একটা থেতোমেতো মিশমিশে কালো গাড়ি রাশিরাশি গাড়ির স্রোত থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসে পার্ক করল ধার ঘেঁষে। সঙ্গে সঙ্গে যা হয়। ব্রেকের আর্তনাদ, হর্নের কানফাটা কান্না আর পথচারীদের চিৎকারে সৃষ্টি হল মহাসোরগোলের। কোন কিছুতেই কর্ণপাত না করে টুক করে নামল একটা মেয়ে, ভিড়ের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে এল হনহন করে।
উঠে বসল বন্ড। কল্পনায় যা-যা ভেবেছিল, মেয়েটির মধ্যে সেইগুলো বাদ দিয়ে আর সবই আছে। মাথায় বেশ লম্বা চুল। রেনকোটে তন্বীদেহ ঢাকা থাকলেও চলার ভঙ্গিমা থেকে বেশ বোঝা গেল সৌন্দর্য সে অঙ্গের সর্বত্র। চোখে মুখে খুশি যেন উপচে পড়ছে। সেই সঙ্গে মিশে আছে ডানপিটে ডানপিটে ভাব। গাড়ি চালানোর বেপরোয়া ধরন দেখেই অবশ্য তা অনুমান করা যায়। ভিড়ের ধাক্কায় মুখটা ঈষৎ ব্যাজার, দুই ঠোঁট দৃঢ়সংবদ্ধ।
মেয়েটি আসছে এদিকেই, কিন্তু বন্ডের টেবিলে নয় নিশ্চয়। হয়ত অন্য কারো সঙ্গে সাক্ষাতের মতলব নিয়েই আসছে। দেরি হয়ে গেছে, তাই এত অসহিষ্ণু ভাব। ভালবাসার পাত্রকে দেখতে আসে যারা, এ মেয়ে যেন তাদেরই অন্যতম। এ জাতের মেয়েরা একলা কখনো থাকে না। কপাল খারাপ বন্ডের। মখমলের চুলের নিচেই ঝিলমিল করছে। সোনা-সোনা চুল–আহা রে!
মেয়েটা সোজা তাকিয়েছে বন্ডের দিকে। হাসছে…।
বন্ড সামলে ওঠার আগেই টেবিলের সামনে এসে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়ল রূপসী। বন্ডের চমকিত চোখের পানে তাকিয়ে হাসল। বলল, দেরি হওয়ার জন্য কিছু মনে করবেন না। বেরোতে হবে এখুনি। অফিসে চলুন। ক্র্যাশ ডাইভ। শেষ শব্দ দুটো প্রায় ফিসফিস করেই বলল সুন্দরী।
কল্পলোক থেকে এক ঝটকায় বস্তুলোকে ফিরে এল বন্ড। এ মেয়ে লাইনের মেয়ে। ক্র্যাশ ডাইভ শব্দ দুটো একটা সংকেত, সিক্রেট সার্ভিস ধার করেছে সাবমেরিন সার্ভিস থেকে। এ সংকেতের অর্থ হল–সংবাদ মোটেই শুভ নয়। খুবই খারাপ।
পকেটে থেকে কিছু রেজগি বের করে টেবিলে ছুঁড়ে দিল বন্ড। বলল, বেশ তো, চলুন। সঙ্গে সঙ্গে উঠল দুজনে। এ-টেবিল ও-টেবিল কাটিয়ে পৌঁছল ফুটপাতে। মেয়েটির গাড়ি তখনো ট্রাফিক অবরোধ করে দাঁড় করানো। পুলিশ এখুনি এল বলে। টুক করে স্টিয়ারিং-এর সামনে বসল সুন্দরী। ইঞ্জিন চালুই ছিল। সেকেন্ড গীয়ারে দিতেই পিছলে এগিয়ে গেল গাড়ির স্রোতের সঙ্গে।
আড়চোখে দেখল বন্ড। ফ্যাকাশে চামড়া মখমলের মতই পেলব। চুল তো নয় যেন সোনালি রেশম। গোড়া পর্যন্ত সোনালি। বলল, আসছেন কোত্থেকে? এত তাড়াহুড়োই-বা কেন?
