ওয়েটার এল–গুড ইভনিং স্যার। সিনর ক্রিস্ট্যাটাস টেলিফোন করতে গেছেন।
গডন দিয়ে এক গ্লাস নিপ্রোনি আনো, বলেছিল বন্ড।
বলতে-বলতে দৈত্যাকার ক্রিস্ট্যাটোস এসে পৌঁছেছিল। খেলনা চেয়ারের মত ছোট্ট চেয়ারটাকে তুলেছিল লোমশ হাতের বিশাল থাবা দিয়ে। দুলিয়ে রেখেছিল গুরুভার ছাপার ঠিক নিচে। দুঃখিত, অ্যালফ্রেজের সঙ্গে কথা ছিল।
করমর্দনের ধার দিয়েও যায়নি ক্রিস্ট্যাটোস। যেন অনেক দিনের চেনাজানা। সম্ভবত একই কারবারের কারবারী। আমদানি রপ্তানি কারবারের মতই। আর কেউ কমবয়সী পুরুষটাকে দেখলে মনে করত বুঝি আমেরিকান। উঁহু। তা তো নয়। পোশাক তো ইংরেজদের মত।
ছোকরা আছে কি রকম? স্বাভাবিক গলা বন্ডের।
ছোট হয়ে এসেছিল সিনর ক্রিস্ট্যাটাসের কুচকুচে চোখ।
কথাটা তাহলে মিথ্যে নয়। লোকটা পেশাদারই বটে। মুখে বলেছিল, একই রকম। আপনার কি মনে হয়?
পোলিও রোগটা খুব সাংঘাতিক তো!
নিগ্রোনি এসে গিয়েছিল। জমিয়ে বসেছিল দু জনে। দু জনেরই মনে পরস্পরের প্রতি সমীহ। কম যায় না কেউই।
এই গেল মোলকাতের প্রথম ধাক্কা। তারপরও গেছে দু-দুটো ঘণ্টা। বন্ডকে তখনো খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে যাচাই করে চলেছে ক্রিস্ট্যাটোস। কম মজা নয় তো, মনে মনে ভেবেছে বন্ড। বন্ডকে গোপন কথা বলা যায় কি না, বন্ডের ওপর ভরসা রাখা যায় কিনা, এই নিয়ে যেন পরীক্ষা নিরীক্ষার অন্ত নেই ক্রিস্ট্যাটাসের কথাবার্তায়। লোকটার এই অতিরিক্ত হুঁশিয়ারি একদিক দিয়ে নিশ্চিন্ত করেছে বন্ডকে। M ঠিক লোকই চিনেছেন। ক্রিস্ট্যাটোস অনেক খবর রাখে। নইলে বলত না ইন দি পিজনিস ইজ মাচ রিসিকো।
ছেঁড়া দেশলাইয়ের শেষ ফালিটা ছাইদানিতে ফেলে বলল বন্ড, যে ব্যবসার লাভ শতকরা দশ টাকার বেশি আর যে কাজ রাত নটার আগে সারা যায় না, শুনেছি তা নাকি সাংঘাতিক বিপজ্জনক ব্যাপার। যে কাজের কথা বলতে বসেছি, তাতে টাকা পাবেন শতকরা হাজার। গভীর রাত ছাড়া এ কাজ শেষ করার কথা ভাবাও যায় না। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, দু দিক দিয়েই ঝুঁকি প্রচুর এ কাজে। বলেই গলা খাটো করল– টাকার অভাব নেই। এ বিজনেসে। ডলার, সুইস ফ্রাঁ, ভেনিজুয়েলান বলিভার–যা চাইবেন তাই পাবেন।
বাচলাম। আমার আবার ইটালিয়ান লীরা বড় বেশি জমে গেছে কিনা, মেনু তুলে নিয়ে বলল ক্রিস্ট্যাটাস। এবার কিছু খাওয়া যাক। খালি পেটে ইমপরট্যান্ট পিজনিস নিয়ে কথা বলা যায় না।
এই ঘটনার ঠিক এক সপ্তাহ আগে বন্ডকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন M। বন্ড গিয়ে দেখল ভদ্রলোকের মেজাজ সপ্তমে চড়ে রয়েছে। খেঁকিয়ে উঠে শুধিয়েছিলেন জিরো জিরো সেভেন, হাতে কাজের চাপ আছে?
কাগুজে কাজ কিছু আছে।
ধাঁ করে পাইপ নামিয়ে M বললেন, কাগুঁজে কাজ মানে? ও কাজ নেই কারো?
মানে তেমন গতর খাটানো কাজ নেই।
তাই বললেই তো হয়, লাল ফিতে বাঁধা একগাদা ফাইল নিয়ে এমন জোরে M টেবিলে ছুঁড়লেন যে বন্ডকে লুফে নিতে হল।
নাও, কাগুজে কাজ আরো কিছু করো। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের ব্যাপার–আফিংয়ের চোরাই কারবার। হোম অফিস আর মিনিস্ট্রি অফ হেলথ-এর কাগজপত্র জেনেভার আন্তর্জাতিক আফিং কনট্রোল-এর ইয়া মোটা রিপোর্ট নিয়ে গিয়ে পড়। সারাদিন রাত ধরে পড়। কাল রোম যাবে। পালের গোদাদের পেছন নেবে। পরিষ্কার?
