ভয়ের হিমশীতল স্রোত বন্ডের শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যায়। অনুমানটা তাহলে সঠিক! কিন্তু এর পরের দৃশ্যটা কি?
মাটির ঢিবির দিক থেকে এবার একটা শব্দ ভেসে এল।
অদ্ভুত শব্দ। যেন অতি উচ্চগ্রামে গুনগুন করছে অগুন্তি ভোমরা। অতি তীব্র এবং সেই কারণেই প্রায় অশ্রুত পাতলা ভ্রমর গুঞ্জনের সেই অপার্থিব চাপা শব্দটা জাগ্রত হল নিরীহ দর্শন গোলাপ কুঞ্জের তলা থেকে।
ইলেকট্রিক মোটর চলার শব্দ। পুরোদমে মোটর চলছে। আচম্বিতে ঈষৎ কেঁপে উঠল গোটা গোলাপের ঝাড়টা। সদলবলে শূন্যে ছিটকে গেল মধুমক্ষিকা বাহিনী। কিছুক্ষণ ভেসে থাকবার পর আবার নেমে এল গোলাপঝাড়ে।
খুব ধীরে ধীরে, যেন জাদুমন্ত্রবলে। একটা চিড় দেখা দিয়েছে ধরিত্রীতে। গোলাপ ঝাড়ের ঠিক মাঝ-বরাবর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ফাটলটা। ক্রমশ আলো চওড়া হল। মসৃণ গতিতে যেন উন্মোচিত হচ্ছে নাগলোকের পাতাল বিবরে।
এবার গোলাপঝাড়ের দু পাশ খুলে যাচ্ছে দু দিকে হুবহু দু পাল্লা দরজার মত। নিবিড় তমসায় ঢাকা রন্ধ্রলোক আরও প্রকট হচ্ছে। পাল্লার ভেতরের দিকে ঝুলছে গোলাপের শেকড়, এবং শেকড় সমেত, গোলাপ সমেত ভূগর্ভ পুরীর সিংদরজার বিশাল পাল্লা খুলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
আরো স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে কলকজার ভ্রমরগুঞ্জন। ঈষৎ বাঁকানো পাল্লা দুটোর কিনারা ঝিকমিক করছে সূর্যালোকে। চকচকে ধাতুর দরজা। তার ওপর সযত্নে পুঁতে দেওয়া হয়েছে গোলাপ ঝাড়।
সাবাস বিভীষণবাহিনী! সাবাস তোমাদের শয়তানি বুদ্ধি!
দু হাট হয়ে খুলে গেল ধাতুর দরজা। দু পাশে খাড়া হয়ে রয়েছে দ্বিধাবিভক্ত গোলাপ কুঞ্জ। নির্বিকার অলিকুল নিশ্চিন্ত মনে তখনও মধু আহরণে ব্যস্ত। সূর্যের আলোয় এবার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মাটির তলায় পুরু ধাতুর স্তর। যেন মাটিতে পোঁতা অতিকায় ডিম–যার ওপরটা হঠাৎ দু ভাগ হয়ে গেছে ডাকিনী মন্ত্রে।
বক্র দরজার মাঝে কালো আঁধার পাতলা হয়ে এসেছে ওপরের দিনের আলোয়, আর ভেতরের ইলেকট্রিক আলোয়। মোটর চলার আওয়াজ থেমেছে। ঝিকিমিকি বিদ্যুত্বাতি আড়াল করে এবার বিবর মুখে আবির্ভূত হল একটা মাথা আর একজোড়া কাঁধ।
যেন একটা মানুষ চিতা। শব্দহীন সঞ্চরণ। সজাগ চাহনি। সতর্ক পদক্ষেপে উঠে এল একটা লোক। গুঁড়ি মেরে বসল বাঘের মতই। সূচিতীক্ষ্ণ চোখ বুলিয়ে নিল সবুজ তৃণভূমির ওপর। লোকটার হাতে একটা রিভলভার।
পর্যবেক্ষণ সন্তোষজনক হল নিশ্চয়। তাই ঘাড় ফিরিয়ে হাতের ইঙ্গিত করতেই ফাটলপথে উঠে এল আরও একজন। কিম্ভুতকিমাকার তিন জোড়া জুতা প্রথম ব্যক্তির হাতে তুলে দিল দ্বিতীয় ব্যক্তি। এবং পরক্ষণেই অদৃশ্য হয়ে গেল।
