ভেনিস আসার সেরা মাস হল মে আর অক্টোবর। রোদে তখন মাইলের পর মাইল হাঁটা যায়। টুরিস্টের ভিড়ও তুঙ্গে পৌঁছয় না। ভিড় বাড়লেও ভেনিস কাতর নয়। হাজার হাজার টুরিস্টকে একসঙ্গে জায়গা দেবার ক্ষমতা বোধ। করি সারা বিশ্বে একমাত্র ভেনিস শহরেই আছে।
পরের দিন সারা সকালটা শহরের পথে ঘাটে টো টো করে ঘুরে বেড়াল বন্ড। কয়েকটা গির্জাতেও গেল। সদর দরজা দিয়ে ঢুকে উধাও হল পাশের দরজা দিয়ে। চোখ রইল পেছনে। মতলব তো শহর দেখা নয়। পেছনে ফেউ লাগলে তাকে দেখা। কিন্তু কেউ নেই।
নিশ্চিন্ত হয়ে সকাল সকাল লাঞ্চ খেয়ে নিল বন্ড। হোটেলে ফিরে ঘর বন্ধ করে কোট খুলল। বার করল অটোমেটিক ওয়ালথার পি-পি-কে। সেফটি ক্যাচ লাগিয়ে প্র্যাকটিস করল বার কয়েক। খাপ থেকে কত তাড়াতাড়ি রিভলবার টেনে বার করা যায়, সে মহড়াও হল। বার দুয়েকেই খুশি হল বন্ড। রিভলবার ফিরে গেল চামড়ার হোল্ডারে। নিচে এসে স্পীডবোটে চেপে রওনা হল অ্যালবেরোনি অভিমুখে। কাঁচের মত হ্রদের জলরাশি তোলপাড় হল জলযানের গতিবেগে।
লিডো উপদ্বীপের যেদিকে ভেনিস, সেদিকের অ্যালবোনি জেটি থেকে আধ মাইলটাক ধূলি ধূসর পথ। উপদ্বীপের চল প্রান্তে এ যেন অন্য এক জগৎ। পরিত্যক্ত মরুভূমির মত খাঁ খাঁ করছে সবকিছু। কলোনী পত্তনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ঘরদোর যেমন, তেমনি পড়ে। জেলেদের গাঁ। ছাত্রদের স্বাস্থ্যনিবাস। ইটালিয়ান নেভীর কামান রাখার স্তূপ। এখন অবশ্য ঝোপে ঢাকা। গত যুদ্ধের নিদর্শন। প্রাচীন দুর্গের ধ্বংসাবশেষ। এরই মাঝে গলফ খেলার জন্য খানিকটা জায়গা ঘিরে রাখা হয়েছে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে, মাইন পোঁতা অঞ্চল। মাইন সরানোর সময় কারো হয়নি। তাই মরার খুলি আর আড়াআড়ি হাড় আঁকা তক্তায় লেখা–সাবধান, মাইন পোঁতা আছে। সারা অঞ্চল বিষাদের ছায়ায়। থমথমে। অথচ দূরত্ব বেশি নয়। হ্রদ পেরিয়ে ভেনিস থেকে ঘণ্টাখানেকের কম সময় লাগে এ তল্লাটে আসতে।
আধ মাইল হাঁটতেই ঘেমে উঠেছিল বন্ড। বাবলার ছায়ায় একটু জিরিয়ে নিল। সামনেই কাঠের জীর্ণ খিলেন। নীল রঙে লেখা বাগানি অ্যালবেরোনি। ওদিকে কয়েকটা ভাঙাচোরা কাঠের ঘর, শখানেক গজ পর্যন্ত বালুকাবেলা, নীল কাঁচের মত টলটলে সমুদ্র। স্নানাথী একজনও নেই। কেউ আসে বলেও মনে হয় না। অথচ খিলেন পেরোতেই রেডিওতে ক্ষীণ বাজনা শোনা গেল। শব্দটা আসছে ভাঙাচোরা কাঠের ঘরগুলোর ভেতর থেকে।
সমুদ্রের ধার বরাবর হাঁটতে লাগল বন্ড। বাঁদিকে সাগর-বেলা ঈষৎ বেঁকে গেছে লিভোর লোকালয় পর্যন্ত। ডানদিকে আধ মাইল গেলেই সমুদ্র প্রাচীর শীর্ষে মাঝে মাঝে অক্টোপাস জেলেদের মাচা। সাগরবেলার পেছনে বালির টিলা। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা গলফ মাঠের কিছু অংশ। বালির পাহাড়ের কিনারায় প্রায় পাঁচশ গজ দূরে জ্বলজ্বল করছে এক টুকরো উজ্জ্বল হলুদ রঙ।
সেই দিকেই পা চালাল বন্ড।
কে ওখানে?
