ওক গাছের শাখায় শুয়ে নিজের মনেই হাসল বন্ড। যুদ্ধ শুধু বাইরে নয়, যুদ্ধ ঘরেও। দুটো দলেরই উদ্দেশ্য এক শত্রুর উচ্ছেদ। অথচ নিজেদের মধ্যে রেষারেষি করে কি বিপুল উদ্যম শক্তিরই না অপচয় করেছে। নিজেদের মধ্যে আগুন ছোঁড়াছুড়ি না করে যদি শত্রুর দিকেই তা নিক্ষিপ্ত হত তাহলে পঞ্চমবাহিনীর অস্তিত্ব কোণকালে মুছে যেত দেশ থেকে।
সাড়ে ছ টা বাজে। সকালের নাস্তার সময় হল। সন্তর্পণে বন্ডের ডান হাত বিচিত্র পোশাকের পকেট হাতড়াতে লাগল এবং তারপরেই উঠে এল মুখের জায়গায় হুডের মত কাটা ফাঁকটুকুর সামনে। রয়ে সয়ে অনেকক্ষণ ধরে চুষল গ্লুকোজ ট্যাবলেটটা। তারপর আর একটা। চোখ কিন্তু সরল না উন্মুক্ত তৃণভূমির ওপর থেকে, লাল কাঠ বেড়ালিটা অনেকক্ষণ ধরেই খেলা জুড়েছে টিবিটার আশে পাশে, কুটকুট করে খাচ্ছে ছোট ছোট শেকড়। অবশেষে ঢিবির তলায়। এসে দু-থাবার মধ্যে নতুন একটা খাদ্যবস্তু ধরে ব্যস্ত হয়ে পড়ল তাই নিয়ে। ঘন ঘাসের মধ্যে হুটোপাটি করছিল একজোড়া বুনো পায়রা, বনভূমির নৈঃশব্দ ভঙ্গ হচ্ছিল কেবল ওদেরই প্রেম কূজনে। একটা কাঁটা ঝোঁপের ওপর বাসা নির্মাণ করার জন্য টুকিটাকি বস্তু সংগ্রহে নিদারুণ ব্যস্ত হয়ে পড়ল একজোড়া চড় ই। গোলাপ ঝোঁপের ওপর ঐকতান শুরু করে দিল মধুমক্ষিকার দল। দলে ক্রমশ ভারি হচ্ছে ওরা। বিশ গজ দূরে ডালপাতার আড়ালে ওক গাছের শাখায় শুয়ে সমস্তই স্পষ্ট দেখতে পেল জেমস্ বন্ড। এ যেন ঠাকুরমার ঝুলি থেকে আহরণ করা একটা অপরূপ রূপকথা। দীর্ঘ সমুন্নত বৃক্ষের শির ধুইয়ে অরুণ কিরণ স্বর্ণধারার মত ঝরে পড়ছে আশ্চর্য সবুজ ঘাসজমির ওপর। নাচছে। ভোমরা। গাইছে পাখি। আনন্দের হিল্লোলে হিল্লোলিত সতেজ ঘাসগুলিও। রাত চারটে থেকে গাছে উঠে ঘাপটি মেরে বসে আছে বন্ড। রাতের অন্ধকার মিলিয়ে গেলে ভোর যে এমন অপরূপ হয়ে দেখা দেয় তা এর আগে কখনো এমনভাবে প্রত্যক্ষ করেনি সে।
বিহঙ্গকুলের দৌরাত্ম্য ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। হতভাগারা ঝটাপটি করতে করতে বন্ডের মাথায় এসে বসলেই কেলেঙ্কারী।
বিপদজ্ঞাপক সঙ্কেতটা সর্বপ্রথম এল পায়রাদের কাছ থেকে। আচম্বিতে প্রচণ্ড পাখা ঝটপটানির শব্দ তুলে জমি। ছেড়ে সবাই আশ্রয় নিল গাছের ডালে। তারপর বাকি পাখিরাও তৃণভূমি ছেড়ে চম্পট দিল গাছ লক্ষ্য করে। সবশেষে ছুটল কাঠবিড়ালির দল।
নীরব হয়ে গেল বনভূমি। গোলাপকুঞ্জের ওপর গুণগুণ ভ্রমর সঙ্গীত ছাড়া আর কোন শব্দই নেই তৃণভূমিতে। নিঃশব্দ। আশ্চর্য নিঃশব্দ।
ব্যাপার কি? কিসের জন্য বিপদজ্ঞাপন সংকেত? কি দেখে ভয় পেল নিরীহ পায়রা, পাখি আর কাঠবিড়ালির দল?
