অনুচর দু জন ফিরে আসছে। বিবর ঘাটিতে প্রবেশ করল দু জনে এবং মাথার ওপর আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে গেল গোলাপঝাড় সমেত আশ্চর্য পাল্লা দুটো। দলপতি মোটর-সাইকেল নিয়ে রাস্তাতেই দাঁড়িয়ে রইল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বন্ড দেখল ছটা পঞ্চান্ন।
বটে! বটে! সকাল সাতটায় আবার নতুন ডেসপ্যাঁচ রাইডার শিকারের উদ্দেশ্যেই এই অভিযান। হয়ত শিকারী জানে না যে, ডেসপ্যাঁচ রাইডাররা সপ্তাহে একদিনই বেরোয়। জানলেও হয়ত ভেবেছে, সদ্য খুন হয়ে যাবার পর শেপ কর্তৃপক্ষ রুটিন পালটেছে। স্রেফ নিরাপত্তার খাতিরে ডেসপ্যাঁচ রাইডার নির্দিষ্ট দিনে না বেরিয়ে বেরোবে হয়ত অন্য কোন দিনে। হুঁশিয়ার লোক বটে। খুব সম্ভব এদের গুপ্তচর-প্রধানের নির্দেশ আছে, গ্রীষ্ম আসার আগেই যতখানি সম্ভব কাজ গুছিয়ে নেওয়া। এরই মধ্যে তো টুরিস্ট আসা শুরু হয় গেছে। সাবধানের মার নেই তাই পাতালপুরী বন্ধ রেখেই সরে যাবে নিরাপদ স্থানে। আবার ফিরে আসবে শীতকালে। আরও কত প্ল্যান থাকতে পারে কু-চক্রীদের কে জানে। তবে আরো একটা খুন হবে বন্ড সে বিষয়ে নিশ্চিত।
মিনিটের পর মিনিট কেটে যায়। সাতটা দশের সময় ফিরে এল পালের গোদা। উন্মুক্ত তৃণভূমির কিনারায় একটা ঝাঁকড়া গাছের তলায় দাঁড়িয়ে মাত্র শিশ দিল বিচিত্রি সুরে। যেন মহা উল্লাসে গলা ছেড়ে গান গেয়ে উঠল কোন সুকণ্ঠী পাখি।
সঙ্গে সঙ্গে খুলে যেতে লাগল গোলাপ ঝাড়ের সিং দরজা। বিচিত্র জুতা পরে বেরিয়ে এল দুই অনুচর। দলপতির পিছু পিছু উধাও হল গাছের সারির আড়ালে। ফিরে এল একটু পরেই। দু কাঁধে চামড়ার ফিতেতে ঝুলছে মোটর সাইকেলটা। বাঘা চোখে চারপাশ দেখে নিয়ে নিশ্চিন্ত হল দলপতি। কেউ কোথাও নেই। আস্তে আস্তে নেমে গেল পাতাল পথে এবং বিশাল পাল্লা দুটো এসে বন্ধ করে দিল প্রবেশ পথ। গুণগুণ করতে লাগল ভোমরার দল। চিহ্ন রইল না কোথাও।
আরো আধঘণ্টা কাঠ হয়ে শুয়ে রইল বন্ড। বনভূমির স্বাভাবিক প্রাণ চাঞ্চল্য আবার ফিরে এসেছে সবুজ ভূমি খণ্ডে। ঘণ্টা খানেক পরে যখন খর সূর্যকিরণে ছায়া আরো গাঢ় হল, নিঃশব্দে বন্ড নেমে এল। সরীসৃপের মত বুকে হেঁটে শাখার ওপর দিয়ে পিছলে পিছলে পৌঁছাল গুঁড়ির কাছে, টুক করে লাফ দিল শ্যাওলা ঢাকা ঘাসের কার্পেটে এবং অদৃশ্য হল।
সেদিন সন্ধায় সব শুনে চেঁচামেচি শুরু করল মেরি অ্যান রাসেল। বলল, আপনার মাথা খারাপ হয়েছে। এ কাজ আপনাকে আমি করতে দেব না। এফ কর্তাকে দিয়ে ফোন করছি কর্নেল স্ক্রাইবারকে। এ কাজ শেপ -এর কাজ। আপনার নয়।