সামনে চোখ রেখে বলল সুন্দরী, আসছি স্টেশন থেকে। গ্রেড টু অ্যাসিস্ট্যান্ট আমি। নাম, মেরী অ্যান রাসেল। ডিউটিতে থাকলে আমার নাম সেভেন সিক্সটি ফাইভ। এত তাড়াহুড়ো কেন, তা জানি না। হেডকোয়ার্টার থেকে এম. এ-র পাঠানো সিগন্যালটা শুধু দেখেছি। খুবই জরুরী। এখনি খুঁজে বের করতে হবে আপনাকে। বড়কর্তা বললেন, প্যারিসে এলেই আপনি বাঁধা-ধরা কয়েকটা জায়গায় নাকি যাতায়াত করেন। ঠিকানার ফিরিস্তিটা ধরিয়ে দিলেন আমাকে আর একটি মেয়েকে। বলে হাসল রূপসী। আমি সিধে এলাম হ্যারিজ বারে। ফোকেতে না পেলে অন্য রেস্তোরাঁয় যেতাম।
বন্ড বলল, ফাইন! আমার সঙ্গে মেয়ে বান্ধবী থাকলে কি করতেন, শুনি?
হেসে ফেলল রূপসী, তাকে আমার গাড়িতে তুলতাম। আপনাকে ওঠাতাম ট্যাক্সিতে।
বুদ্ধির জাহাজ দেখছি। সার্ভিসে আছেন কদ্দিন
পাঁচ বছর। স্টেশনের সঙ্গে যোগাযোগ এই প্রথম।
কাজকর্ম কি রকম লাগছে।
ভালই। ছুটির দিন আর সন্ধ্যেগুলো যেন কাটতেই চায় না। প্যারিসে বন্ধু জোটানো সহজ, বলে মুখভঙ্গি করল সুন্দরী। কিন্তু কিছুই চায় না। এমন বন্ধু পাওয়া দুষ্কর। বাসে চড়াও ঝামেলা। পেছন থেকে চিমটি কেটে কেটে কালসিটেই করে দ্যায়। তাই বাসে চড়া ত্যাগ করলাম। কিনলাম এমন একটা বদখত গাড়ি যার ধারে-কাছে কেউ গাড়ি ভেড়াতে চায় না। তফাতে থাকে সব সময়ে।
কথাটা যে কতখানি সত্যি তা প্রমাণ করার জন্যই যেন রঙ পয়েন্টে এসে সহসা বেলাইনে গাড়ি হাকাল সুন্দরী। সঙ্গে-সঙ্গে দু ভাগ হয়ে গেল গাড়ির স্রোত, পথ ছেড়ে দিল ওর ভাঙাচোরা ত্যাবড়ানো গাড়িকে। গাড়ি ঢুকল এভি ম্যাটিগসনে।
বন্ড বলল, বাঃ, কিন্তু এ কায়দা সব সময়ে খাটাতে যাবে না।
ডিউটিতে থাকলেই খাটাতে হয়, নইলে নয়। বলতে বলতে গাড়ি এসে দাঁড়াল ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিসের স্টেশন এফ, অর্থাৎ ফরাসি শাখার প্যারিস সদর দপ্তরের সামনে।
বন্ড নামল। বলল, কাজ মিটলে আপনার দর্শনলাভ ঘটবে তো? ভয় নেই, চিমটি আমি কাটি না। তবে আপনার মতই বড় একঘেয়ে লাগছে প্যারিসকে।
মীল নীল রূপসী চক্ষু ঈষৎ বিস্ফারিত হল, সানন্দে।
খিলেন পেরিয়ে হেডকোয়ার্টারে প্রবেশ করল বন্ড। এ স্টেশনের হেড, মানে, উইং কম্যান্ডারে র্যাটরে মানুষটি একটু স্থূলকায়। গোলাপী গাল, সাদা সাদা চুল ব্যাকব্রাশ করা পেছনে। একটু শৌখিন পোশাকে অভ্যস্ত। চেহারায়, চালচলনে মনেই হতে পারে ভালমন্দ আর সুখাদ্য নিয়েই বুঝি তার জগৎ। কিন্তু নীলচে আর ধূর্ত চোখ দুটিই ধরিয়ে দেয় বাইরের ছলনাটুকু। দারুণ ধূমপানের অভ্যাস ভদ্রলোকের। অফিস ঘরে টেকা দায় তাম্রকূটের উৎকট গন্ধে। বন্ডকে দেখতেই যেন হাঁপ ছাড়লেন। বললেন, কে পাকড়াও করল?
