এই পর্যন্ত শুনে বন্ড বলল, আমাদের কাস্টমস কিন্তু ঘুমোয় না। এ ধরনের চোরাই চালান ধরা ওদের কাছে। ছেলেখেলা। মোটরে লুকানোর জায়গাও তেমন নেই। মালটা থাকে কোথায়?
বাড়তি চাকার মধ্যে। এক একটা বাড়তি চাকার মধ্যে বিশ হাজার পাউন্ড দামের হিরোইন বওয়া যায়।
ধরা পড়ে না? মিলানের ভেতরে আনার সময়ে, ভেতর থেকে বাইরে নেওয়ার সময়ে কেউ দেখে না?
দেখে তো বটেই। ধরাও পড়ে। কিন্তু পোড় খাওয়া লোক তো। থানা পুলিশের হ্যাপা পোহাতে অভ্যস্ত। ধরা পড়লেও মুখ খোলে না। জেল হলে প্রতিবছর জেলে থাকার দরুন পায় বছর পিছু দশ হাজার ডলার। বউ বাচ্চা থাকলে তাদের ভার পালের গোদার। এ ছাড়াও কাম ফতে হলে মোটা টাকা প্রাপ্তি তো আছেই। কো-অপারেটিভ ব্যবস্থা। লাভের ভাগ সকলেই পাবে। পালের গোদা পাবে সিংহের বখরা।
বেশ! পাশের গোদাটি কে?
সাঙ্গপাঙ্গদের কাছে তার নাম দি ডাভ। আসল নাম, এনরিকো কলম্বো। এই রেস্তোরাঁর মালিক। এখানে আপনাকে এনেছি সেই কারণেই চিনিয়ে দেওয়ার জন্য। কোণের টেবিলটা দেখুন। ফুরফুরে চুলওলা মেয়েটার পাশে মোটা লোকটার নাম এনরিকো কলম্বো। মেয়েটা অবশ্য ভিয়েনার এক শয্যা বিলাসিনী। নাম, লিলবম।
বটে! বটে! বন্ড কিন্তু তাকাল না। টেবিলে বসবার আগেই তাকানো হয়ে গেছে। রেস্তোরাঁর কারোরই বাকি নেই তাকানোর। মেয়েটার চোখে খুশি ওপচাননা নিউঁকি চাহনি। তনুশ্রী ঘিরে এমন একটা সজীবতা, প্রাণোচ্ছলতা, মিষ্টতা, যে ঘরের কোণ যেন আলো করেছে তার একার রূপে। যেমন চুল তেমনি চোখ। হাসি হাসি মুখ। কণ্ঠ ঘিরে কালো ফিতে। জেমস বন্ড টেবিলে বসার পর থেকেই আড়চোখে দেখেছে, বারংবার তার দিকে তাকাচ্ছে সুন্দরী। সঙ্গী ভদ্রলোকের কাপ্তেন-চেহারা। মেয়েরা বর্তে যায় এমনি কাপ্তেন পাকড়ালে। খুশি উজ্জ্বল, পকেট ভারি। দিন কয়েক দিব্বি ফুর্তি লোটা যায়। নাঃ, লিলবমের রুচি আছে।
চকিতে দেখে নিল বন্ড। কি নিয়ে খুব হাসাহাসি চলছে দু জনের মধ্যে। রূপসীর গালে টোকা মারল টাকাওয়ালা কাপ্তেন সঙ্গী। উঠে দাঁড়াল, হন হন করে গিয়ে অফিসিও লেখা দরজা ঠেলে উধাও হল ভেতরে।
বটে! এই লোকটিই তাহলে আফিং চোরাই চালানের কর্ণধার। এরই মাথার জন্য লাখ পাউন্ড দর হেঁকেছেন M। একেই সংহার করতে চাইছে ক্রিস্ট্যাটোস বন্ডকে রি।
খামোকা দেরি করে লাভ কি? নামা যাক কাজে। রূঢ়ভাবে মেয়েটির দিকে তাকাল বন্ড। মেয়েটিও তাকাল। বন্ড হাসল। মেয়েটি যেন দেখেও দেখল না। শুধু মিষ্টি হাসল। তারপর সিগারেট টেনে নিয়ে ঠোঁটে বুলিয়ে ধোয়া ছাড়ল কড়িকাঠের দিকে। গলা আর সারা মুখ এগিয়ে ধরল সামনে, যেন কারও প্রত্যাশায়। এ ইশারার মানে জানে বন্ড। মেয়েটি অফার করছে।
