ধাপে ধাপে উচ্চগ্রামে উঠল রূপসীর কণ্ঠ। বলতে বলতে টান মেরে হ্যান্ডব্যাগ হাতে নিয়ে ছিটকে গেল চেয়ার ছেড়ে। যে পথ দিয়ে বন্ড বাইরে যাবে। ঠিক তার পাশের একটা টেবিল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ফুঁসতে লাগল বন বেড়ালির মত।
রাগে কালচে হয়ে গিয়েছিল এনরিকো কলম্বোর মুখ। ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মত তড়াক করে লাফিয়ে দাঁড়িয়ে উঠে ফেটে পড়ল অ্যাটম বোমার মত তবে রে অস্ট্রিয়ান স্বৈরিণী
খবরদার ইটালিয়ান ব্যাঙ, দেশ তুলে কথা বলবেন না। বলেই অর্ধেক ভর্তি মদের গ্লাস তুলে এমন তাগ করে ঝাঁকুনি মারল যে গ্লাস রইল হাতে, কিন্তু গ্লাসের সব মদটা গিয়ে পড়ল এনরিকোর মুখে। তেড়ে এক কলম্বো। মেয়েটা টুক করে কয়েক পা পিছিয়ে দাঁড়াল বন্ডের পথ জুড়ে। ক্রিস্ট্যাটোসকে নিয়ে বন্ড এসেছিল বেরোনোর পথে বাধা পেয়ে থমকে দাঁড়াল বিনীতভাবে।
ন্যাপকিন দিয়ে মখের মদ মুছতে মুছতে রাগে ফুলতে লাগল কলম্বো। গর্জে উঠল ভয়ানক কণ্ঠে বেরোও বেরোও! আর যেন কোনদিন তোমার মুখ না দেখি। বলেই থু থু করে মেয়েটির সামনের মেঝেতে থুতু ফেলে হন হন করে উধাও হল অফিসিও লেখা কামরার ভেতরে।
হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে এল হোটেল ম্যানেজার। সবারই খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে চেঁচামেচিতে। বন্ড অতি সহজ ভঙ্গিমায় মেয়েটির কনুই ধরে বলল, আসুন, ট্যাক্সি ডেকে দেব?
এক ঝটকায় কনুই ছাড়িয়ে নিল রূপসী। খেঁকিয়ে উঠল রাগত গলায়, শুওর! শুওর! সব পুরুষই শুওর! বলেই বুঝল অসভ্যতা হয়ে যাচ্ছে। বলল আড়ষ্ট ভঙ্গিমায়। অশেষ ধন্যবাদ আপনাকে। বলতে বলতেই এগোল বাইরের দরজার দিকে।
গুঞ্জনধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে ছুরি-কাঁটার ঠনঠনাঠন শব্দ আবার শুরু হল রেস্তোরাঁয়। কৌতুকের হাসি সবার চোখেই। তাই মুখরোচক আলোচনা টেবিল টেবিলে। হোটেল ম্যানেজার বিনয়াবনত ভঙ্গিমায় খুলে ধরল দরজা। বন্ডকে বলল, মঁসিয়ে, মাপ চেয়ে রাখছি। আপনি থাকায় জিনিসটা মিটে গেল সহজেই। ট্যাক্সি ব্রেক কষল সামনে। দরজা খুলে ধরতেই মেয়েটি আগে উঠল। পেছনে বন্ড।
জানালা দিয়ে ক্রিস্ট্যাটোসকে বন্ড বলল, কাল সকালে ফোন করব। বলেই রূপসীর দিকে ফিরে– হোটেল অ্যাম্বাসাডার।
চলল ট্যাক্সি। কিছুক্ষণ কারো মুখে কথা নেই। বন্ড বলল, কোথাও গিয়ে একটু ড্রিঙ্ক করলে হত না?
নো, থ্যাংস্। আজ আর শরীর মন বইছে না।
অন্য কোন রাতে?
কিন্তু কালকেই যে ভেনিস যাচ্ছি।
আমিও তো যাচ্ছি। কাল রাতে একসঙ্গে গেলে হয় না?
হেসে ফেলল মেয়েটি–ইংলিশ ম্যানরা তো জানতাম লজ্জায় নেটিপেটি হয়! আপনিও তো ইংলিশ তাই না? নাম কি? কি করেন?
