রাসেল। ফোকেতে নতুন মনে হল।
মাস ছয়েকের পুরানো। কাজ ভালই করছে। যাক, আগে কাজের কথা। বলে ইন্টারকমের সুইচ টিপে হুকুম দিলেন, লন্ডন হেডকোয়ার্টারে M-কে খবর পাঠাও জিরো জিরো সেভেনকে পাওয়া গেছে। কাজ বোঝানো হচ্ছে। বন্ধ করল সুইচ।
তাম্রকূটের ধোঁয়াশা থেকে সরে গিয়ে জানালার সামনে বন্ড দাঁড়াল। আধ ঘণ্টা আগেও একঘেয়েমি লাগছিল প্যারিসকে। এখন আর লাগছে না।
হেড অফ এফ বললেন, গতকাল সকালে একটা খুন হয়েছে। সেন্ট জার্মেন স্টেশনে যাওয়ার সময় পেছন থেকে গুলি খেয়েছে ডেসপ্যাঁচ রাইডার। ডেসপ্যাঁচ কেসে অনেক গোপনীয় দলিল ছিল। খোয়া গেছে সেই কেস, ঘড়ি আর মানিব্যাগ।
বন্ড বলল, কি মনে হয় আপনার, মামুলী রাহাজানি না, ঘড়ি আর মানিব্যাগ নেওয়া হয়েছে শুধু চোখে ধুলো দেবার জন্য?
বলা মুশকিল। সিকিউরিটি এখনো ভাবছে। সকাল সাতটা নাকি রাহাজানির সময় নয়। যাক, আপনি গিয়ে কথা। বলুন। আপনি যাচ্ছেন M-এর ব্যক্তিগত প্রতিনিধি হিসেবে। খুব ভাবনায় পড়েছেন ভদ্রলোক। বলে একটা ম্যাপ বিছিয়ে ধরলেন এফ এর বড়কর্তা। এই হল ভাসাই। পার্কের উত্তরে এই যে চার মাথা-এখানে কাটাকুটি হয়েছে দুটি রাস্তার–প্যারিস মন্তেজ আর ভার্সাই মোটর রাস্তা। আরো শ খানেক গজ উত্তরে যান। ন্যাটো গোষ্ঠীর শাখা শেপ এর ঘাটি। প্রতি বুধবার সকাল সাতটায় শেপ -এর ঘাঁটি থেকে বেরোয় একজন একজন স্পেশাল সার্ভিস ডেসপ্যাঁচ রাইডার। সঙ্গে থাকে সাপ্তাহিক গোপন বার্তা। সেন্ট জার্মেন-এর বাইরে যে ছোট্ট গা-টা দেখছেন, এইখানে আমাদের হেড কোয়ার্টারে কাগজপত্র তুলে দিয়ে সাড়ে সাতটার সময়ে ওকে আবার ফিরে যেতে হয় শেপ সদর দপ্তরে। সাবধানের মার নেই, তাই সোজা রাস্তায় না গিয়ে ওর ওপর অর্ডার আছে এন ৩০৭ রাস্তা ধরে সেন্ট জার্মেন-এর জঙ্গল পেরিয়ে ঘাঁটিতে পৌঁছানোর। দূরত্ব প্রায় বারো কিলোমিটার। মোটর সাইকেলে যেতে সময় লাগে খুব জোর পনেরো মিনিট। গতকাল সকালে কোর অব সিগন্যালের করপোর্যাল বেস গিয়েছিল ডেসপ্যাঁচ কেস নিয়ে। মজবুত মানুষ। কিন্তু সাতটা পঁয়তাল্লিশেও না ফিরে আসায় পাঠানো হল আরেকজনকে। সে গিয়ে দেখল, বেটস্ রাস্তাতে নেই, ঘাঁটিতেও পৌঁছায়নি। সোয়া আটটায় সিকিউরিটি ব্রাঞ্চ গা-ঝাড়া দিল। নটায় রাস্তা বন্ধ হল। পুলিশ আর সার্চ পার্টি তন্নতন্ন করে খুঁজল সারাদিন। সন্ধ্যে ছটা নাগাদ পুলিশ কুকুর পেল বেটস্-এর লাশ। ততক্ষণে রাস্তায় সূত্র মুছে গেছে গাড়ি ঘোড়ার যাতায়াতে। বলতে বলতে ম্যাপটা মুড়ে বন্ডের হাতে তুলে দিলেন এফ-কর্তা। বিমান ঘাটি, জাহাজঘাটা, সীমান্ত, সব জায়গাতেই পাহারা বসেছে। কিন্তু এ কাজ যদি পাকা হাতের হয়, তাহলে গোপন দলিলের বান্ডিল দুপুরের আগেই দেশছাড়া হয়েছে, অথবা ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই প্যারিসের কোন দূতাবাসে ঠাই পেয়েছে।
অসহিষ্ণু কণ্ঠে বন্ড বলল, তা তো বটেই। কাজেই আমি গিয়ে কি করব? খামোকা সময় নষ্ট। এ কাজ আমার নয়। M কি ভেবেছেন?
