তিনজন ষণ্ডামার্কা পুরুষ তালে তালে পা ফেলে আসছে এই দিকে। রোদে তেতে ওঠা বালির হলকায় যেন থির থির করে নাচছে ভাঙা কাঠের ঘর, নাচছে তিনমূর্তি। তবুও আসছে। বুঝি কুচকাওয়াজ করছে। তালে তালে পা ফেলছে। অবিকল ফৌজী সৈন্যের মত।
টপ করে উঠে দাঁড়ান্স বন্ড। বলল নিরস স্বরে– বুঝেছি। কলম্বোকে বলবেন, এই মুহূর্ত থেকে তার জীবনী লেখা শুরু করলাম। লেখা আমার থামবে না। চললাম। বলেই দৌড়াল উপদ্বীপের ছুঁচোল প্রান্তের দিকে। সেখান থেকে ঘুরে গাঁয়ের মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছানো কঠিন হবে না।
নির্জন সৈকতে ত্রিমূর্তির মধ্যে যেন জোরে হাঁটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। দ্রুত ছন্দে আন্দোলিত হল কনুই আর পা-তাল মিলিয়ে বৃদ্ধি পেল গতিবেগ। একজন হাত নেড়ে ইশারা করল শায়িত সুন্দরীর কাছে এসে। হাত নেড়ে সায় দিল লিলবম। তারপর শুল পাশ ফিরে। মানুষ শিকারে যেন অরুচি–তাই আর ফিরেও তাকাল না।
ছুটন্ত অবস্থায় নেকটাই খুলে পকেটে রাখল বন্ড। গরমে দরদর করে ঘাম গড়াচ্ছে গা বেয়ে। তিন মূর্তিরও সেই অবস্থা। সহনশক্তি কার বেশি। এ যেন তারই পরীক্ষা। উপদ্বীপের ডগায় পৌঁছে লাফিয়ে উঠল সমুদ্র প্রাচীরের ওপর। তাকাল পেছনে। সর্টকাট করছে দুটো ফেউ। মরার মাথা খুলি আঁকা বিপদ সংকেতের পরোয়া না রেখে ঢুকে পড়েছে মাইন পোঁতা অঞ্চলে। ব্যবধান দ্রুত কমে আসছে। চওড়া পাঁচিল বেয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াল বন্ড।
শার্ট ঘামে সপসপে হয়ে গেছে। পা টনটন করছে। মাইল খানেক দৌড়ানো হয়ে গেছে। আর কত দূর? পাঁচিলের মাঝে-মাঝে সেকেলে কামানের কংক্রিট স্তম্ভ। আরও মাইল খানেক গেলে তবে যদি গায়ের মধ্যে ঢাকা যায়। এদিকে স্যুট পর্যন্ত ভিজে গেছে ঘামে, ট্রাউজার্সের ভিজে কাপড়ে পা আটকে-আটকে যাচ্ছে। পেছনে তিনশ গজ ব্যবধানে আসছে এক মূর্তি। ডাইনে বালির টিলা ভেঙে আরো দুজন।
বন্ড ফন্দি আঁটছিল ছোটার বেগ কমিয়ে এনে হাঁটতে-হাঁটতে পেচনের তিন ছিনেৰ্জোক গুলি মেরে কুপোকাৎ করার। এমন সময় উপর্যুপরি দুটি আশ্চর্য ঘটনা ঘটল।
প্রথম দৃশ্যটা দেখা গেল সামনে। জনা ছয়েক জেলে হাতে বর্শার মত কি যেন। কেউ দাঁড়িয়ে পানিতে কেউ পাঁচিলের গা ঘেঁষে।
দ্বিতীয় নাটকটা ঘটল ঠিক পেছনেই। আচম্বিতে বালির পাহাড় থরথরিয়ে কেঁপে উঠল প্রচণ্ড বিস্ফোরণে। মাটি, বালি আর একটি মানুষের খণ্ড-বিখণ্ড হাত-পা-বড় ফোয়ারার মত ছিটকে গেল শূন্যে। ধাক্কার ঢেউ মাটি বয়ে এসে কাঁপিয়ে দিল বন্ডকেও। গতি কমিয়ে আনল বন্ড। বালি পাহাড়ের দ্বিতীয় আগন্তুকও দাঁড়িয়ে গিয়েছে। পাহাড়ের মূর্তির মত নিস্পন্দ। ঝুলেপড়া চোয়াল কাঁপছে ভয়ার্ত ঘড়-ঘড়ানিতে। পরমূহুর্তেই দু হাতে মাথা চেপে ধরে আছড়ে পড়ল বালির ওপর। লক্ষণ দেখেই বুঝল বন্ড, কেউ-না-আসা পর্যন্ত ও আর নড়ছে না। এসে ওকে নিয়ে যাবে, তবেই ভয়ের ফাঁদ থেকে মুক্তি পাবে বিটলে বদমাস।
