সব মিলিয়ে এক মিনিটও লাগল না। খুবই নিরীহ ব্যাপার। গোবেচারা তিনজন ইটালিয়ান ঢুকল রেস্তোরাঁয়। ত্রিমূর্তিকে খাতির করে এনে নতুন পাতা টেবিলে বসিয়ে দিল হোটেল ম্যানেজার।
বন্ড দেখেও কিছু দেখল না। ক্রিস্ট্যাটোস কাজ গুছিয়ে ফিরে আসতেই খাবার এসে গেল।
খেতে খেতে বাজে কথার ঝুড়ি উপুড় করল দুই মূর্তি। ইলেকশন, আধুনিকতম আলফা রোমিও, ইটালিয়ান ও ইংলিশ জুতার তুলনা-সব নিয়েই কথার ফোয়ারা ছোটানো। ক্রিস্ট্যাটোস নিজেই একটা কথার জাহাজ। কথা বলার কায়দায় ওস্তাদ। সব ব্যাপারের ভেতরে শাসটুকু জানে। খবর পরিবেশন করে কথার ফাঁকে ফাঁকে_ধাপ্পা বলে মনে হয় না। আমেরিকানরা লোকটাকে নিয়ে কেন মেতেছে, বন্ড তা উপলব্ধি করল। ক্রিস্ট্যাটোস কথার ধোকড় হলেও কাজের লোক।
কফি এল। কালচে রঙের সরু চুরুট ধরিয়ে কথার তুবড়ি অব্যাহত রাখল ক্রিস্ট্যাটোস। দাঁতের ফাঁকে নেচে নেচে উঠতে লাগল কালচে চুরুট। দু হাত টেবিলের ওপর রেখে টেবিলের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ খাটো গলায় বলল, এবার পিজনিস। আমি হাত মেলালাম। অ্যাদ্দিন আমেরিকানদের অনেক খবর দিয়েছি। যা কাউকে বলিনি, তা আপনাকে বলব। এরা আমেরিকায় কারবার করে না। যা কিছু কারবার ইংল্যান্ডে–আর কোথাও নয়। ইয়েস?
বুঝলাম। সব কারবারেই একটা এখতিয়ার থাকে।
ঠিক। খবর দেবার আগে শর্তটা জানানো দরকার। ইয়েস?
তা তো বটেই।
টেবিল ক্লথ নিরীক্ষণ যেন আরো বাড়ল। সিনর ক্রিস্ট্যাটোস বলল, আমেরিকান ডলারে চাই দশ হাজার ডলার। কাল লাঞ্চ খাবার আগেই ছোট নোটে পুরো টাকা আনবেন। গ্যাংটাকে ধ্বংস করবেন আপনি। কাম ফতে হলে দেবেন আরো বিশ হাজার। বন্ডের মুখের ওপর দিয়ে পিছলে গেল ক্রিস্ট্যাটোসের চাহনি, আমার লোভ নেই। যা দিয়েছিলেন, তার সবটা কিন্তু নিলাম না।
দাম তো ভালই।
দোসরা শর্ত। যদি মরেও যান, কোত্থেকে এত কথা জানালেন বলতে পারবেন না।
বেশ।
তেসরা শর্ত। গ্যাংয়ের চাই লোকটা অতি জঘন্য বলেই ফের চোখ তুলল ক্রিস্ট্যাটোস। কালো চোখে দেখা গেল লাল ঝিলিক। শুকনো শক্ত ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে চুরুটের অংশের ফাঁকে, তাকে শেষ করতে হবে–খুন।
সিধে হয়ে বসল বন্ড। অদ্ভুত চোখে তাকাল ক্রিস্ট্যাটাসের পানে। এ যে জালের মধ্যে জাল। চক্রান্তের ফাঁকে চক্রান্ত। ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা নেওয়ার তোড়জোড়। ক্রিস্টাটোসের দরকার একজন বন্দুকবাজকে। মজা হচ্ছে এই যে ক্রিস্ট্যাটোস ভাড়া করছে না বন্দুকবাজকে, বন্দুকবাজই ভাড়া গুণছে ক্রিস্ট্যাটোসকে তার পুরোনো শত্রুকে নিপাত করার জন্য। মজা মন্দ নয়ত। সিক্রেট সার্ভিসের টাকায় ক্রিস্ট্যাটোসের শত্রু নিধন।
