাই। খুন করা আপনার মনে ছিল। যুদ্ধের সময় ইংরেজের হয়ে লড়েছি। কিংস্ মেডেল পেয়েছি। দেখবেন? বলেই ফস করে পকেট থেকে রূপার ফ্রিডম মেডেল বার করল।
