খুশি হয়ে হ্যাঁচকা ঠেলা মেরে রোট থেকে মোটর সাইকেল নামাল লোকটা। স্মার্ট জকির মতই টুক করে উঠে বসল সিটে এবং সবেগে পদাঘাত করল স্টার্টারের ওপর। খুব আস্তে আস্তে, স্কিড চিহ্ন যাতে না পড়ে, এমনিভাবে গাড়ির গতিবেগ বৃদ্ধি করতে লাগল রহস্যময় চালক এবং অচিরেই আবার দেখা গেল সিধে সড়ক বেয়ে ঘণ্টায় সত্তর মাইল বেগে ফিরে চলেছে একজন ডেসপ্যাঁচ রাইডার। হাওয়ার ঝাঁপটায় আবার প্রকট হয়ে উঠেছে তার দস্ট্রা, যেন হাসছে দাঁত খিঁচিয়ে।
হত্যাস্থলের চারদিকে এতক্ষণ যেন শ্বাসরোধ করে দাঁড়িয়েছিল অরণ্যভূমি। এবার ধীরে ধীরে, আবার বইতে লাগল শ্বাস-প্রশ্বাস, স্পন্দিত হল অরণ্যবক্ষ।
সে রাতে জেমস্ বন্ডের মদ্যপান শুরু হয়েছিল ফোকে-তে। নেশা করার মত কিছু নয়। ফ্রেঞ্চ কাফেতে সিরিয়াসলি মদ খাওয়া খুবই মুশকিল। ফুটপাতের রোদে বসে তো আর ভদ্কা-হুঁইস্কি-জিন গেলা যায় না। লাঞ্চের ঠিক আগেই গলা ভিজিয়ে নেওয়ার শ্যাম্পেনও আছে কিন্তু রাত হলেই আবার চড়াতে ইচ্ছা যায় একটা-পর-একটা কোয়ার্ট। এত শ্যাম্পেন খাওয়ার পরিণাম টের পাওয়া যায় রাত গম্ভীর হলে। পার্নড মন্দ নয়, কিন্তু দল বেঁধে না খেলে মেজাজ হয় না। বন্ডের আবার যুৎসই লাগে না। এসব কারণেই বন্ড পছন্দ করে এমন মদ যা কাফেতে বসে পান করা যায়। যাতে নেশা কম হয়। কিন্তু গান-বাজনার সঙ্গে জমে। বিটার কাম্পারি, সিনজানোতে এক চাকলা পাতিলেবু আর সোড়া মিশিয়ে খাওয়ার মেজাজই আলাদা। বন্ডের পছন্দ পেরিয়ারের সোজ। কেননা, কমজোরী মদকে সবচেয়ে কম দামে জাতে তুলতে হলে দামী সোডা মেশানোই বুদ্ধিমানের কাজ।
প্যারিসে এলে বারবার এক ঠিকানায় আস্তানা নেয় বন্ড। খায় একই জায়গায়। মানে, বেশ কয়েকটা বাধাধরা ঠিকানার মধ্যেই তার প্রোগ্রাম ঠিক হয়ে থাকে। যেমন ওঠা চাই টার্মিনাস নর্ড-এ। কেননা, স্টেশন হোটেল বন্ডের এমনিতেই পছন্দ। তার ওপর এ হোটেলের নাম বিশেষ কেউ জানে না, ভড়ংও কম। খাওয়া চাই কাফে ডিলাপে, রোটান্ডে আর ডোর এতে। এ সব জায়গায় খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাঁচটা লোককে দেখা যায়। খাওয়ার স্বাদও বেশ খানদানী। মদে টং হওয়ার ইচ্ছে হলে আশা চাই হ্যারিজ বারে। এখানকার মদে নেশা তো জমেই, সেই সঙ্গে মনে পড়ে যায় মোল বছর বয়সে প্রথম প্যারিস আসার অভিজ্ঞতা। কন্টিনেন্টাল ডেলী মেল-এ নাগার বিজ্ঞাপন পড়ে অক্ষরে অক্ষরে তাই মেনে চলেছিল বন্ড! ট্যাক্সি ড্রাইভারকে বলেছিল, স্যাঙ্ক রু তো নু। বলার পর থেকেই শুরু ওর জীবনের এক স্মরণীয় রাতের, যার শেষ হয়েছিল যুগপৎ দুটি জিনিস হারিয়ে কৌমার্য আর নোটকেস। ডিনার খেতে হলে বন্ড যায় বড় বড় রেস্তোরাঁয়। যেমন–ভেফোর, ক্যানেটন, লুকাস কাটন, কোচেন ডি অর। ডিনার খেয়ে বন্ড যায় প্লেস পিডাল-এ নিত্য নতুন অভিজ্ঞতার জন্য। অঘটন কিছু না ঘটলে হাঁটতে হাঁটতে প্যারিসের পথ মাড়িয়ে ঘুমোবার জন্য। হোটেলে ফিরে আসে।