ইংলিশ তো বটেই। নাম বন্ড-জেমস বন্ড। বই লিখি–অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী। এখন লিখছি মাদক জিনিসের চোরাই চালান নিয়ে। কাহিনীর অকুস্থল হল রোম আর ভেনিস। কিন্তু মহামুশকিলে পড়েছি। আফিং চোরাই চালানের বিন্দু বিসর্গ জানি না আমি। তাই এখানে ওখানে ঘুরে খবর জড়ো করছি। আপনি জানেন নাকি?
তাই বুঝি ক্রিস্ট্যাটোসের সঙ্গে ডিনার গিলছিলেন? হাড়ে হাড়ে চিনি ওকে। বজ্জাতের শিরোমণি। না, মশাই, না। গল্প টল্প আমি জানি না। সবাই যা জানে, আমিও তাই জানি।
বন্ডের গলায় যেন উৎসাহ উপচে পড়ল– আমিও তো তাই চাই। গল্প মানে তা গালগল্প নয়! বুজরুকি নয়। যা সত্যি, যা ঘটেছে। তা পেলেই বর্তে যাব। কানাঘুষো তো চলে। তারই দাম তো হীরের সমান–অন্তত আমার মত লেখকের কাছে।
হেসে ফেলল রূপসী-হীরের সমান?
বন্ড বলল, অত রোজগার না করলেও মন্দ রোজগার নয় আমার। ফিল্মে এ জাতীয় কাহিনী আমার অগ্রিম স্বরূপ কিছু টাকা পেয়েছি। এখন যদি গল্পটাকে খাঁটি রূপ দিতে পারি, তাহলেই মোটা দাও পেটা যাবে। রূপসীর কোলে হাত রাখল বন্ড। হীরের দাম দিতে পারি যদি গল্পটা ফিল্ম কোম্পানি কিনে নেয়। ভ্যানিম্লিফের হীরের ক্লিপ দেব। রাজি?
এবার হাত সরিয়ে দিল রূপসী। হোটেল অ্যামবাসডার এসে গেছে। ট্যাক্সির দরজা খুলেছে। রাস্তার আলোয়। নক্ষত্রের মত জ্বলছে সুন্দরী-নয়ন। সিরিয়াস চাহনি। বন্ডকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল নক্ষত্র চক্ষু। তারপর– পুরুষ মানেই শুওর। দু-চারটে পুরুষ অবশ্য কম মাত্রায় শুওর। অলরাইট। দেখা আমাদের হবে। তবে ডিনার টেবিলে নয়। যা বলব, তা ভোলা জায়গায় বলা যায় না। রোজ বিকেলে লিজেতে গোসল করতে যাই। জায়গাটার নাম বাগনি আল বেরোনি। ইংলিশ কবি বায়রন ঘোড়ায় চড়তেন যেখানে। উপদ্বীপের উঁচাল প্রান্তে। পরশু বেলা তিনটে নাগাদ আমাকে পাবেন। রোদ পোহাব। বালির পাহাড়ের মধ্যে। ফিকে হলদে ছাতার নিচে। টোকা না মেরে উঁকি দেবেন না। নাম ধরে ডাকবেন। মিস লিলবম আমার নাম।
বলেই ট্যাক্সি থেকে নেমে পড়ল রূপসী। বন্ডও নামল। হাত নেড়ে গুডনাইট জানিয়ে তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল লিলবম। পেছন থেকে ঢলঢলে দেহ রেখার দিকে চিন্তাকুটিল চোখে অনেকক্ষণ চেয়ে রইল বন্ড। তারপর ফিরে এসে ট্যাক্সিতে বলল হোটেল ম্যাজিওনেলে যেতে।
রেলপথে রোম থেকে ভেনিস যেতে হলে ল্যাগুনা এক্সপ্রেসে যাওয়াই ভাল। আরাম বেশি। ছাড়ে রোজ দুপুরে। লন্ডন হেড কোয়ার্টারের সঙ্গে কাজের কথা সেরে কোনমতে ছুটন্ত ট্রেনে উঠে বসল বন্ড। পেছনের কামরা। অ্যালুমিনিয়াম কোচ!
যথাসময়ে এল শহরের রাণী ভেনিস। গ্রান্ড ক্যানালের রক্ত রাঙা সূর্যাস্ত সব অবসাদ যেন ধুইয়ে মুছিয়ে দিল। যেটুকু অবশিষ্ট ছিল, তাও গেল সেরা হোটেলে একটানা আধঘণ্টা ঘুমোবার পর।
