ছুটে চলেছে আর-একজন রয়্যাল কোর ডেসপ্যাঁচ রাইডার। বয়স কম। চেহারা অনেক ছিপছিপে। মনের আনন্দে বাইক চালাচ্ছে তরুণটি। মিষ্টি সকালের আমেজ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে যেন। গতিবেগ রেখেছে যেন ঘণ্টায় চল্লিশ মাইল। মনে মনে ভাবছে আটটা নাগাদ হেডকোয়ার্টার্সে ফিরে ডিমগুলো খাওয়া যায় কিভাবে। ভাজা করে, না ঘেঁটে নিয়ে?
পাঁচশ গজ, চারশ, তিন, দুই, এক। পেছনদিককার মোটরবাইক-চালক ধ্বসে পড়া তারার মতই প্রচণ্ডবেগে আসতে আসতে সহসা কমিয়ে আনল গতিবেগ…ঘণ্টায় পঞ্চাশ মাইল। দাঁতের ফাঁকে টিপে খুলে ফেলল ডানহাতের দস্তানা এবং খোলা দস্তানাটা গুঁজে রাখল শার্টের বোতামের ফাঁকে। তারপর হাত নামিয়ে ক্লিপ খুলে তুলে নিল রিভলবারটা।
এবার নিশ্চয় সামনের মোটর সাইকেলের ড্রাইভিং আয়নায় ফুটে উঠেছিল পেছনদিককার মোটর সাইকেলের প্রতিবিম্ব। এই সকালে আরেকজন ডেসপ্যাঁচ রাইডার দেখে তরুণ চালকও নিশ্চয় অবাক হয়েছিল। তাই হঠাৎ চট করে মাথা ঘুরিয়ে পেছনে দেখে নিল। এ সময়ে একই পথে দু দুজন ডেসপ্যাঁচ রাইডার আসাটা একটু বিচিত্র সন্দেহ। নেই। মনে মনে ভাবল, হয়ত আমেরিকান বা ফ্রেঞ্চ মিলিটারি পুলিশ। আট জাতির ন্যাটো সংঘ থেকেও হয়ত কেউ আসতে পারে এ সময়ে। কিন্তু তাদের ইউনিফর্ম চিনবার পর যুগপৎ বিস্ময় ও হর্ষ দেখা দিল তরুণের মনে। লোকটা কে তা দেখা দরকার। ডানহাতের বুড়ো আঙ্গুল নেড়ে ইশারায় জানায়, ক্রুশের চিহ্ন তার চোখে পড়েছে। নিজেও গতিবেগ কমিয়ে আনে তিরিশের ঘরে। পেছনের চালক যদিও বয়োজ্যেষ্ঠ, তাহলেও পাশাপাশি হলে গল্প করা যাবেখন। এক চোখ সামনে পথের ওপর রেখে আরেক চোখ দিয়ে কোণাকুণিভাবে দেখে, দর্পণের বুকে দ্রুত আগুয়ান দ্বিতীয় ডেসপ্যাঁচ রাইডারকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। শুধু একটা ছায়ামূর্তি ক্রমেই বড় হয়ে উঠছে আয়নায়। লোকটা কে? মনে মনে ঝালিয়ে নেয় হেডকোয়ার্টার কম্যান্ডের স্পেশাল সার্ভিস ট্রান্সপোর্টেশন ইউনিটে ব্রিটিশ ডেসপ্যাঁচ রাইডারদের নামগুলো। অ্যালবার্ট, সিড, ওয়ালি–ওয়ালি হতে পারে। ঐ রকমই গাঁট্টাগোট্টা চেহারা দেখা যাচ্ছে।
রিভলবারধারী কমিয়ে আনছে গতিবেগ। ব্যবধান মাত্র পঞ্চাশ গজের। হাওয়ায় ধাক্কা ততটা না থাকায়, মুখ এখন অবিকৃত। প্রতিটি মাংসপেশী যেন পাথরে কুঁদে গড়া…কঠোর…নির্মম…মমতাহীন। বন্দুকের নলের মত লক্ষ্যভেদী দুই কালো চোখের মধ্যে এবার দপ করে জ্বলে উঠল লাল ফুলিঙ্গ। চল্লিশ গজ, তিরিশ। ভারি সুন্দর একটা ম্যাগপাই পাখি বনের মধ্যে থেকে হঠাৎ ছুটে এল তরুণ ডেসপ্যাঁচ রাইডারের সামনে। একেবেঁকে গিয়ে ফের ঢুকে পড়ল ঝোঁপের মধ্যে। মাইলপোস্টে দেখা গেল সেন্ট জার্মান আর বেশি দূরে নেই। মাত্র এক কিলোমিটার, তরুণ চালক নিঃশব্দে হাসল। মনে পড়ল সেই প্রবাদ-একটামাত্র ম্যাগপাই দেখা মানে দুঃখের সাগরে হাবুডুবু খাওয়া।