একজোড়া জুতা বেছে নিল প্রথম লোকটা। নিজেই বুটসুদ্ধ পা গলাল তার মধ্যে। ফিতে বাঁধল। আরও সহজভাবে চলাফেরা শুরু হল পাতালবাসীর। কিম্ভুতকিমাকার জুতার চ্যাটাল শুকতলার নিচে ঘাস ঈষৎ দুমড়ে গিয়েই আবার খাড়া হয়ে যেতে লাগল। জুতার ছাপের চিহ্ন মাত্র পড়ল না কোথাও।
মনে মনে তারিফ না করে পারল না বন্ড।
বেরিয়ে এল দ্বিতীয় ব্যক্তি তার পেছনে আরেকজন। দুজনে মিলে পাতাল গহ্বরের ভেতর থেকে ধরাধরি করে তুলে নিয়ে এল একটা মোটর সাইকেল। কাঁধে চওড়া চামড়ার পটিতে বাইকটা লাগিয়ে ঝুলিয়ে নিল। সিধে হয়ে দাঁড়াতেই প্রথম ব্যক্তি প্রত্যেকের পায়ে বেঁধে দিল সেই বিচিত্র দর্শন জুতা। তারপরে তিনজনেই হেঁটে চলল রাস্তার দিকে। গাছের ছায়ায় ভৌতিক মূর্তির মতই তিনজনে এগিয়ে চলল। পা ফেলল অতি সন্তর্পণে। পা তুলল অতি সন্তপণে। ভঙ্গিমা দেখেই তাদের অভিপ্রায় বোঝা যায়। নিঃশব্দে অভিযানের উদ্দেশ্য অত্যন্ত কুর, অত্যন্ত কুটিল।
অবরুদ্ধ উদ্বেগে বন্ড এতক্ষণ কাঠ হয়ে শুয়েছিল। এবার পাঁজরা খালি করে বেরিয়ে এল দীর্ঘশ্বাস।
বটে! এইটেই তাহলে পঞ্চমবাহিনীর গোপন ঘাঁটি। সব কটা ছাড়া ছাড়া ঘটনাই এবার এক সূতায় গেঁথে যাচ্ছে। মোটরবাইক বাহী অনুচর দু জনের পরনে ধূসর রঙের ঢিলে আলখাল্লা। কিন্তু দল নায়ক প্রথম ব্যক্তির পরনে রয়্যাল কোর অব সিগন্যালস এর ইউনিফর্ম। মোটর সাইকেলের রঙ অলিভ গ্রীন–বি.এস.এ.এম-টোয়েন্টি। বৃটিশ আর্মির রেজিস্ট্রেশন চিহ্নিত করা পেট্রল ট্র্যাঙ্কে।
এরপর আশ্চর্য হওয়ার আর কিছুই রইল না। এই কারণেই অত কাছ থেকে দেখেও নিহত হওয়ার আগে বেচারী ডেসপ্যাঁচ রাইডার কোন বদ সন্দেহ করতে পারেনি। ভেবেছে সহকর্মী। কিন্তু টপ সিক্রেট দলিলপত্র নিয়ে এরা এ তল্লাট ছেড়ে যখন বাইরে যায়নি, তখন অনুমান করে নিতে হবে রেডিওর শরণ নিয়েছে। অর্থাৎ, গুপ্ত খবরের সারাংশ। নিশুতিরাতে বেতার মারফত পাচার করে দিয়েছে আপন ঘাঁটিতে। পেরিস্কোপের বদলে গোলাপের উঁটার ছদ্মবেশ পরানো এরিয়েল উঠে এসেছে ঝোঁপের মধ্য থেকে। পাতাল কক্ষে সচল হয়েছে জেনারেটর এবং ইথারের মধ্যে দিয়ে সাংকেতিক সংবাদ বর্ডার পেরিয়ে গেছে শত্রুপক্ষের ঘাটিতে।
সাঙ্কেতিক সংবাদ। বিবর ঘাঁটিতে যত সঙ্কেত আছে, সবই জানা যাবে বন্ড যদি একবার ভেতরে ঢোকে। এই সুযোগে কিছু ভুয়া খবরও পাঠানো যেতে পারে শত্রু শিবিরে। এদের মূল ঘাঁটি নিশ্চয় রাশিয়ার সোভিয়েত মিলিটারি ইনটেলিজন্স নিয়ন্ত্রণ করছে এই পাতাল ঘাটিতে। রেসের ঘোড়ার মত দৌড়াতে থাকে বন্ডের চিন্তাধারা।