সিনেমা ভাঙার সময় হয়েছে। এখুনি ভিড় বাড়বে রেস্তোরাঁয়। খালি টেবিল সাফ করা আর নতুন টেবিল পাতা শুরু হয়েছে। তদারক করছে হোটেল ম্যানেজার। ছুরি-কাটার ঝনঝন শব্দের সঙ্গে মিশেছে গ্লাসের টুংটাং আওয়াজ আর ন্যাপকিনের খসখসানি। বন্ডের আনমনা চোখের ওপর দিয়েই পাশের বাড়তি চেয়ারটা সরে গেল পাশের টেবিলে। ছ জনের জায়গা হবে সেখানে।
এনরিকো কলম্বোর রোজকার অভ্যেস নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল বন্ড। কোথায় থাকে? মিলানের ওষুধ কারখানার ঠিকানা কি? আরও ব্যবসা আছে নাকি? কথায় কথায় খেয়ালই রইল না। বাড়তি চেয়ারটা এ টেবিল সে টেবিল ঘুরতে ঘুরতে উধাও হল অফিসিও লেখা দরজার ভেতরে।
চেয়ার এসে পৌঁছাল অফিসের মধ্যে। হোটেল ম্যানেজারকে বিদেয় করে ভেতর থেকে দরজায় চাবি দিল এনরিকো কলম্বো। এল চেয়ারের সামনে। বেজায় পুরু গদীটা তুলে রাখল টেবিলে। গদীর পেছনে জিপ চেন ধরে টান দিতেই পেট ফাঁক হয়ে গেল কুশানের। টান দিতেই বেরিয়ে এল একটা গ্রুন ডিগ টেপরেকর্ডার। মেশিন তখনও চলেছে। সুইচ বন্ধ করে টেপ চালাল পেছন দিকে। রেকর্ডার থেকে টেপ খুলল। বসাল প্লেব্যাকের ওপর। স্পীড আর ভলম ঠিকঠাক করে এসে বসল চেয়ারে। সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে কান পেতে শুনতে লাগল কথোপকথন। মাঝে এটা ওটা টিপে পেছন ঘুরিয়ে কয়েকটি কথা বার বার শুনল। সবশেষে শোনা গেল বন্ডের চি চি কণ্ঠ-বটে! বটে!
তারপর আর শব্দ নেই। নীরবতা অনেকক্ষণ। কেবল রেস্তোরাঁর ব্যাকগ্রাউন্ড শব্দ-লহরী। আর কোন কথা নেই। সুইচ বন্ধ করল এনরিকো কলম্বো মূক মেশিনটার দিকে চেয়ে রইল পুরো এক মিনিট। নিবিড় তন্ময়তা ছাড়া চোখে মুখে আর কোন ভাবনার মেঘ নেই। ধীরে ধীরে মেশিনের ওপর থেকে দৃষ্টি ঘুরল অন্যদিকে শূন্য চাহনি। মৃদু কিন্তু স্পষ্ট উচ্চারণে বলল আপন মনে–স্বৈরিণীর বাচ্চা! উঠে দাঁড়াল আরো ধীরে। দরজার কাছে গিয়ে খুলল তালা। ফের তাকাল নডিপ মেশিনের দিকে। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল আর একবার–স্বৈরিণীর বাচ্চা! বলে, দরজা খুলে গেল বাইরে। বসল কোণের সেই টেবিলে।
দ্রুত, চাপা, জরুরী কণ্ঠে মেয়েটিকে কি যেন বলল এনরিকো কলম্বো। ঘাড় নেড়ে সায় দিল রূপসী, তাকাল ঘরের অপর প্রান্তে বন্ডের পানে। বন্ড আর ক্রিস্ট্যাটোস তখন টেবিলে ছেড়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে।
যেন অকস্মাৎ তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল ভিয়েনা সুন্দরী। রুষ্ট-রুক্ষ গলায় বললে কলম্বোকে জঘন্য লোক বটে আপনি। আপনার অনেক কুকীর্তি আমি শুনেছি। কাছে আসতেও বারণ করেছে কতজন। হাড়ে হাড়ে এখন বুঝছি ঠিক কথাই বলেছে সবাই। ছিঃ, ছিঃ, ছিঃ। থার্ডক্লাস রেস্তোরাঁয় ভারি তো ডিনার খাইয়েছেন, মাথা কিনে নিয়েছেন নাকি? মুখে যা আসে তাই বলছেন। যা নয় তাই চাইছেন।
