শেপ সিকিউরিটিতে দু-দুটো দিন নষ্ট হয়েছে। লাভ কিছুই হয়নি। নতুন কোন তথ্য আবিষ্কার করতে পারেনি সে, বরং দুর্নাম কুড়িয়েছে বিস্তর। এক প্রশ্ন বারবার জিজ্ঞেস করার ফলে। যে তদন্ত একবার হয়ে গেছে, ফের তার ওপর নতুন জেরা শুরু করার ফলে অপ্রিয় হতে হয়েছে। তৃতীয় দিন সকালে সরে পড়বার মতলব আঁটছিল বন্ড, ভাবছিল যাওয়ার আগে কর্নেলকে একটা টেলিফোন করা যাক, এমন সময় কর্নেল নিজেই টেলিফোন করলেন–কম্যান্ডার, ভাবলাম খবরটা আপনাকে দেওয়া দরকার। কাল শেষরাতের দিকে পুলিশ কুকুরের শেষ দলটাও ফিরে এসেছে। গোটা জঙ্গলটাকে তন্ন তন্ন করেছে। রহস্যের কিনারা করা যাবে বলে আপনি যে থিওরী পেশ করেছিলেন তারও ইতি হল সেই সঙ্গে। দুঃখিত স্বরটা কিন্তু মোটেই দুঃখিত ঠেকল না বন্ডের কাছে কিছুই পাওয়া যায়নি? কিসসু না।
মিছেই সময় নষ্ট করলাম। কর্নেলের মেজাজ খিঁচড়ে দেওয়ার জন্য ইচ্ছে করেই বাঁকা সুরে বন্ড বলল, পুলিশ কুকুরের ডিউটি অফিসারকে পেলে দুটো কথা জিজ্ঞেস করতাম।
নিশ্চয়, নিশ্চয়, আপনার সব ইচ্ছাই পূর্ণ হবে। ভাল কথা, কম্যান্ডার, এখানে আর কদিন থাকার প্রোগ্রাম আছে। আপনার জানতে পারলে ভাল হয়। আরও কিছুদিন আপনার সঙ্গ পেলে খুশি হতাম। কিন্তু সমস্যা আছে আপনার। ঘরটা নিয়ে। হল্যান্ড থেকে নাকি একটা বড় পার্টি আসছে দিন কয়েকের মধ্যেই। টপ লেভেল অফিসার। শুনলাম, আপনার ওখানে জায়গার বড় অভাব।
কর্নেলের সঙ্গে ঘরকন্না যে মোটেই জমবে না বন্ড তা আঁচ করেছিল আগেই। তাই কথাটা শুনে টেলিফোনেই অমায়িক হাসি হেসে বলল, তা বেশ, তা বেশ। আমি বরং আমার চীফকে একবার ফোন করে দিই। উনি কি বলেন শুনে আপনাকে ফোন করছি।
দয়া করে তাই করুন। একই রকম অমায়িক সুরে জবাব দিলেন কর্নেল, এবং একই সঙ্গে সশব্দে রিসিভার নামল দু জনের।
চীপ ডিউটি অফিসার জাতে ফরাসি। ধূর্ত চোখ। কুকুরের আস্তানায় গিয়ে দেখা করল বন্ড। কিন্তু লোকটির বেশি খাতির দেখা গেল অ্যালসেসিয়ানদের সঙ্গে মধুর সঙ্গ ছেড়ে নড়তেই চায় না। ঘেউ ঘেউ আওয়াজে কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে দেখে বন্ড তাকে নিয়ে এল ডিউনি রুমে। ছোট ঘর, হুক থেকে ঝুলছে দূরবীন, ওয়াটার প্রুফ, গামবুট, কুকুর খেদানোর খোঁচা, এবং আরো কত কি টুকিটাকি জিনিস। টেবিলে বিছানো সেন্ট জার্মেন জঙ্গলের একটা বড় সড় ম্যাপ। পেন্সিল দিয়ে চৌকোনা খুপরিতে দাগানো ম্যাপটা দেখিয়ে বলল ডিউটি অফিসার– প্রতি বর্গ ইঞ্চি জায়গা খুঁজে এসেছে আমাদের অ্যালসেসিয়ান দল। কিছু খুঁজে পাওয়া যায়নি।
আপনি কি বলতে চান কোথাও এদের চেন টেনেও ধরা হয়নি?
