দুটো টেনিস কোর্ট জুড়লে যা হয়, খোলা জায়গাটার মাপ তাই। পুরু গালিচার মতই ঘন ঘাসের স্তরে ঢাকা। শ্যাওলা ফুলও আছে প্রচুর। লিলিজ অব দি ভ্যালী এবং রুবেলের স্তবক শোভা পাচ্ছে কিনারা বরাবর গাছের নিচে নিচে। একধারে রয়েছে একটা নিচু ঢিবি। কাঁটাঝোঁপ আর কাঁটা গোলাপের ঘন ঝোপে আগাগোড়া ঢাকা। অজস্র ফুল ফুটেছে ঝোঁপটায়। ঝরা পাপড়ি গড়িয়ে পড়েছে ঢিবির গোড়া পর্যন্ত।
ঝোপটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল বন্ড। তাতেও মন ভরল না। গোটা ঢিবিটাকে একটা পাক দিয়ে এল। হেঁট হয়ে দেখল শিকড় পর্যন্ত তীক্ষ্ণ চোখে। কিন্তু মাটির ঢিবি ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ল না।
শেষবারের মত অনুবীক্ষণ চোখে তন্ন তন্ন করে গোটা মাঠটাকে দেখে নিল বন্ড। তারপর এসে দাঁড়াল এমন একটা কোণে, যেখান থেকে রাস্তা সব চাইতে কাছে। এই জন্যই কি ঘাস জমিতে চলাচলের একটা রেখা ফুটে উঠেছে? ঘাসগুলো যেন দোমড়ানো, লোক চলাচলের আবছা চিহ্ন না?
পথটা জিপসীদের পায়ে পায়েও সৃষ্টি হতে পারে। অথবা বনভোজনে উৎসাহী তরুণ তরুণীদের দাপটেও সম্ভব। রাস্তার একদম ধারে দুটো গাছের মাঝ দিয়ে পথটা অত্যন্ত সঙ্কীর্ণ হয়ে গেছে।
গুড়ি দুটো পরীক্ষা করার জন্য হেঁট হয়েছিল বন্ড। ঘ্রাণ নিয়েছিল। তারপর জানু পেতে বসে নখ দিয়ে গুঁড়ির ছাল থেকে তুলে এসেছিল কাদার একটা পাতলা চাপড়া।
কাদার নিচেই গুঁড়ির ওপর একটা সুস্পষ্ট আঁচড়-চিহ্ন। গভীর দাগ। কাদা দিয়ে কায়দা করে লুকোনো দাগটা।
বাঁ-হাতে কাদার চাপড়াটা ধরে থুথু ছিটিয়ে ভিজিয়ে দিল বন্ড এবং আবার সযত্নে ঢেকে দিল আঁচড়ের দাগটা যেমন ছিল ঠিক তেমনিভাবে।
মিনিট কয়েকের মধ্যেই সাঙ্গ হল গুঁড়ি পরীক্ষা। দেখা গেল, এদিকের গুঁড়িতে রয়েছে সবসুদ্ধ তিনটে আঁচড়ের চিহ্ন আর ওদিকের গুঁড়িতে চারটে।
দ্রুত পদক্ষেপে বনভূমি ছেড়ে রাস্তায় এসে দাঁড়াল বন্ড। ঢালু জায়গায় ব্রীজের নিচেই দাঁড় করানো ছিল ওর গাড়ি। ব্রেক ছেড়ে ঠেলা দিতেই গড়িয়ে নেমে এল বেশ খানিকটা। ফাঁকা জায়গাটা থেকে বেশ খানিকটা দূরে না আসা পর্যন্ত ইঞ্জিন চালু করল না, সাহসও হল না।
তাই আবার ফিরে এসেছে বন্ড, এসেছে সেই নির্জন বনতলে। এবার আর ঘাসের ওপর নয়, গাছের ওপর। এসেছে। অনেক আশা নিয়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এত প্রচেষ্টা ভস্মে ঘি ঢালার সামিল হবে কিনা, সে শঙ্কাটাও মনে আছে। কিছুতেই তাই স্বস্তি পাচ্ছে না বেচারী।
M-এর হুকুমেই ওকে আসতে হয়েছে এখানে। উনি বলেছেন, গন্ধ যখন পাওয়া গেছে, সেই গন্ধ জিপসীদের গন্ধ হলেও জায়গাটা দেখা দরকার। কারণ বন্ডের রিপোর্ট ছিল, কুকুরেরা গন্ধ পেয়েছিল জিপসীদের…পুরো শীতকাল কাটিয়ে তারা গেছে গত মাসে…কোন নালিশ নেই…উধাও হয়েছে রাতারাতি।