সায় দিল বন্ড। M-এর তিরিক্ষে মেজাজের কারণটা এতক্ষণে বোঝা যাচ্ছে। আসল কাজ থেকে অন্য কাজে অধস্তন অফিসারদের টানলেই সাংঘাতিক মেজাজ খিঁচড়ে যায় ওর। আসল কাজ হল গুপ্তচরবৃত্তি, দরকার মত তছনছ করা, ধ্বংস করা, আগুন বোমা ইত্যাদি দিয়ে শক্ত ঘাঁটি লণ্ড ভণ্ড করা। এ ছাড়া কিছু করা মানেই সিক্রেট সার্ভিসের নামমাত্র তহবিলের অপচয়।
জিজ্ঞাস্য কিছু আছে জাহাজের গলুইয়ের মত ঠেলে বেরিয়ে এল M-এর চোয়াল। যার মানে অতি পরিষ্কার। বন্ড যেন এখুনি ফাইল বগলে নিয়ে কেটে পড়ে। M-এর, এর চাইতেও অনেক দরকারী কাজ আছে।
বন্ড হাড়ে হাড়ে জানতে পেরেছে M-এর অভিনয়। M-এর মাথায় বেশ কয়েকটা পোকা আছে। মাঝে মাঝে নড়ে ওটে পোকাগুলো৷ সিক্রেট সার্ভিসে নামজাদা হয়ে গেছে প্রতিটি পোকা। M-এর তাতে জ্বক্ষেপ নেই। পোকাগুলো স্রেফ খোশমেজাজি খেয়াল যেমন, দাড়িওলা কাউকে চাকরি দেওয়া হবে না। পুরোপুরি দোভাষীদেরও স্থান নেই সার্ভিসে, ক্যাবিনেট মিনিস্টারদের সুপারিশ নিয়ে এলে দুর দুর করে তাড়িয়ে দেওয়া, ফতোবাবুর মত জামাকাপড় পরা। পুরুষ বা নারীদের দু চক্ষে দেখতে না পারা, ডিউটির সময় বাদে অন্য সময় স্যার বললেই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠা এবং স্কচ সাহেবদের মাথায় নিয়ে নাচা। চার্চিল বা মন্টগোমারির মত নিজের খোস মেজাজ সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল ছিলেন M। ওয়াকিবহাল থেকেও পাখি পড়ান না পড়িয়ে বন্ডকে কোন কাজে পাঠানো মোটেই পছন্দ করতেন না।
সবই জানত বন্ড। দুটো জিজ্ঞাস্য আছে, স্যার। এ কারবারে কেন নাক গলাচ্ছি চোরা কারবারীদের খবরাখবর কি স্টেশন ওয়ানের কাছে পাওয়া যাবে।
তেতো চোখ কটমট করে তাকালেন। তারপর চেয়ার ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে মেঘ দেখতে দেখতে জম্পেশ টান দিলেন পাইপে। দেখ জিরো জিরো সেভেন, মাদক জিনিসের কারবারে সার্ভিস নাক গলায়, এ আমি চাই না। বছরের প্রথম দিকে তোমার মেক্সিকো পাঠিয়েছিলাম আফিং চাষীদের তাড়া দিতে। মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছিলে সেবার। সেবার পাঠিয়েছিলাম স্পেশ্যাল ব্রাঞ্চের মুখ রাখতে। এবার ফের সেই অনুবোধ এসেছিল ইটালিয়ান গ্যাংটাকে শায়েস্তা করার জন্য। সরাসরি না বলে দিয়েছিলাম। তখন রোনি ভ্যালান্স আমাকে টপকে ধরাধরি শুরু করে হোম অফিস আর মিনিস্ট্রি অফ হেলথ এর দফতরে। চাপ এলে মিনিস্টারদের কাছ থেকে। বলে পাঠালাম, তোমাকে এখন ছাড়া যাবে না। কারণ এখানকার কাজ তোমার বদলে অন্য কাউকে দেওয়া যাবে না। তখন প্রাইম মিনিস্টারের কাছে ধরনা দিল দু জন মিনিস্টার। একটু থেমে আবার বললেন M প্রাইম মিনিস্টার ছিনে জোকের মত বোঝালেন, ব্যাপারটা নাকি সোজা নয়। আফিং আর মরফিন থেকে তৈরি পাহাড় প্রমাণ হিরোইন পাচার হচ্ছে দেশের মধ্যে। উদ্দেশ্য, সমাজের মনোজগতে বিপর্যয় আনা। এও একধরনের যুদ্ধ। মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। দেশকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেওয়া। স্রেফ টাকা পেটা নাকি উদ্দেশ্য নয়। ইটালিয়ান গ্যাংয়ের পেছনে আরো কুচক্রী আছে।