মাথা চুলকে বলল ডিউটি অফিসার–না, তা অবশ্য বলতে চাই নাই। দু একটা খরগোশ নিয়ে দাপাদাপি শুরু করেছিল হতভাগারা। একবার একজোড়া শেয়ালও দেখেছিল। মৃগয়া খেলা হয়েছিল বলতে পারেন সিয়ে। চেন টেনে সরিয়ে নিয়ে যেতে বিলক্ষণ বেগ পেতে হয়েছিল আমাদের। খুব সম্ভব জিপসীদের গন্ধও পেয়েছিল কুকুরগুলো।
ও! খুব উৎসাহ দেখাল না বন্ড, জিপসীদের কোথায় দেখেছিলেন? ম্যাপের ওপর দেখান।
আঙুল দিয়ে জায়গাটা দেখাল ডিউটি অফিসার, নামধামগুলো নেহাতই সেকেলে। এই হল ইটয়েল পারফেট। খুন যেখানে হয়েছে। এই দেখুন, সেই জায়গা ক্যারিফোর দ্য কুরী। এই যে এখানে ত্রিভুজের তলায় ক্যারিফোর রয়্যাল। যে রাস্তায় খুন হয়েছে। তাকে আড়াআড়িভাবে ক্রশ করেছে এই ক্যারিফোর রয়্যাল। পকেট থেকে একটা পেন্সিল বের করে ক্রশ চিহ্নের ঠিক মাঝখানে একটা ফুটকি দিয়ে বলল, মঁসিয়ে, এই হল ফাঁকা জায়গাটা। পুরো শীতকালটা একটা জিপসীদল আড্ডা গেড়েছিল এখানে। ওরা গেছে গত মাসে। জায়গাটা পরিষ্কার হয়েছে বটে, কিন্তু জিপসী কুকুরের গন্ধ এখনও মাস কয়েক থাকবে।
কুকুরগুলোকে বন্ড দেখল। সবাই যেন নেকড়ের বাচ্চা। তারপর ডিউটি অফিসারকে ধন্যবাদ দিয়ে টুকটাক কয়েকটা জিনিস নিয়ে নিজের গাড়িতে গেল।
ঝড়ের বেগে সেন্ট জার্মেন বনরক্ষক অফিসে পৌঁছতে দেরি হল না। ওরা বললে, জিপসীরা সত্যিই ছিল ওখানে। খাঁটি রোমান চেহারা। ফ্রেঞ্চ বলতে পারত না। দু একটা ভাঙা ভাঙা শব্দ ছাড়া। চালচলন ভালই। কারো সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেনি। উৎপাত করেনি। কারো কোন নালিশও নেই। ওদের দলে ছিল দুজন পুরুষ, দুজন মেয়ে। কবে গেছে তা কেউ বলতে পারবে না। কেউ দেখেনি। হঠাৎ একদিন জানা গেল জিসীর দল নেই। সপ্তাহখানেক হল গেছে। জায়গাটা কিন্তু ভালই পছন্দ করেছিল। দিব্বি নিরিবিলি।
কুখ্যাত ডি-৯৮ রাস্তা ধরেই জঙ্গলের মধ্যে গাড়ি হাঁকাল বন্ড। দূর থেকে মোেটর রাস্তার ব্রীজ দেখা যেতেই গতিবৃদ্ধি। করে সিকি মাইল থাকতে ইঞ্জিন বন্ধ করে দিল। নিঃশব্দে গড়িয়ে চলল গাড়ি। গড়াতে গড়াতে গাড়ি এল ক্যারিফোর রয়্যালে। ব্রেক কষল বন্ড। মার্জারের মত শব্দহীন চরণে লাফিয়ে পড়ল রাস্তায়। নির্জন বনভূমির মধ্যে এতখানি হুঁশিয়ারির জন্য নিজেকে একটু বোকা বোকাই মনে হল। তবুও পা টিপে টিপে ঢুকে পড়ে জঙ্গলের মধ্যে। যে ফাঁকা জায়গায় ডেরা নিয়েছিল জিপসীরা, সন্ধানী চোখে উন্মুক্ত সেই অংশটুকুই অন্বেষণ করতে থাকে বন্ড।
বেশি খুঁজতে হয় না। গাছপালার কুড়ি গজ ভেতরেই রয়েছে এক খণ্ড সবুজ তৃণভূমি, কিনারায় দাঁড়িয়ে, ঝোঁপঝাড় আর গাছপালার অন্তরালে থেকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বুলিয়ে নিল গোটা জমিটার ওপর। তারপর অতি সন্তর্পণে, অত্যন্ত হুঁশিয়ার হয়ে পা দিল জমিতে। সতর্ক পদক্ষেপে পেরিয়ে এসে দাঁড়াল এদিকের প্রান্তে।
