কোনটাই হয়নি, কম্যান্ডার, আমার এ হেডকোয়ার্টার নিয়ে আমি নিশ্চিন্ত। কিন্তু বাইরের ঘটনাগুলো নিয়েই যত ভাবনা। আপনাদের সিক্রেট সার্ভিসের স্থানীয় দপ্তর ছাড়াও আমাদের ছাড়া-ছাড়া সংকেত অনেকগুলো রয়েছে। চৌদ্দটা বিভিন্ন জাতির হোম মিনিস্ট্রি তো রয়েছেই। কাজেই কোত্থেকে কি খবর বেরিয়ে যাচ্ছে, সে হিসেব রাখা আমার সাধ্য নয়।
সায় দিল বন্ড, তা তো বটেই। উইং কমান্ডার র্যাটলের সঙ্গে আপনার কথাবার্তার পর নতুন কিছু ঘটেছে?
বুলেটটা পাওয়া গেছে। আমি বুলেট, লাগায় শিরদাঁড়া ভেঙে গেছে। খুব সম্ভব তিরিশ গজ দূর থেকে ছোঁড়া হয়েছে। যদি ধরে নেওয়া যায়, এঁকেবেঁকে না চলে সিধে চলেছিল আমাদের ডেসপ্যাঁচ রাইডার, তাহলে ধরতে হবে মাটির সঙ্গে সমান্তরাল রেখায় ছোঁড়া হয়েছে বুলেটটা। যেহেতু রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফায়ারিং-এর প্রশ্ন উঠছেই না, সুতরাং নিশ্চয়ই কোন গাড়িতে চেপে পিছু নিয়েছিল হত্যাকারী।
সেক্ষেত্রে ড্রাইভিং আয়নায় তাকে নিশ্চয় দেখতে পেয়েছে আপনার লোক?
খুব সম্ভব দেখেছিল।
কেউ পিছু পিছু আসছে জানতে পারলে, চোখে ধুলো দেবার জন্য বিশেষ কোন নির্দেশ কি আপনার লোকজনদের দেওয়া হয়?
হয় বৈকি। মৃদু হেসে কর্নেল বললেন। বলা হয় টপ স্পীডে ঝড়ের মতো হাওয়া হয়ে যেতে।
আপনার লোকটি কত স্পীডে আছাড় খেয়েছে।
খুব বেশি নয়, বিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে। কি বলতে চান বলুন তো?
খুনটা পাকা হাতের কি শৌখিন হাতের, এ বিষয়ে আপনারা মনস্থির করতে পেরেছেন কিনা জানি না। কিন্তু আমি পেরেছি। ধরে নিচ্ছি আয়নার বুকে পেছনের আততায়ীকে আপনার লোক দেখেছিল এবং দেখবার পরেও স্পীড বাড়িয়ে পালাবার চেষ্টা করেনি। সুতরাং আমরা অনায়াসে বলতে পারি, পেছনের লোকটাকে সে শত্রু হিসেবে দেখেনি, দেখেছে। বন্ধু হিসেবে। তা থেকে আমরা কি পাচ্ছি আততায়ী এমন একটা লোক ছদ্মবেশ নিয়েছিল, যা ঐ পরিবেশে এমন কি অত সকালেও, অত্যন্ত স্বাভাবিক বলে মনে হয়েছে আপনার লোকের কাছে।
কর্নেল ঈষৎ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে, কম্যান্ডার, আপনি যে পয়েন্টটা বললেন, এ নিয়েও আমরা ভেবেছি। গতকাল দুপুরে কম্যান্ডিং জেনারেল জরুরী নির্দেশ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সিকিউরিটি কমিটি তৈরি হয়ে গেছে। সেই মুহূর্ত থেকে কোন সম্ভাবনাই বিবেচনা করতে বাকি রাখিনি আমরা কমান্ডার। কেসটা সম্বন্ধে আমরা যা ভেবেছি তাছাড়াও মৌলিক কোন পয়েন্ট যদি কারো মাথায় এসে থাকে, মগজের গ্রে ম্যাটারের দিক দিয়ে তিনি আইনস্টাইনের সমতুল্য। নতুন করে ভাববার, নতুন করে আলোচনা করবার মত কোন বিষয়ই আর নেই এই কেসে।
এবার সহানুভূতির হাসি হেসে বন্ড বলল, সেক্ষেত্রে আজ রাতে আপনার আর সময় নষ্ট করতে চাই না। আপনাদের আলোচনার পুরো রেকর্ডগুলো যদি দেখতে দেন তো কেসটা সম্বন্ধে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল হতে পারি। দয়া করে আপনাদের ক্যান্টিন আর গেস্ট কোয়ার্টার দেখিয়ে দিতে বলবেন কাউকে?
