তেতো হাসি হাসলেন M যুক্তিটা খুব সম্ভব রোনি ভ্যালান্স এর আবিষ্কার। আমেরিকার মত ইটালীতেও আফিং এর চোরাই চালান তরুণ সমাজকে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে সরকার হিমসিম খাচ্ছে। কিছুই করতে পারছে না। ভ্যালান্সের প্রেত ফৌজ অবশ্য মাঝের লোকেদের দু একজনকে বার করেছে। মাল আসছে ইটালী থেকেই–টুরিস্টদের গাড়ি বোঝাই হয়ে। ইটালিয়ান পুলিশ আর আন্তজার্তিক পুলিশকে নিয়ে সাধ্যমত করেছে ভ্যালান্স। দু চারটে ধরপাকড় হয়েছে। কিন্তু জালের মাঝখানে পৌঁছতে পারেনি।
বাধা দিল বন্ড, নিশ্চয় কেউ বুক দিয়ে আগলাচ্ছে।
হতে পারে। প্রাইম মিনিস্টারের অর্ডার পাবার পর ওয়াশিংটনের কথা বলেছিলাম। সি.আই.এ. অনেক কিছু জানে। আফিং দফতরের একটা ঘাটি ইটালীতেও মোতায়েত আছে যুদ্ধের পর থেকেই। সি.আই.এ.-র সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই। আমেরিকান ট্রেজারী ডিপার্টমেন্টের একটা শাখা আফিং মরফিনের চোরাই চালান বন্ধ করার জন্য সিক্রেট সার্ভিস গাছের কিছু লোক পোষে। অদ্ভুত ব্যবস্থা। এফ.বি.আই. কেন যে মুখ বুজে সয়ে যায় বুঝি না। বলে, ফেলে চেয়ার ঘুরালেন M–সি.আই.এ.-র চাই অ্যালান জালেস একজনের নাম আমাকে দিয়েছে। লোকটার নাম ক্রিস্ট্যাটোস। দু মুখো সাপ। আসলে স্পাই। আফিং কারবারীদের খবরাখবর নিতে হলে আফিং চালানের ভান করতে হয়। তাই একটু আধটু সে কাজও করে। ডালেস খবর পাঠিয়েছে ক্রিস্ট্যাটোসকে। পরশুদিন তোমার সঙ্গে দেখা করবে রোমে। ডালেসের কাছে ও শুনেছে, গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ে আমাদের এক মহা চৌকস লোক যাচ্ছে কথা বলতে। বাকিটুকু এ ফাইল পড়লেই পাবে।
ঘর নিস্তব্ধ। বন্ড ভাবছিল, গোটা ব্যাপারটা যেন কেমন রহস্যজনক। বিপজ্জনক তো বটেই। সেই সাথে যাচ্ছেতাই রকমের নোংরা।
ফাইল বগলে বন্ড উঠে টাকার খেলায় নামতে হবে মনে হচ্ছে। চালান বন্ধ করতে কত খরচ করবেন?
রুক্ষ গলায় M বললেন, এক লাখ পাউন্ড। যে কোন দেশের টাকা ভাঙিয়ে দেব। প্রাইম মিনিস্টারের হিসেবে লাখ পাউন্ড। আমার হিসেবে দরকার পড়লে আরও লাভ পাউন্ড। কার্পণ্য করতে যেও না। মাদক কারবারে ঝুঁকি অনেক। অপরাধ মহলে এর চাইতে বিপজ্জনক আর জটিল চক্রান্ত জাল আর নেই।
মেনু তুলে নিয়ে বলল ক্রিস্ট্যাটোসমিস্টার বন্ড, ফাঁকা কথায় আমার রুচি নেই, ছাড়বেন কত?
পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড। গ্যাংটার চিহ্ন যেন কোথাও না থাকে।
উদাস কণ্ঠ ক্রিস্ট্যাটোসের তা তো বটেই। টাকা তো খোলাম কুচি নয়। ফুটি, শুয়োরের মাংস আর চকলেট আইসক্রিম আনাই। রাতে আমার কম খাওয়া অভ্যাস। কিয়ান্তিতেও অরুচি নেই।
ওয়েটারকে বিদেয় করে খড়কে কাঠি চুষতে লাগল ক্রিস্ট্যাটাস। দেখতে দেখতে মুখ হল তোল হাঁড়ির মত। যেমন গম্ভীর, তেমনি, নূর। চোখ ঘুরতে লাগল ঘরময়। চঞ্চল, অশান্ত চাহনি ঝলসে উঠতে লাগল থেকে-থেকে।
বেশ কিছুক্ষণ পরে যেন মনস্থির করে ফেলল ক্রিস্ট্যাটোস। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, বাথরুমে যাচ্ছি, বলে উধাও হল রেস্তোরাঁর পেছনে।
হঠাৎ বেজায় খিদে পেয়ে গেল বন্ডের। সেইসঙ্গে গলা কাঠ হয়ে এল পিপাসায়। কিয়ান্তি ঢেলে ভরল পেল্লায় গ্লাস। আধ গ্লাস খেয়ে রুটিতে হলদে মাখন মাখিয়ে ঠাসতে লাগল মুখে। ক্রিস্ট্যাটোসকে নিয়ে আর ভাবনা নেই। কাজের লোক। আমেরিকানরা অত ভরসা রাখে? নিশ্চয় ফোন করছে কাউকে। ফিরবে এখুনি। আচ্ছা, ফ্রান্স আর ইটালী ছাড়া পাকানো রুটি আর মাখন আর কোথাও এমন সুস্বাদু হয় না কেন?