কিন্তু কেন? বড় বলল।
প্রশ্ন করবেন না। মিথ্যে বলতে চাই না।
কফিতে শেষ চুমুক দিল বন্ড। দলগত অপরাধের পুরোনো কেচ্ছা নিশ্চয়। হিমবাহের মত। কিন্তু তা নিয়ে দরকার কি বন্ডের? ওর কাজ বিশেষ ধরনের। সে কাজ সারতে গিয়ে কারো উপকার হয়ত হোক, ক্ষতি কি? M মোটেই ব্যাজার হবেন না এতে। বন্ডের ওপর হুকুম আছে আফিং চালানোর গোটা গ্যাংটাকে ধ্বংস করার। নামহীন এই লোকটাই যদি গ্যাং-লীডার হয়, তাকে ধ্বংস করতেই হবে। হুকুম তাই। মুখে বলল, কথা দিতে পারছি না। সে ভাবনা আপনার। কেউ যদি আমাকে মারতে আসে, আমি তাকে মারব। প্রাণে মারব। নইলে নয়।
একটা টুথপিক টেনে নিয়ে আঙুলের নখ সাফ করতে লাগল ক্রিস্ট্যাটোস। এক হাতের পাঁচটা আঙ্গুল পরিষ্কার হবার পর চোখ তুলে–কথা না পেলে আমি কাজ করি না। তবে এক্ষেত্রে করব। কারণ, টাকা ঢালছেন আপনি–আমি নয়। আপনি দিচ্ছেন, আমি নিচ্ছি। বেশ, তাহলে খবর শুনুন। শোনবার পর আপনি কিন্তু একা হয়ে যাবেন। আমি আর নেই। কালই আমি করাচি যাচ্ছি। ইমপরট্যান্ট পিজনিস। খবর দিয়েই আমি খালাস। কাজ সারবেন একা।
রাজি।
চেয়ারটাকে বন্ডের চেয়ারের কাছে সরিয়ে আসল সিনর ক্রিস্ট্যাটাস। মিহি গলায় তুরন্ত গতিতে শুরু হল খবর দেওয়া। খবরটা যে হুঁকা, তার প্রমাণস্বরূপ তারিখ, নাম বলতে দ্বিধা করল না। বাজে বিষয় নিয়ে সময় নষ্ট করল না। যুক্তরাষ্ট্র থেকে খেদিয়ে দেওয়া দু হাজার বদমাস লুঠেরা ডেরা নিয়েছে এ দেশে। পুলিশের মার্কামারা দাগাবাজ লিস্টে নাম উঠেছে প্রত্যেকের। কুকীর্তি এদের এত জঘন্য যে ওদের মধ্যে চাই বলতে একশ জন। সাংঘাতিক র্দুদে এই একশ জন টাকা জোগাড় করে সটকেছে বেরুট, ইস্তামবুল ট্যানজিয়ার আর ম্যাকাওতে। চারটে জায়গাই বিশ্বের বৃহত্তম স্মাগলিং কেন্দ্র। দাগাবাজদের আর একটা বড় দল মাল লেনদেন নিয়ে ব্যস্ত। এদের মধ্যে যারা মহাপ্রভু, তারা বেনামীতে মিলানে ওষুধের কারখানার মালিক হয়েছে। এটা হল একটা ঘাটি। বাইরের দল আফিং, মরফিন, হিরোইনের চোরাই চালান দিচ্ছে এই কারখানায়। ঘোট ঘোট জাহাজে ভূমধ্যসাগরের ওপর দিয়ে, একদল স্টুয়ার্ডের যোগসাজসে ইটালিয়ান উড়োজাহাজে। সপ্তাহ সপ্তাহ ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস রেলপথে আসছে চোরাই চালান। ইস্তামবুলের ট্রেন ক্লিনারদের টাকা খাইয়ে ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসের যাবতীয় চামড়ার গদির নিচে লুকানো হয় আফিং। মিলানের ওষুধ কোম্পানির নাম ফার্মোসিয়া কলম্বা এস এ। এই কারখানার মূল কাজ হল মাল পাচার করা আর কাঁচা আফিং থেকে হিরোইন বানানো। বিভিন্ন কোম্পানির তৈরি হরেক রকম নিরীহ দর্শন মোটরগাড়িতে এই মাল ডেলিভারি হচ্ছে ইংল্যান্ডের দালালদের কাছে।