একেই বলে অদৃশ্য সূত্র। অদৃশ্য মানুষের সূত্র। ঘটনার পটভূমিকায় যারা রয়েছে, তারা এতই পরিচিত যে ভুলেও মনে হয় না নাটের গুরু তারাই। ছ জন পুরুষ আর দু জন মেয়ে ছিল। জিপসীদের দেশ। ফরাসি ভাষায় দখল ছিল। না বললেই চলে। ধোকা দেবার মতলব থাকলে জিপসীদের ছদ্মবেশে সুবিধে কিন্তু অনেক। স্থানীয় ভাষা না জানালেও কিছু এসে যায় না। পরদেশী হয়েও তারা পরদেশী নয়–কারণ তারা জিপসী। ওদের কেউ-কেউ নাকি ঘোড়ায়-টানা ছাউনি দেওয়া গাড়ি চেপে বিদেয় হয়েছে, যারা পুরো শীতকালটা ঘাঁটি গেড়েছিল বনের মধ্যে, তারাই গোপন বিষয় বানিয়ে যায়নি তো? টপ সিক্রেট কাগজপত্র ছিনিয়ে এনে ফের এই গোপন ঘাঁটিতেই ঘাপটি মেরেছে হয়ত ওদেই সাঙ্গ-পাঙ্গ। ঝোঁপ বুঝে কোপ মারার পক্ষে অভিনব ষড়যন্ত্র সন্দেহ নেই।
কে জানে হয়ত সবটাই বন্ডের উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা, চমকপ্রদ ফ্যানটাসি রচনা। অন্তত এই ধারণা বন্ডের ছিল সে দিন পর্যন্ত, কিন্তু যখনি গাছের গোড়ায় দেখেছে রহস্যজনক আঁচড়চিহ্ন, তখনি ফ্যানটাসি হয়েছে ফ্যাক্ট, সন্দেহ গেড়েছে যুক্তির শেকড়।
দু দুটো গাছের গুঁড়ির আঁচড়চিহ্ন অভ্যস্ত যত্ন সহকারে কাদামাটি দিয়ে লেপা। সব কটা চিহ্নই রয়েছে একটা বিশেষ উচ্চতায়-যে উচ্চতায় ঠেলে নিয়ে যাওয়া যে কোন ধরনের সাইকেল প্যাডেলের ঘষা লেগেই গাছের ছালে এ আঁচড় লাগা সম্ভব।
হয়ত সমস্তটাই অসম্ভব কপোল-কল্পনা। কিন্তু অত্যন্ত ক্ষীণ এই সূত্রটাই জেমস বন্ডের পক্ষে যথেষ্ট। একটা সমস্যা তবুও খচ খচ করতে থাকে মনে। আবার হানা দেওয়ার সাহস কি হবে বিবরবাসীদের? হয়ত একবারই তারা ছোঁ মেরেছে বাজপাখির মত আর ফিরবে না।
আর যদি তারা দুরন্ত দুঃসাহসী হয়? নিজেদের নিরাপত্তার ওপর প্রচণ্ড আস্থা থাকে? তবে আবার বেরিয়ে আসবে গোপন কন্দর ছেড়ে।
অনুমতিটা স্টেশন এফ ছাড়া আর কারো কাছে বলেনি বন্ড। মেরী অ্যান রাসেল সব শুনে হুঁশিয়ার থাকতে বলেছেন বন্ডকে এফ এর কর্তা বাজে কথার মানুষ নন। তিনি সেন্ট জার্মেনে তাঁর ঘাঁটিতে হুকুম পাঠিয়েছেন বন্ডকে যেন সবরকম সাহায্য করা হয়। কর্নেল স্ক্রাইবারকে বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে বন্ড সেন্ট জার্মেনের গোপন ঘাঁটির ক্যাম্পে ডেরা নিয়েছে। ঘাঁটিটা একটা বেনামী গাঁয়ের পেছনের রাস্তায় বেনামী বাড়িতে। ক্যামোফ্লেজের ছদ্মবেশ এই ঘাঁটি থেকেই পাওয়া গিয়েছে। সেই সঙ্গে চারজন সিক্রেট সার্ভিসের জোয়ান। বন্ডের হুকুম পেলেই তারা আনন্দে আটখানা হয়ে হাত চালাবে। সবারই মনে হচ্ছে বন্ড যদি রহস্যের কিনারা করে শেপ ইনটেলিজেন্সকে উচিত শিক্ষা দেয়, তবেই সিক্রেট সার্ভিসের স্বাধীনতা অব্যাহত থাকবে। M-এর অনেকদিনের দুশ্চিন্তাও যাবে। দর্পচূর্ণ হবে শেপ এর, গৌরব বাড়াবে সিক্রেট সার্ভিসের।