চৌকোনা ঘরের অপর কোণে বসে ফুরফুর চুলওলা চনমনে মেয়েটা বলল সঙ্গের হাসিখুশি ভদ্রলোককে হাসিটা নিষ্ঠুর হলে কি হবে, চেহারায় তো ময়ুর ছাড়া কার্তিক। গুপ্তচররা তো এত সুন্দর হয় না। আপনার ভুল হয়নি তো?
সুপুরুষ সঙ্গী তখন স্প্যাগেটি খেতে ব্যস্ত। মুখ থেকে প্লেট পর্যন্ত ঝুলছিল সেঁউইয়ের লম্বা সূতা। সঙ্গিনীর কথায় এক কামড়ে সূতা কেটে টম্যাটো সস-মাখন-ন্যাপকিন দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে ঢেকুর তুলল সশব্দে। বলল, এসব ব্যাপারে স্যানটোসে বাজে খবর দেয় না। স্পাই দেখলেই ঠিক চেনে। এই গুণের জন্যই তো ওকে বারোমাস বাস্টার্ড ক্রিস্ট্যাটোসের পেছনে লাগিয়ে রেখেছি। স্পাই ছাড়া শুয়োরটার সঙ্গে সন্ধ্যে কাটাতে কেউ চায়? তবুও সন্দেহের শেষ রাখব না। বলে পকেট থেকে টিনের যন্ত্র বার করে কটকট শব্দ করল। ঘরের অপর কোণ থেকে কাজ ফেলে রেখে দৌড়ে এল হোটেল ম্যানেজার।
ইয়েন্স, স্যার।
খাইয়ে লোকটা কেবল ঘাড় কাৎ করল। ইশারা বুঝল হোটেলে ম্যানেজার। হেঁট হতেই কানে কানে হুকুম দিল উদর প্রেমিক। সঙ্গে সঙ্গে রান্নাঘরের কাছে অফিসিও লেখা দরজার সামনে গিয়ে ভেতরে উধাও হল।
এরপর যে দাবাবোড়ের খুঁটি চালা শুরু হল। দাবার ছকের ওপর দিয়ে দানের খুঁটি যেমন ধাপে ধাপে নড়ে চড়ে এগোয় কিস্তিমাৎ ঘরের দিকে, ঠিক সেইভাবেই অনুষ্ঠিত হল একটা দৃশ্য। স্পাগটি চিবুতে চিবুতে গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত সব দেখল পেটুক লোকটা।
অফিসিও লেখা দরজা দিয়ে ফের বেরিয়ে এল হোটেল ম্যানেজার। কড়া গলায় হুকুম দিল দু-নম্বরকে, চারজনের বাড়তি টেবিল।
তাড়াতাড়ি চোখে চোখে চাইল দু নম্বর। সায় দিল ঘাড় হেলিয়ে। ম্যানেজারের পেছন পেছন এসে দাঁড়াল বন্ডের টেবিলের পাশে। তুড়ি মারতেই কয়েকজন এসে দাঁড়াল পাশে। এদিক-ওদিকে রাখা দুটো টেবিলের পাশে এল দুটো বাড়তি চেয়ার, তৃতীয় বাড়তি চেয়ারটা এল বন্ডের টেবিলের পাশ থেকে। চতুর্থ চেয়ারটা এল অফিসিও লেখা দরজার দিক থেকে–বয়ে নিয়ে এল হোটেল ম্যানেজার নিজেই। বাকি তিনটে চেয়ারের সঙ্গে চতুর্থ চেয়ারটি সাজিয়ে রাখবার পর মাঝখানে বসানো হল একটা টেবিল। কাঁচের টুকিটাকি বাসনপত্র সাজানো হল টেবিলে। ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইল হোটেল ম্যানেজার। বলল, সে কি! বললাম তিনজনের টেবিল পাততে, অথচ, চেয়ার দিয়েছ চারটে। কথা শেষ হওয়ার আগেই নিজেই নিজের চেয়ারটা সরিয়ে রাখল বন্ডের টেবিলের পাশে। হাত নাড়তেই টেবিল চেয়ার সাজাতে যারা ছুটে এসেছিল, তারা ছিটকে গেল যে-যার কাজে।