ধীরে ধীরে উত্তাল হয়ে উঠতে লাগল বন্ডের হৃদপিণ্ড। দূরবীনের মত তীক্ষ্ণ চোখ দুটো তৃণভূমির প্রতি বর্গইঞ্চি স্থান খুঁটিয়ে দেখতে লাগল অস্বাভাবিক কোন সূত্রের আশায়।
আর, তারপরেই ধড়াস করে উঠল বুকটা। গোলাপ ঝোপে কি যেন নড়ছে না?
নড়াটা এত সামান্য, এত অল্প যে ধর্তব্যের মধ্যে নয়। অথচ তা অসাধারণ। ধীরে ধীরে। ইঞ্চি ইঞ্চি করে, একটি মাত্র কাঁটাবৃত্ত উঠে আসছে ওপরকার শাখার মাথা ছাড়িয়ে। অস্বাভাবিক রকমের সিধে আর মোটা একটা গোলাপবৃন্ত।
আস্তে আস্তে উঠে আসতে লাগল বোঁটাটা। ঝোঁপের ফুটখানেক ওপরে না উঠা পর্যন্ত অব্যাহত রইল উধ্বগতি। তারপরেই দাঁড়িয়ে গেল।
বোঁটাটার ডগায় একটিমাত্র লাল গোলাপ। ঝোঁপের ফুটখানেক ওপরে উঠে থাকার জন্যই বুঝি অস্বাভাবিক লাগছিল গোলাপটা–তা না হলে কিছুই বোঝবার উপায় নেই। হঠাৎ দেখলে মনে হবে, এ আর এমন আশ্চর্য কি! সিধে ভঁাটার ওপর একটা লাল গোলাপ। প্রকৃতির সৃষ্টিতে কত বৈচিত্র্য আছে এও তার মধ্যে একটা, তার বেশি কিছু নয়।
কিন্তু এমন সুন্দর গোলাপটির মধ্যেই এবার ঘটল এক অকল্পনীয় পরিবর্তন। আচম্বিতে, অত্যন্ত ধীরে-ধীরে, নিঃশব্দে পাপড়িগুলো কাঁপতে লাগল, আস্তে আস্তে খুলে যেতে লাগল এবং ঝুলে পড়তে লাগল বাইরের দিকে। হলুদ গর্ভকেশর গুটিয়ে সরে গেল পাশে।
আর, সূর্যের আলো টিকরে পড়ল আধুলির মত বড় একটা কাঁচের লেন্সের ওপর। মনে হল, লেন্সটা যেন সিধে তাকিয়ে রয়েছে বন্ডের পানেই। কিন্তু পরক্ষণেই আস্তে-আস্তে বোটার ওপর ঘুরে যেতে লাগল অবিশ্বাস্য এই গোলাপ চক্ষু; অত্যন্ত ধীর-ধীরে পুরো একটা পাক দিয়ে, সমস্ত তৃণভূমি খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করে, আবার ফিরে তাকাল বন্ডের পানে।
অবশেষে যেন নিশ্চিন্ত হয়েই আবার পাপড়ি আর গর্ভকেশরগুলো উঠে এসে ঢেকে দিল কাঁচ-চক্ষু, এবং ধীরে ধীরে নজরে আসে এমনি গতিতে নেমে গেল, বিচ্ছিন্ন বোটটা মিশে এক হয়ে গেল অন্যান্য বৃন্তের সঙ্গে।
নিঃশ্বাস বন্ধ করে এতক্ষণ পড়েছিল বন্ড। এবার যেন ছিপি-খোলা সোডার বোতলের মতই পাঁজর খালি করে বেরিয়ে এল দীর্ঘশ্বাস। ক্ষণেকের জন্য চোখ বুজে জিরেন দিল চোখের টনটনিয়ে ওঠা স্নায়ুগুলোকে।
জিপসী! গোলাপবৃন্তের খোলস ঢাকা কলকজা বাউন্ডুলে জিপসীদের মাথা থেকে বেরোয়। গত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জার্মানরা মাথা চাড়া দিতে ইংরেজরাও যা বানাতে পারেনি এমন কি জার্মানরা নিজেরাও যে অভিনব যন্ত্র কল্পনাতে আনতে পারেনি, এখানকার তৃণভূমির পাতালপুরীতে তা সৃষ্টি করে গেছে কয়েকজন জিপসী! ঘাস-ছাওয়া মাটির ঢিবির নিচে গর্ভগৃহ থেকে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে গোলাপের ছদ্মবেশ পরানো আশ্চর্য যন্ত্র-চক্ষু! পেরিস্কোপ!