বিশ গজ পেছনে রিভলবারধারী চালক দু হাত তুলে নিল হ্যান্ডেলবারের ওপর থেকে। রিভলবার তুলে নল রাখল বাম বাহুর ওপর এবং ট্রিগার টিপল মাত্র একবার।
তরুণ চালকের দু হাত এক ঝটকায় উঠে এল হ্যান্ডেলবারের ওপর থেকে। দুটো হাতই একযোগে খামচে ধরল পিঠের পেছনে শিরদাঁড়ার মাঝখানটা। টলমল করে উঠল মাতালের মত রাস্তার ওপর দিয়ে আড়াআড়িভাবে ধেয়ে গেল তার মোটর সাইকেল, লাফিয়ে টপকে গেল একটা খানা এবং ঘাড় মুচড়ে আছড়ে পড়ল ঘাস-ফুল ছাওয়া মাঠে। পরক্ষণেই আর্তনাদ করে পেছনের দুরন্ত চাকার ওপর দাঁড়িয়ে উঠল দ্বিচক্রযান এবং ধীরে ধীরে এসে পড়ল মৃত চালকের গায়ে। বেশ কিছুক্ষণ প্রচণ্ড শব্দ, ভয়ানক ঝাঁকুনি এবং তরুণ চালকের পোশাক ও ঘাসফুল দলাইমলাই করার পর আস্তে আস্তে নীরব হয়ে গেল বি.এস.এ.-র তর্জন-গর্জন।
বো করে ঘুরে গেল হত্যাকারী। যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকেই। মোটর সাইকেলের মুখ ঘুরিয়ে দাঁড় করাল। রাস্তার পাশে। এক লাথিতে হুইলবোট নামিয়ে টান মেরে দাঁড় করিয়ে দিল ইস্পাতের যন্ত্রযান। তারপর ধীরপায়ে বুনোফুল মাড়িয়ে আর দীর্ঘচ্ছদ গাছের তলা দিয়ে এসে দাঁড়াল মৃতের পাশে। বসল হাঁটু গেড়ে। টান দিয়ে ওঠাল লাশের চোখের পাতা। নিণ-তারকা–জীবনের কোন আলোই নেই। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এক হ্যাঁচকায় মৃতের পিঠ থেকে খুলে নিল কালো চামড়ার ডেসপ্যাঁচ কেস। শার্টের বোতাম খুলে বুকের ভেতর থেকে টেনে বের করল একটা দোমড়ানো চামড়ার মানিব্যাগ। মণিবন্ধ থেকে সস্তার রিস্টওয়াচটা এমন টান মেরে খুলে আনল যে, দু জায়গায় লম্বা হয়ে গেল বেনটেক্সক্রোম ব্রেসলেট।
উঠে দাঁড়াল হত্যাকারী। কাঁধের ওপর ঝুলিয়ে নিল ডেসপ্যাঁচ কেস। রিস্টওয়াচ আর মানিব্যাগটা পকেটে খুঁজতে গুজতে কান পেতে কি যেন শুনল। না, অরণ্যশব্দ আর বিধ্বস্ত বি.এস.এ. থেকে উত্থিত ধাতব পটপট শব্দ ছাড়া আর কোন আওয়াজ নেই। রাস্তার দিকে এগোল হত্যাকারী। ফিরে চলল যে-পথে এসেছে, ঠিক সেই পথেই–অতি সন্তর্পণে এবং টায়ারের ছাপ বাঁচিয়ে। খানার কাছে নরম মাটির সামনে আরো হুশিয়ার হল খুনে চালক। তারপর এসে দাঁড়াল মোটর সাইকেলের পাশে। একবার শুধু ফিরে তাকাল ঘাসফুল ছাওয়া উপত্যকার দিকে। মন্দ না! পুলিশ-কুকুর ছাড়া এ হত্যা রহস্যের সমাধান করার ক্ষমতা কারো নেই। দশ মাইল রাস্তার তদন্ত করা মানে কয়েকদিনের ব্যাপার। এসব ব্যাপারে ঝুঁকি কখনো নিতে নেই। চল্লিশ গজ দূর থেকেও গুলি চালাতে সে পারত। কিন্তু সাবধানের মার নেই জেনে এগিয়ে এসেছে আরো বিশ গজ। আর ঘড়ি-মানিব্যাগ নেওয়াটা হয়েছে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। বিপথে চালনা করার মোক্ষম ফিনিশিং টাচ।