সহানুভূতির হাসিতে, সত্যি বলতে কি একই কথা আমিও M-কে বলেছিলাম। উনি বললেন, জেমস্ বন্ডের চোখে অদৃশ্য সূত্রও ধরা পড়ে। সব কটা ঘাটির কড়া পাহারার মধ্যেও এখন এ কাণ্ড ঘটে গেল, তাহলে বুঝতে হবে, এমন একজন ছদ্মবেশী শত্রু সেখানে রয়েছে যাকে কেউই লক্ষ্য করছে না। সে হতে পারে মালী, কি পিওন, কি আদালী। ওকে যখন হাতের কাছে পাওয়া যাচ্ছে, তখন সে যাক। আমি বলেছিলাম, সব রকম অদৃশ্য সূত্রের কথাই। শেপ ভেবেছে। উনি বললেন, পুঁথিগত বিদ্যের দৌড় ওঁর জানা আছে। বলেই লাইন কেটে দিলেন।
বন্ড হেসে বলল, দেখি তাহলে কি করা যায়। রিপোর্ট দেব কাকে?
রাসেলকে। চব্বিশ ঘণ্টাই ওকে পাওয়া যাবে। তাছাড়া আপনাকে তো রাসেলই খুঁজে এনেছে। আপনার ধাতও বুঝে ফেলেছে নিশ্চয়। চলবে?
চলবে।
মোটর রাস্তায় গিয়ে ঘণ্টায় সত্তর মাইল বেগে গাড়ি হাঁকাল বন্ড। যথাসময়ে শেপ -এর হেডকোয়ার্টারে পৌঁছে ব্রেক কষলো প্রথম চেক পয়েন্টে। এগিয়ে এল একজন আমেরিকান পুলিশম্যান। পরনে ধূসর ইউনিফর্ম। বন্ডের পাশ পরীক্ষা করে ছেড়ে ছিল। তার পরেই পাশ পরীক্ষা করল এক ফরাসি পুলিশম্যান। বোর্ডে ক্লিপ দিয়ে আঁটা ফর্মে লিখে নিল খুঁটিনাটি। প্লাস্টিক উইন্ড স্ক্রীনে নাম্বার লাগিয়ে ওকে ঢুকতে দিল ভেতরে।
কার পার্কে গাড়ি দাঁড় করাচ্ছেন বন্ড। এমন সময় নাটকীয়ভাবে ভোজবাজির মত দপ করে জ্বলে উঠল সারি সারি। আর্ক ল্যাম্প। বন্ডের সামনের রাস্তা নিমেষে যেন দিন হয়ে গেল। নুড়ি বিছানো পথ মাড়িয়ে এক লাফে সিঁড়ির চারটে ধাপ পেরিয়ে চওড়া দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ল ইউরোপের সম্মিলিত বাহিনীর সুপ্রীম হেডকোয়ার্টারে। এবার পাশ পরীক্ষা করল আমেরিকান ও ফরাসি মিলিটারি পুলিশ। লাল টুপি পরা একজন বৃটিশ পুলিশ ওকে নিয়ে গেল সুদীর্ঘ করিডর দিয়ে। দু পাশে সারি সারি অফিসের দরজা।
একটা দরজায় লেখা কর্নেল জি. এ. স্ক্রাইবার। চীফ অব সিকিউরিটি, হেডকোয়াটার্স কম্যান্ড। ভদ্রলোক মাঝবয়েসী। বাঁশের মত শক্ত মজবুত সিধে চেহারা, জাতে আমেরিকান। পাক ধরেছে চুলে। কথাবার্তা হাবভাব বিনয় বিগলিত, যেন ব্যাংক ম্যানেজারিতে পোক্ত মানুষটি। রূপোর ফ্রেমে বাঁধানো কয়েকটা ফ্যামিলি ফটোগ্রাফ বসানো টেবিলে। ফুলদানিতে সাদা গোলাপ। ঘরে তাম্রকূটের গন্ধ একেবারেই নেই। নিরাপত্তার চুলচেরা ব্যবস্থার তারিফ করল বন্ড। কর্নেলকে অভিনন্দন জানিয়ে বলল, বারে বারে এই যে চেকিং, এর ফলে পঞ্চম বাহিনী এখানে নাক গলাতে সাহস পাবে না। এর আগে এরকম ঘটনা কখনো ঘটেছে। মানে, কেউ চড়াও হয়েছিল কি? দলিল-টলিল খোয়া গেছে।
