হ্যাঁ, সে যেতে পারে। তাকে ওরা সবাই বিদায় জানাল।
বন্ড নিজের ঘরে চলে এল। বই-খাতা গুছিয়ে নিয়ে নিল টেবিলে, বাড়তি টেবিল যে আনা হয়েছিল তার উপরও কোন জায়গা রইল না। চেয়ারে বসে পড়ে বইয়ের মধ্যে একদম ডুবে গেল। কিন্তু তার মনে ভেসে বেড়াচ্ছে সারাদিনের ঘটনা, একটার পর একটা করে। ঠিক দশটার সময় দরজার বাইরে থেকে গুড নাইট কথাটি তার কানে চলে এল আর দরজা বন্ধ করার শব্দও। বন্ড উঠে পড়ে পোশাক বদলে নিল। দেয়ালে থারমস্ট্যাট পঁচাশি থেকে ষাটে নামিয়ে দিল, বাতি নিভিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ চিৎ হয়ে শুয়ে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর শব্দ করে একটা হাই তুলল। যদি ঘরের মধ্যে মাইক্রোফোন বসানো থাকে সেই উদ্দেশ্যে। পাশ ফিরে শুয়ে এবার চোখ বুঝল।
পরে, অনেক পরে, হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে সে একটা অতি মৃদু গুঞ্জন শুনতে পেল। মনে হচ্ছে নিচে কোথাও থেকে শব্দটা আসছে, তবু কিন্তু মনে হল অনেক দূর থেকে শব্দটা ভেসে আসছে। মাকড়সার জালের মত অতি সূক্ষ্ম ফিসফিসানি। সেটা অবিশ্রাম ও অন্তহীন। শব্দটা কিসের হতে পারে বোঝার চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুতেই ধরতে পারল না। আবার পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
.
ভোরের মৃত্যু
বন্ডের ঘুম ভেঙ্গে গেল একটা চিৎকারে। খুব ভয়াবহ চিৎকার। মনে হল কোন নরক থেকে ভেসে এল হঠাৎ করে। একটু সময়ের জন্য শোনা গেল কিন্তু তার পরে সেই অনেক নিচে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। মনে হল ডান দিকে কেবল স্টেশন থেকে যেন শব্দটা শোনা গিয়েছিল। লাফ দিয়ে বন্ড বিছানা থেকে নেমে পড়ে জানালার পর্দাটা তুলে নিল। তার তেমন কিছু চোখে পড়ল না। কোন কারো ব্যস্ততা বা ছুটোছুটি। শুধু একটি গাইড কেবল স্টেশন থেকে ক্লাবের দিকে যাচ্ছে তাও আবার অতি শান্ত পদক্ষেপে। কাঠের বারান্দাটা একেবারে জন শূন্য। কিন্তু দেখা গেল যে ব্রেকফাস্টের টেবিল সব পাতা হয়ে গেছে। বারান্দার সামনে উঠানে আরাম কেদারার সারি পড়ে গেছে সূর্য আনার্থীদের জন্য। পরিষ্কার আকাশে সূর্য ঝলমল করতে দেখা যাচ্ছে। বন্ড তখন ঘড়িতে দেখল আটটা বেজেছে। এরই মধ্যে কাজ শুরু হয়ে গেছে এখানে। ভোরবেলায় কারো মৃত্যু ও দেখা যাচ্ছে। আমি একদম নিশ্চিত যে ওটা কারোর মৃত্যুর চিৎকার। ঘণ্টা বাজিয়ে দিল।
তখনই একটি লোক ভিতরে ঢুকল, দেখে রাশিয়ান বলে মনে হল। বন্ড তখন চট করে একজন সম্মানীয় অফিসার বনে গেল।
তোমার কি নাম?
স্যার, পিটার।
ঐ চিৎকারটা কিসের শোনা গেল।
কি বললেন আপনি? পাথুরে চোখের দৃষ্টি একেবারে কঠিন দেখাল। সে সাবধান হয়ে গেল।
এই যে কিছুক্ষণ আগে যে চিৎকার শোনা গেল।
স্যার, মনে হচ্ছে কোন অ্যাকসিডেন্ট। আপনার ব্রেকফাস্ট রেডি করতে বলব কি?