নিশ্চয়, নিশ্চয়। ঘন্টা টিপে ধরলেন কর্নেল। কদম ছাঁট এক ছোকরা প্রবেশ করতেই বললেন, প্রক্টর, কম্যান্ডারকে ভি.আই.পি কোয়ার্টারে নিয়ে যাও। ঘর দেখিয়ে বার আর ক্যান্টিনে নিয়ে যেও। তারপর বন্ডের দিকে ফিরে খেয়ে দেয়ে চাঙ্গা হয়ে নিন। কাগজপত্র বার করে রাখছি। এ অফিসেই পাবেন। অফিসের বাইরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। তাহলেও আপনার যা দরকার প্রক্টরকে বলবেন, ও এনে দেবে। হাত বাড়িয়ে–ঠিক আছে কাল সকালে আবার দেখা হবে।
গুড নাইট জানিয়ে ছোকরার পেছন পেছন বন্ড বেরিয়ে এল। সুদীর্ঘ করিডর বরাবর হাঁটতে হাঁটতে মনটা আবার দমে গেল। জীবনে অনেক বিপজ্জনক কাজের ঝাঁকি সে নিয়েছে কিন্তু এরকম অসহায় সে বোধ করেনি। আশার এতটুকু রশ্মি কোথাও নেই। চৌদ্দটা দেশের জাদরেল সিকিউরিটি ব্রেনরা যেখানে নাজেহাল হয়ে গেছে। সেখানে তার মত ক্ষুদ্র ব্যক্তির এই হঠকারিতা চরম নির্বুদ্ধিতার পরিচয়। ভি.আই.পি. কোয়ার্টারের স্পার্টান বিলাসিতা আর মোগলাই স্বাচ্ছন্দে শয়ন করে বন্ড সে রাত্রে মনে মনে হিসেব করল, আরো দিন দুয়েক কেসটা নিয়ে সে মাথা ঘামাবে। মেরী অ্যান রাসেলের সঙ্গসুখ উপভোগ করবে। তারপর শুটোবে পাততাড়ি।
দুদিন নয়,চারদিন পর যখন ভোরের আলো ফুটল সেন্ট জার্মেন জঙ্গলের মাথায়, দেখা গেল একটা মস্ত ওক গাছের ইয়া মোটা শাখায় শুয়ে আছে জেমস বন্ড। নজর রয়েছে বনতলের এক টুকরো স্ব-তুন সবুজ ভূমিখন্ডের ওপর। বনভূমির চারদিকেই ঘন জঙ্গল। একপাশে ডি ৯৮ সড়ক যে সড়কে কদিন আগেই একটা মানুষ খুন হয়েছে।
বন্ডের আপাদমস্তক বিচিত্র পোশাকে আচ্ছাদিত। ছত্রীবাহিনীর সাহসী সৈনিকরা শত্রু অঞ্চলে নামবার আগে এ ধরনের পোশাক পরে নেয় সারা অঙ্গে সবুজ, বাদামী আর কালোর ছোপ আর ডোরা গাছের পাতার সঙ্গে মিশে থেকে শত্রুর শ্যেন দৃষ্টিকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখানোর অপকৌশল। দু-হাতও ঢাকা এই একই রঙের পোশাকে। মাথার ওপর একটা হুড। চোখ আর মুখের জন্য শুধু দুটো ফুটো সেই মুখোশে। শত্রুকে ধাপ্পা দেওয়ার পক্ষে অভিনব ক্যামোফ্লেজ সন্দেহ নেই। সূর্য উঠলে এ ধাপ্পা আরো নিখুঁত হয়ে ওঠে। তখন আরো গাঢ় হয়ে ওঠে এ ছায়া এবং গাছের ঠিক নিচে দাঁড়ালে গাছের ওপরে ঘাপটি মেরে থাকা উর্দিপরা মানুষটিকে কেউ দেখতে পায় না।
