চ্যাটাল জুতা। ধড়াস করে উঠল বন্ডের বুক। জুতার কথাটা একদম মনেই ছিল না। নিশ্চয় ঝোঁপের মধ্যে কোথাও লুকানো আছে জুতাজোড়া। আহাম্মক কোথাকার। দেখে ফেলল নাকি ওরা?
মন্থর চরণে হিসেব করে পা ফেলে ফেলে এগিয়ে এল দুই পাতালবাসী–বিশ ফুট দূরে এসে কি যেন বলল সামনের লোকটা। রাশিয়ান ভাষা বলেই মনে হল। জবাব দিল না বন্ড।
উত্তর না পেয়ে থমকে দাঁড়াল দুই মূর্তি, অবাক হয়ে বন্ডের দিকে তাকাল–সম্ভবত সাংকেতিক প্রত্যুত্তরের আশায়।
বিপদ ঘনিয়ে আসছে। চক্ষের নিমেষে রিভলবারটা টেনে নিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে গেল বন্ড। গর্জে উঠল ভয়ালকণ্ঠে, হ্যান্ডস্ আপ।
কোল্টের নল নেড়ে হাত ওপরে তোলার ইঙ্গিত করে বন্ড। সঙ্গে সঙ্গে পুরোধা ব্যক্তি জোর গলায় কি একটা হুকুম দিয়েই ছিটকে ধেয়ে এল সামনে। একই সঙ্গে দ্বিতীয় ব্যক্তিও ছুটে গেল পাতালপুরীর চিচিংফাঁক দরজার দিকে।
গাছের আড়াল থেকে দড়াম করে ধমক দিয়ে উঠল একটা রাইফেল এবং পা মুচড়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল পলায়নমান লোকটা। এদিক সেদিক থেকে ছুটে আসছে, এফ স্টেশনের চার জোয়ান।
সামনের লোকটা লাফ দিয়েছে বন্ডকে লক্ষ্য করে। এক হাঁটুর ওপর বসে পড়ল বন্ড, কোল্টের নল চালাল লোকটাকে লক্ষ্য করে। গায়ে লাগল ঠিকই, কিন্তু তারপরেই যেন মাথার ওপর পাহাড় ভেঙ্গে পড়ল। একইসঙ্গে দুজনে গড়িয়ে পড়ল ঘাসের ওপর। বন্ডের চোখ লক্ষ্য করে এগিয়ে এল আঙ্গুলের নখ। চক্ষের পলকে বন্ড পাশে সরে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে মোক্ষম একটা আপারকাট খুঁসিতে ছিটকে পড়ল বন্ড জমির ওপর। সঙ্গে সঙ্গে ভূলুণ্ঠিত দেহের ওপর লাফিয়ে পড়ল পাতালবাসী এবং ডানহাতের কব্জি মুচড়ে ধরে রিভলবারের নলের মুখ আস্তে আস্তে প্রচণ্ড শক্তিতে ফিরিয়ে দিতে লাগল বন্ডের দিকে।
আর খুন করার ইচ্ছে ছিল না বলেই সেফটি ক্যাচটা তুলে রেখেছিল বন্ড। প্রাণপনে চেষ্টায় বুড়ো আঙ্গুলটা সরিয়ে আনতে লাগল সেফটি ক্যাচের দিকে।
তৎক্ষণাৎ বুটের লাথি এসে পড়ল মাথার পাশে। মাথা ঘুরে অবশ হাত থেকে খসে পড়ল রিভলবারটা। লালচে কুয়াশার মধ্যে দেখল কোল্টের মৃত্যুমুখী নল অব্যর্থ নিশানায় স্থির হয়ে গেল তার খুলি টিপ করে। মৃত্যু, এবার মৃত্যু। অনুকম্পা দেখিয়েছিল বন্ড, তারই দাম দিতে হচ্ছে নিজের জীবন দিয়ে। কিন্তু একি!
আচম্বিতে উধাও হল কোল্টোর কালো নল। দেহের ওপর থেকে সরে গেল লোকটার গুরুভার বন্ধু। টলতে টলতে হাটুর ওপর উঠে বসল বন্ড। তারপর সিধে হয়ে দাঁড়াল। পায়ের কাছেই চিৎপাত হয়ে পড়ে আছে পাতালপুরীর সেই লোকটা। পিঠের কাছে রক্ত গড়াচ্ছে।
আশেপাশে বন্ড তাকাল। এফ স্টেশনের চার জোয়ান দাঁড়িয়ে দল বেঁধে। স্ট্র্যাপ খুলে ক্র্যাশ হেলমেটটা হাতে নিল বন্ড। মাথার পাশে হাত বুলোত বুলোতে বলল, সাবাস! কাজটা কার?
কেউ জবাব দিল না। চারজনেই কেমন বিমূঢ়।
বন্ড নিজেও ঘাবড়ে গেল। লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে শুধাল ব্যাপার কি?
হঠাৎ চোখে পড়ল দলবদ্ধ চার জোয়ানের পেছনে কি যেন একটা নড়ছে। দেখা গেল আর একটা বাড়তি পা। মেয়েরী পা!