বিকিনির ঊর্ধ্বাংশ নিমেষে ওপরে টেনে তুলল পেলব দুটি হাত। সামনে এসে দাঁড়াল বন্ড। ছাতার ঝলমলে ছায়ায় ঢাকা পড়েছে কেবল মুখটি। শরীরের বাকি অংশ রোদে মেলা, সূর্য-জ্বলা ঘি রঙ ঢাকা সাদা-কালো তোয়ালে আর কালো বিকিনি দিয়ে।
আধবোজা চোখ মেলে তাকায় লিলবম। এসেছেন পাঁচমিনিট আগে। পইপই করে বলা সত্ত্বেও টোকা মারেননি।
ছাতার ছায়ায় বসে পড়ল বন্ড। বসল সুন্দরীর গা ঘেঁষে। রুমাল বার করে মুখ মুছে বলল, মরুভূমির মাঝে তালগাছ বলতে তো দেখছি এই ছাতা। ঝটপট ছায়ায় বসতে কার না ইচ্ছে করে। দেখা সাক্ষাতের এই কি জায়গা?
হাসল সুন্দরী– স্বভাবে আমি গ্রেটা গার্বো। একলা থাকতে চাই।
সত্যিই কি একলা।
না তো কি? বডিগার্ড এনেছি বলে মনে হয়?
আপনার মতে পুরুষ মানেই তো শুওর
কিন্তু আপনি হলেন ভদ্রলোক শুওর। খুকখুক করে হাসল সুন্দরী। বনেদী শুওর। তাছাড়া, এ জায়গায় ওসব চলেও না। যা বলি, সব চাইতে বড় কথা, আমরা এসেছি ব্যবসার কথা বলতে। আপনাকে আফিং চোরাই চালানের গল্প শোনাব। দাম দেবেন হীরের ক্লিপ কিনে দিয়ে। তাই তো? নাকি মত পালটেছেন?
না, পালটাইনি। এবার শুরু করলেই হয়।
প্রশ্ন করুন। আমি জবাব দিচ্ছি। বলুন কি জানতে চান, উঠে বসল সুন্দরী। দু-চোখের রং উধাও হয়েছে, সিরিয়াস চাহনি এখন বেশ হুঁশিয়ার।
পরিবর্তনটা নজরে এল বন্ডের। সাদা গলায় বলল, শুনলাম আপনার বন্ধু কলম্বো নাকি এ কারবারে বড় কারবারী। তার কথাই আগে বলুন। গল্পে ও চরিত্র জমবে ভাল। নাম পালটে দেব, ভয় নেই। খুঁটিয়ে বলুন। কারবার চালায় কিভাবে? লেখকরা যা কল্পনায় আনতে পারে না, তা বলে যান আমি কাজে লাগাই।
হাত দিয়ে চোখ ঢেকে সুন্দরী বলল, এনরিকো যদি জানতে পারে তার রহস্য ফাঁস করেছি, আমার ছাল ছাড়িয়ে নেবে।
জানতে পারলে তো।
মিস্টার বন্ড, এনরিকো জানে না এমন কিছু নেই। স্রেফ অনুমানের ওপরেও মরণ-মার মারতে পেছ পা হয় না ও। বলেই চকিতে ঘড়ির দিকে তাকাল সুন্দরী। কে জানে পিছু নিয়ে এখানেও এসেছে কিনা। ভয়ানক সন্দিগ্ধ মন ওর। এবার গলা কেঁপে যায় লিলবমের। চোখে মুখে ভয়ার্ত ভাব–আপনি বরং যান। এখানে আসাটাই ভুল হয়েছে।
সোজাসুজি ঘড়ির দিকে তাকায় বন্ড। সাড়ে-তিনটে। ঘাড় ফেরায়। ছাতার পেছন দিক দিয়ে বালুকাবেলার ওপর দিয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দূরে ভাঙা কাঠের ঘর পর্যন্ত।