বগলের নিচে থেকে বিশাল এক মেনু বের করে তাকে দেখাল।
আচ্ছা, কি রকম অ্যাকসিডেন্ট সেটা?
মনে হল একজন গাইড নিচে পড়ে গেছে। শুধু এই কয়েক মিনিটের ব্যাপার, লোকটা এটা এত তাড়াতাড়ি জানতে পারল কি করে?
যদি কোন কিছু গুরুতর ব্যাপার ঘটে তবে তা সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হয়।
লোকটি কি খুবই আহত হয়েছে?
মনে হচ্ছে লোকটি বেঁচে যাবে। মেনুটা ওর হাত থেকে নিয়ে একটু চোখ বুলিয়ে নিয়ে খাবারের অর্ডার দিল। অ্যাকসিডেন্টের খবরটা জেনে নিয়ে আমাকে বলে যাবে, কেমন?
ধন্যবাদ স্যার, বলে লোকটি চলে গেল।
বন্ডকে খুব চমকে দিল এই অকস্মাৎ মৃত্যুটা। সে মনে স্থির করে নিল শরীরটাকে শক্ত রাখাটাই হবে তার প্রথম কাজ। তার এই সময় মনে হচ্ছে এখানে যতই রহস্য থাক, আর যতই সাবধান হোক বা না হোক, একটা সময় আসবে যখন তার পেশীগুলিই তাকে কাজে লাগাতে সাহায্য করবে। তার ইচ্ছে না থাকলেও ওঠ-বস শুরু করে দিল। তারপর জোরে জোরে নিঃশ্বাস টানা। এটাও তার মনে হতে থাকল যে শীঘ্রই এখান থেকে পালাতে হবে এবং সেটা কিন্তু অবিলম্বেই।
বন্ড উঠে দাড়ি কামিয়ে গোসল করল। পিটার তখন ব্রেকফাস্ট নিয়ে এল। আর কোন খবর পাওয়া গেল গাইডের? না স্যার, আর কিছু শুনতে পাইনি। বাইরে যারা কাজকর্ম করে তাদেরই একজন। আর আমি তো ভেতরে কাজ করি। মনে হয় পা পিছলে গিয়ে গোড়ালি ভেঙ্গে গেছে। বেচারা, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ পিটার।
ধন্যবাদ স্যার, সেই পাথরের চোখে কি কোন বিরূপের আভাস খেলে গেল কি?
অনেক ঝামেলা করে শেষে বন্ড সেই জানলাটা খুলে ফেলল। ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাঁপটা এসে লাগল তার চোখে মুখে ও ঘরটাও ভরে গেল তাতে। বন্ড থারমসট্যাটের কাটা ঘুরয়ে নব্বই ডিগ্রিতে ঘুরিয়ে দিল যাতে ঠাণ্ডাটা কমে যায়। সে খেতে বসে গেল। টেরাসের বাইরে থেকে মেয়েদের গলার শব্দ শোনা গেল। একটু উত্তেজনা শোনা গেল তাদের গলায়। সে তাদের প্রতিটি কথা বুঝতে পারছে।
আমার মনে হয় সারা-র ওর সম্পর্কে কিছু বলাটা ঠিক মনে হল না।
কিন্তু হঠাৎ অন্ধকারে সে খুব বিরক্ত করতে লাগল যে।
সত্যিই তো ওর পথ আটকে ছিল?
তাই তো ও বলেছে। আমি হলে তা আমাকেও করতে হত। লোকটি একটি জন্তু ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। লোকটি কে হতে পারে?
যুগোশ্লাভদের মধ্যে একজন হতে পারে। তার নাম বারটিল।
ও, আমি জানি, খুবই খারাপ ছিল লোকটা। আর কি জঘন্য সেই দাঁতগুলি দেখেছ?
যে মরে গেছে তার সম্পর্কে কিছু বলা উচিত হবে না আর বলতেও নেই তাই না?