অট্টহাস্য করে ওঠে বন্ড। কাষ্ঠহাসি হেসে চার জোয়ান তাকায় পেছনে। বাদামী শার্ট আর কালো জীন পরে ওদের পেছন থেকে সামনে এগিয়ে এল মেরী অ্যান রাসেল–দু হাত শূন্যে ভোলা। এক হাতে .২২ টার্গেট পিস্তল।
হাত নামিয়ে পিস্তলটা কোমরে গুজতে গুজতে বন্ডের সামনে রাসেল এল। উদ্বিগ্ন স্বরে-দোষটা এদের নয়, আমার। আমি ওদের পেছন ছাড়িনি। এসেছিলাম বলেই এ যাত্রা বেঁচে গেলেন। পাছে আপনার গায়ে গুলি লাগে, এই ভয়ে তো কেউ গুলিই করছিল না।
চোখে চোখ রেখে মৃদ্যু হাসল বন্ড, না এলে হয়ত আজ রাতের খানাটাই বরবাদ হয়ে যেত, তাই না?
বলেই চার জোয়ানের দিকে ফিরল। বলল কাটখোট্টা গলায়, অলরাইট। একজন মোটর সাইকেল নিয়ে চলে। যান। কর্নেল স্ক্রাইবারকে রিপোর্টটা দিয়ে আসুন। বলবেন, ওরা না আসা পর্যন্ত আমি মাটির নিচে নামতে পারছি না। জনা দুয়েক অ্যান্টি-স্যাবোটেজ এক্সপার্ট যেন আনেন। ফাঁদ পাতা থাকতে পারে দরজায় মুখেই। ঠিক আছে?
সুন্দরীকে কাছে টেনে নিল বন্ড। বলল, আর আপনি আসুন আমার সঙ্গে। একটি পাখির বাসার সন্ধান দেব।
সেটাও কি আপনার হুকুম?
হ্যাঁ।
.
রিসিকো মানে ঝুঁকি
ইন দিজ পিজনিস ইজ মাচ রিসিকো।
পুরু, বাদামী গোঁফের তলা দিয়ে বেরিয়ে এল শব্দগুলো। কথাটা ইংরেজি। কিন্তু বিকৃত উচ্চারণের দরুন অদ্ভুত শোনাচ্ছিল। বক্তা বলতে চাইছে, ইন দিজ বিজনেস ইজ মাচ রিস্ক। অর্থাৎ এ কাজে ঝুঁকি অনেক। কিন্তু বিজনিসকে পিজনিস আর রিস্ককে রিসিকো বলায় খটকা লাগা স্বাভাবিক।
বক্তার কুচকুচে কালো শক্ত চোখজোড়া এবার নিবদ্ধ হল বন্ডের মুখে আর হাতের ওপর। বন্ড তখন অতি সন্তর্পণে একটা কাগজের দেশলাই ছিঁড়ছে। দেশলাইয়ের ওপরে ছাপা অ্যালবর্গো কলম্বা ডি ওরো।
কুচকুচে কালো চোখ দুটো যে বন্ডের চামড়া ছিদ্র করে মন পর্যন্ত দেখছে, বন্ড তা টের পেল। ঘণ্টা দুয়েক ধরেই চলছে এই নিরীক্ষণ পর্ব। এক্সেলসিওর পানাগারে আসার পর থেকেই। এসেছে ঐ শুফো মন্তানের সঙ্গেই আলাপ জমাতে। সেই থেকে চুলচেরা দেখা শুরু হয়েছে।
বন্ড শুনে এসেছিল যে লোকটার সঙ্গে তার মোলাকাৎ ঘটবে। নাকের নিচে তার ইয়া মোটা গোঁফ আছে। এক গ্লাস আলেকজান্দ্রা সুরা নিয়ে বসে থাকবে গোটা একটা টেবিল জুড়ে। শুনে হাসি পেয়েছিল বন্ডের। লোম চেনবার গোপন সংকেত এমন মেয়েলীও হয়। আলেকজান্দ্রা মানেই ক্রিম মেশানো পানীয়। গতানুগতিক চিহ্নের চাইতে ভাল। ভাঁজ করা খবরের কাগজ পড়া, বোতামের ঘরে ফুল গুঁজে রাখা বা হলদে দস্তানা পরে থাকার রেওয়াজ গুপ্তচরদের মধ্যে চালু আছে। এসব সংকেত দেখলেই একজন স্পাই আরেকজন স্পাইকে চেনে। কিন্তু ক্রিস্ট্যাটোস বড় জবর চিহ্ন লাগিয়েছে। বারে ঢুকে বন্ড দেখেছিল জনাবিশেক লোককে। কিন্তু গোঁফ কারো নেই। এককোণে শুধু টেবিলে শোভা পাচ্ছে ক্রিম আর ভদ্কার তালট্যাঙা গ্লাস। আর কোনদিকে না তাকিয়ে বন্ড গিয়ে বসেছিল টেবিলের সামনে চেয়ারে।
