পেরিয়ে গেল ১৮৪ নং রাস্তা, এল ৩০৭ নং সড়ক। বেলী এবং নয়জি-লেরয়ের মধ্যে দিয়ে সেন্ট নম। এখান থেকে আচমকা বাঁক নিলেই ডি, ৯৮ সড়ক–খুনের রাস্তা। ঘাসের পাটির ওপর বাইক দাঁড় করাল বন্ড। আর একবার চোখ বুলিয়ে নিল ৪৫ কোল্টের লম্বা নলটার ওপর। পেটের কাছে রিভলভার গুঁজে খুলে রাখল জ্যাকেটের বোতাম। এবার রওনা হওয়া যাক-অন ইওর মার্কস! গেট সেট…!
চকিতে ক্ষিপ্রতায় মোড় ঘুরল বন্ড এবং নিমেষে গতিবেগ বৃদ্ধি করল ঘণ্টায় পঞ্চাশ মাইল। বহুদূরে দেখা যাচ্ছে সুড়ঙ্গটা–প্যারিস মোটর চলা রাস্তার সুড়ঙ্গ। পাহাড়ের বুক চিরে সুদীর্ঘ টানেল। দেখতে দেখতে হাঁ বড় হল সুড়ঙ্গের, গিলে ফেলল বন্ডকে। কানে তালা লাগার উপক্রম হল একসস্টের প্রচণ্ড শব্দে…যেন মুহর্মুহু কামান দাগার শব্দ। মিনিট খানেকের জন্য সুড়ঙ্গ পথের স্যাঁতস্যাঁতে ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাঁপটা লাগল। পরক্ষণেই আবার সূর্যালোক। টানেলের মুখ ছোট হয়ে যাচ্ছে পেছনে। পেরিয়ে এল ক্যারিফোর রয়্যাল। চোখের সামনে দিগন্তবিস্তৃত পিচঢালা পথ যেন তেল মাখানো…জ্বলছে সোনা সোনা রোদে। মাইল দুয়েক পথ জঙ্গল ফুঁড়ে বেরিয়ে গেছে। পাতা আর শিশিরের মিষ্টি সৌরভ। গতিবেগ চল্লিশে কমিয়ে আনল বন্ড। স্পীডের ঝাঁকুনিতে থর থর করে কেঁপে উঠল বাঁ হাতের ড্রাইভিং আয়না। আয়নার বুকে দ্রুত অপসৃয়মান গাছের সারি আর সীমাহীন সিধে সড়ক ছাড়া আর কিছু নেই কোথাও।
তবে কি ভয় পেয়েছে হত্যাকারী? ঘাপটি মেরে রয়েছে পাতাল পুরীতে? হয়ত আগে থেকেই চর মারফত খবর পৌঁছে গেছে ভূগর্ভ-ঘাঁটিতে, তাই আজ বিবর মধ্যেই আশ্রয় নিয়েছে পাতালকেতু।
ওকি! ওকি! ঐ তো, একটা কালো বিন্দু দেখা যাচ্ছে না? পেটমোটা কনভেক্স গ্লাসের ঠিক কেন্দ্রে একটিমাত্র ফুটকি…দেখতে দেখতে তা পরিণত হল মাছিতে…মাছি থেকে ভীমরুল…এবং ভীমরুল থেকে গুবরে পোকায়। এবার স্পষ্ট দেখা গেল একটা ক্র্যাশ হেলমেট ঝুঁকে পড়েছে বাইকের হ্যান্ডেল বারের ওপর…দুটো মস্ত কালো থাবা আঁকড়ে রয়েছে হাতল দুটো।
সর্বনাশ! এ যে দেখছি উল্কার মত ছুটে আসছে। দর্পণের বুক থেকে চকিতে বন্ডের চোখ ঘুরে গেল সামনের বিস্তৃত পথের ওপর…পরক্ষণেই ফিরে এল কনভেক্স গ্লাসের ওপর। খুনেটার ডান হাত রিভলবারটা তুলে নিলেই…।
গতি কমিয়ে আনল জেমস বন্ড–পঁয়ত্রিশ, তিরিশ, কুড়ি। মসৃণ ধাতুর মত ঝিকমিক করছে সামনে পিচ ঢালা পথ। আততায়ীর ডান হাতটা আর হ্যান্ডেলবার ধরে নেই। লৌহ শিরস্ত্রাণের নিচে দুটো গগলসের কাঁচ সূর্যের আলোয় যেন দাউ দাউ করে জ্বলছে দু মালসা অঙ্গারের মত।