হাঁফ ফেলল বন্ড। বাকি রইল একটা শয়তান। পথও বেশি নয়। শ দুই গজ গেলেই জেলেদের দলে ভিড়ে পড়া। যাবে। মনে মনে কয়েকটা ইটালিয়ান শব্দ সাজিয়ে নিল বন্ড। জেলেরা এদিকেই তাকাচ্ছে। কিন্তু কি আশ্চর্য। বর্শাধারী জেলেদের দেখতে পেয়েও পেছনের ছিনেজোক রাস্কেলটা এখনো পাই পাই করে তার দিকেই ছুটে আসছে। দূরত্ব মাত্র শ খানেক গজ। হাতে একটা রিভলবার।
সামনের জেলেরাও ছড়িয়ে পড়েছে। অবরোধ করেছে বন্ডের পথ। মাঝে একটা মস্ত লোক। কোমরে লাল রঙের গোসল করার জাঙিয়া। সবুজ মুখোশ মাথার ওপর টেনে তোলা।
দু হাত পাছায় রেখে সিধে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে লাগানো নীল রঙের সাঁতারু পাখনা বেরিয়ে রয়েছে দু পাশে। দূর থেকে মনে হল যেন রঙিন ফিল্মের সেই ব্যাঙ মানুষ–টোড হলের মিস্টার টোড। বন্ড ছুটছিল, এখন হাঁটতে লাগল। হাঁপাতে লাগল হাপরের মত। ঘর্মাক্ত হাতটা আপনা হতেই চলে গেল কোটের নিচে একটানে বার করল রিভলবার। হারপুন বাগিয়ে জেলেরা তাগ করছে বন্ডকে। মাঝখানের লোকটা এনরিকো কলম্বো।
কলম্বো দেখল পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছে বন্ড। গজ বিশেষ দূরে আসার পর বলল শান্তকণ্ঠে– সিক্রেট সার্ভিসের মিস্টার বন্ড। খেলনা পিস্তলটা নামিয়ে রাখুন। নড়বেন না। ওখানেই দাঁড়ান। সি-ও-টু হারপুন বন্দুক এত কাছ থেকে ফসকায় না। ইংরাজিতে পাশের লোককে গত সপ্তাহ অ্যালবেনিয়ান বদমাসকে কত গজ দূরে গেঁথেছিলে মনে আছে?
বিশ গজ। হারপুন এ ফোড় ও ফোড় হয়ে গিয়েছিল। কি মোটাই না ছিল লোকটা–এর দ্বিগুণ তো বটেই।
থমকে গেল বন্ড। পাশেই লোহার চ্যাটাল খুঁটি দেখে বসল আয়েশ করে। রিভলবারটা রাখল কোলে–নল ফেরানো রইল কলম্বোর মস্ত ভূড়ির দিকে।
বলল, পাঁচটা হারপুন দিয়েও আমার একটা বুলেটকে আটকানো যাবে না কলম্বো। আমি মরব, আপনিও মরবেন।
হাসিমুখে ঘাড় নেড়ে সায় দিল কলম্বো। বন্ডের পেছনেই পা টিপে টিপে আসছিল–পিছু নেওয়া সেই আততায়ী। রিভলবারের কুঁদো দিয়ে একবার মাত্র মোক্ষম ঘা মারল বন্ডের করোটি আর ঘাড়ের সন্ধিস্থলে।
মাথার চোট নিয়ে অজ্ঞান হবার পর জ্ঞান ফিরে পেলেই দারুণ বমি বমি লাগছিল। অসহ্য সেই অবস্থাতেও দুটি অনুভূতি প্রবল হল বন্ডের মগজে। প্রথম, সে রয়েছে সমুদ্রে দুলন্ত জাহাজের মধ্যে। দ্বিতীয়, কে যেন একটা ভিজে তোয়ালে দিয়ে তার কপাল মুছিয়ে ভাঙাভাঙা ইংরেজিতে প্রবোধ দিচ্ছে। আবার ব্যাঙ্কে এলিয়ে পড়ল বন্ড। শরীরে শক্তি যেন আর নেই। কেবিনটা ছোট্ট। মেয়েলী সুগন্ধ ভাসছে। রুচিসম্মত পর্দা। দেওয়ালের রঙে একই রুচির ছাপ। একজন নাবিক ঝুঁকে রয়েছে বন্ডের মুখের ওপর। চেনা চেনা লাগল লোকটাকে। জেলে সেজে হারপুনধারীদের মধ্যে ছিল বোধহয়। বন্ড চোখ খুলতেই হাসি মুখে বলল, ভাল তোর ব্যথা করছে না সেরে যাবে। দাগও মিলিয়ে যাবে চুলের আড়ালে। মেয়েদের চোখে পড়বে না।