আজ রাতে কিন্তু ধূলিধূসরিত ঠিকানাপঞ্জির ধার দিয়েও গেল না বন্ড। এল মান্ধাতা আমলের বল ড্যান্সের আসরে। অস্ট্রোহাঙ্গারিয়ান সীমান্ত অঞ্চলে একটা সমস্যা সমাধানের ভার ছিল বন্ডের ওপর। কিছুই সুরাহা হয়নি। কথা ছিল কয়েকজন হাঙ্গেরিয়ানকে ঘাড় ধরে বের করে দেওয়ার। স্টেশন ফাইভের চাইকে গাইড করার জন্য সরাসরি বন্ডকে পাঠানো হয়েছিল। গোটা অপারেশনের তদারকের ভার ছিল বন্ডের ওপর। ভিয়েনা স্টেশন তাতে চটেছে। ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। একজন মারা গেছে ফ্রন্টিয়ার মাইল অঞ্চলে। পরের দিনই লন্ডন হেডকোয়ার্টারে ফিরে রিপোর্ট দেবার কথা বন্ডের। মন তাই খারাপ। দিনটা সে তুলনায় সত্যিই ভাল। সারা প্যারিস যেন হাসছে। বন্ড তাই ঠিক করেছিল সারা শহরটা একবার ঘুরবে। সঙ্গে এক রূপসীকে নিতে হবে। রূপসীর চোখে টাকার লালসা থাকবেই থাকবে। বন্ড সে পাওনাও মেটাবে পঞ্চাশ হাজার ফ্লা দিয়ে।
রেস্তোরাঁয় বসে মদের অর্ডার দিয়ে এসব কল্পনা করে বন্ড মনে মনে হাসছিল। বন্ড তো জানে প্যারিসে এই তার শেষ লীলাখেলা। মহাযুদ্ধের পর থেকেই প্যারিস তার দু চোখের বিষ। ১৯৪৫-এরপর থেকে প্যারিসে তার একটা দিনও আনন্দে কাটনি। কাটবে কি করে? শহরের সে রূপ, সে আভিজাত্য যেন লুটেপুটে নিয়েছে মোটরের স্রোত। থাবায় ধরে কাড়াকাড়ি করেছে রাশিয়ান আর রুমানিয়ান, বুলগেরিয়ান আর জার্মান। শহরের যা দেখার জিনিস তা যেন চোখেই পড়ে না তাদের দৌরাত্ম্যে।
মার্বেল বাঁধানো টেবিলের ওপর সশব্দে ট্রে নামিয়ে রাখল ওয়েটার। খুলে দিল পেরিয়ারের ছিপি। বরফের টুকরো ভর্তি ছোট্ট বালতিটাও রাখল টেবিলে। বন্ড বরফ তুলে ভাসিয়ে দিল মদের গ্লাসে। তারপর সোডা মিশিয়ে ঠোঁটের কাছে তুলল। এক চুমুক গলা ভিজিয়ে ধরাল সিগারেট। আজ সন্ধ্যেটা মাটি হল দেখা যাচ্ছে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই হয়ত আসবে মেয়েটা। কিন্তু খোলস বাদ দিয়ে দেখতে গেলেই ঠকতে হবে। খুঁটিয়ে দেখলে দেখা যাবে হয়ত বুর্জোয়া ফরাসিদের চামড়া ভিজে-ভিজে, পুরু, লোমকূপের ছেদাও বেশ বড়-বড়। সোনালি চুল মখমল টুপির নিচেই কেবল সোনালি, গোড়ায় হয়ত বাদামী আর পিয়ানোর তারের মত কর্কশ। নিঃশ্বাসে নিশ্চয় ভূত-তাড়ানো রসুনের বিকট গন্ধ; পিপারমেন্ট দিয়েও যা নাকি ঢাকা যায় না। ছিমছাম যে তনু দেখে মনে রঙ আসে, হয়ত তা ভেতরে ভেতরে তার আর রবারের বর্ম দিয়ে মোড়া। হয়ত বন্ডের নোটকেসও চুরি যাবে এ মেয়ের হাতের ম্যাজিকে।