সময় হয়েছে। ভয়ানক জোরে ব্রেক কষলো বন্ড এবং চক্ষের নিমেষে পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণে রাস্তার ওপর পিছলিয়ে বোঁ করে ঘুরিয়ে নিয়ে গেল বি.এস.এ.কে। সঙ্গে সঙ্গে স্তব্ধ হল ইঞ্জিন।
এমন আকস্মিক ক্ষিপ্রতা সত্ত্বেও দেরি করে ফেলেছিল বন্ড। উপর্যুপরি দুবার গর্জে উঠল হত্যাকারীর আগ্নেয়াস্ত্র। একটা বুলেট বন্ডের ঊরুর পাশ দিয়ে গেঁথে গেল সিটের স্প্রিং এ।
সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল কোল্ট রিভলবার। মাত্র একবার।
টলমল করে উঠল হত্যাকারীর মোটর বাইক। যেন একটা অদৃশ্য দড়ির ফাঁস জঙ্গলের মধ্যে থেকে বেরিয়ে হ্যাঁচকা টানে রাস্তার ওপর তুলে নিয়ে গেল বাইক সমতে খুনে চালককে। এলোমেলোভাবে সড়ক বেয়ে ছুটতে ছুটতে এক লাফে টপকে গেল পাশের খানা এবং পরক্ষণেই প্রচণ্ড শব্দে আছড়ে পড়ল একটা বীজগাছের গুঁড়ির ওপর। মুহূর্তের জন্য গুঁড়ির গায়ে সেঁটে রইল বাইক সমেত চালক। তারপরেই ঝনঝন শব্দে গড়িয়ে পড়ল ঘাসের ওপর।
বাইক থেকে নেমে দাঁড়াল বন্ড। ধীর পদে গিয়ে দাঁড়াল ধোঁয়া ওঠা দোমড়ানো ইস্পাত আর বিকৃতভাবে মোচড়ানো দেহটার পাশে। নাড়ি দেখবার আর দরকার হল না। বুলেট যেখানেই লাগুক না কেন, ক্র্যাশ হেলমেটটা ডিমের খোলার মতই চুরমার হয়ে গেছে সংঘর্ষের ফলে।
ঘুরে দাঁড়াল বন্ড। কোল্টটা আবার খুঁজে রাখল পেটের কাছে বেল্টের ফাঁকে। কপাল ভাল তার। আততায়ীর বুলেট আর একচুল এদিক দিয়ে গেলেই…
বি.এস.এ. র ওপর লাফিয়ে বসল বন্ড। ফিরে চলল ক্যারিফোর রয়্যালের দিকে।
জঙ্গলের মধ্যে আঁচড়কাটা একটা গাছের গুঁড়ির গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড় করাল বি-এস-এ কে। তারপর গেল খোলা মাঠটার কিনারায়। মাথার ওপরে ঝাকড়া আখরোট গাছ। তাই জায়গাটা একটু ঝুপসি। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে যতদূর সম্ভব নকল করার চেষ্টা করল সেই বিচিত্র শিশ ধ্বনির। যেন খুশি মনে গান গেয়ে উঠল বনের পাখি। হত্যাকারীর চিচিং ফাঁক সংকেত।
একবারই শিশ দিল বন্ড। তারপর দুরু দুরু বুকে শুরু হল প্রতীক্ষা। তবে কি ভুল হল শিশের সুরে?
ঠিক তখুনি কেঁপে উঠল গোলাপ ঝাড়। শুরু হল তীক্ষ্ণ তীব্র গোঁ-গোঁ গজরানি। মোটর চলছে।
কোল্টের ইঞ্চি খানেকের মধ্যে বেল্টের ফাঁকে বুড়ো আঙ্গুল আটকে পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে রইল বন্ড। আর খুনখারাপি করার ইচ্ছে নেই। অনুচর দুজনকে সশস্ত্র বলে তো মনে হয়নি। কাজেই কি প্রয়োজন অযথা রক্তপাতের।
বাঁকানো দরজাটার পাল্লা দুটো দু হাট হয়ে খুলে গেছে। ফাঁক দিয়ে প্রথমে বেরিয়ে এল একজন–তারপরে সেই অদ্ভুত জুতা। তারপরে আর একজন।