ধাঁ করে বন্ড বলল, খবরদার, ওসব করতে যাবেন না। কাল সকালে ডিউটি ডেসপ্যাঁচ রাইডারের বদলে আমাকে খুশি মনে পাঠাতে পারেন কর্নেল স্ক্রাইবার। খুশিটা তিনি মুখেও প্রকাশ করেছেন। সুতরাং এ অবস্থায় এর বেশি আর কিছু জানার অধিকার তার নেই। তাছাড়া এ নিয়ে মাথা ঘামানোর আর ইচ্ছে নেই ভদ্রলোকের, ফাইল বন্ধ করে অন্য প্রসঙ্গ ভাবছেন। যা বলি শুনুন। লক্ষ্মী মেয়ের মত টেলিপ্রিন্টারে রিপোর্টটা M-কে পাঠাবার ব্যবস্থা করুন
গোল্লায় যাক আপনার M। গোল্লায় যাক আপনার সার্ভিস। হিস্ট্রিয়ার রোগিণীর মত চেঁচিয়ে উঠেছে রাসেল। গলায় রাগ আর কান্না মিশিয়ে এ কি ছেলেখেলা হচ্ছে রেড ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে মেকী লড়াই? একাই একশ হবেন? আসলে আপনি বাহাদুরী দেখিয়ে নাম কিনতে চান।
বিরক্তি আর চাপতে পারে না বন্ড। ধমকে উঠে বলে, হয়েছে-হয়েছে, অনেক হয়েছে। এখুনি টেলিপ্রিন্টারে পাঠিয়ে দিন রিপোর্টটা, আমার হুকুম।
আরক্ত মুখে ক্ষণকাল তাকিয়ে যেন হাল ছেড়ে দিল রাসেল, ঠিক আছে, ঠিক আছে, আর হুকুম জাহির করতে হবে না। যা করবার আমি করছি। কিন্তু সাবধানে থাকবেন। চোট না লাগে। গুড লাক।
এই তো লক্ষ্মী মেয়ের মত কথা। কাল রাতে খাওয়ার নেমন্তন্ন রইল, কেমন? আর মেনন ভিলেই ভাল। গোলাপী শ্যাম্পেন আর জিপসীর বেহালা বাজনা। প্যারিস মানেই রুটিন কাণ্ড। রাজি?
মন্দ কি! সুতরাং আরো হুঁশিয়ার হবেন তো?
বলা বাহল্য অযথা ভাববেন না। গুড নাইট।
নাইট।
রাতে শুতে যাওয়ার আগে গোটা প্ল্যানটাকে মনে মনে ঘষে মেজে ঝকঝকে তকতকে করে তুলল বন্ড। ডিউটি বুঝিয়ে দিল এফ স্টেশনের চার জোয়ানকে।
আর একটি সুন্দর সকাল।
অভিযানের জন্য তৈরি হচ্ছে জেমস বন্ড। বেশ জাঁকিয়ে বসেছে বি, এস, এ. মোটরসাইকেলের ওপর। অনতিকাল পরেই দ্বিচক্রযানে চেপে শুরু হবে তার দুঃসাহসের খেলা-জীবন আর মৃত্যুর জুয়া খেলা। পরিণামটা কি তা বন্ড নিজেও জানে না। ক্যারিফোর রয়্যালের রাস্তায় কি যে ঘটবে, তা না জেনেও শান্ত তার লোহার মত স্নায়ু।
ঘুটঘুট করে চলেছে মোটর বাইকের ইঞ্জিন। সিগন্যাল কোরের করপোর্যাল বন্ডের হাতে তুলে দিল শূন্য ডেসপ্যাঁচ কেসটা। বলল, আপনাকে দেখে স্যার মনে হচ্ছে রয়্যাল কোরেই আপনি জীবন কাটালেন। চুলটা অবশ্য একটু ঘাঁটলে ভাল হত। কিন্তু ইউনিফর্মটি যা মানিয়েছে না। বাইকটা কিরকম লাগছে স্যার?
স্বপ্নের পক্ষিরাজ। কত দিন যে চালাইনি।
ঘড়ির দিকে তাকাল করপোর্যাল। সিগন্যাল দেওয়ার সময় হয়েছে। চোখ তুলে বললে, সাতটা বাজতে আর দেরি নেই। ও-কে!
বুড়ো আঙুলের ইঙ্গিত পেতেই গগলসটা টেনে চোখের ওপর নামিয়ে দিল বন্ড। হাত নেড়ে বিদায় জানাল করপোর্যালকে। বুটের ঠোক্কর মারল গীয়ারে, কাকর-বিছানো পথের ওপর দিয়ে সবেগে ঘুরে গিয়ে তীরবেগে বেরিয়ে গেল মেন গেটের মধ্য দিয়ে।
