দুপুর বারোটা নাগাদ ওখানে থেকে বেরিয়ে পড়লাম। ক্যাপ্টেন স্টোনর বলেছিলেন যে, সাংবাদিকদের হাতে আমার খুব নাজেহাল হবার সম্ভাবনা, তবে তিনি যতক্ষণ সম্ভব তাদের ঠেকাবার চেষ্টা করবেন। জেমস বন্ডের পেশা ও ঠিকানা ছাড়া, তার সম্বন্ধে যা খুশি আমি জানাতে পারি। যেন ঠিক সময়ে এসে পড়েছিলেন এমন একজন ভদ্রলোক, যিনি আবার চলে গেছেন।
আমি স্যাডলব্যাগ গুছিয়ে নিলাম। রক্ষাবাহিনীর তরুণ লেফটেন্যান্ট মরো সেগুলি বেঁধে ছেদে দিলেন এবং ভেসপাটাকে রাস্তায় এনে দিলেন। মাঠ পেরিয়ে যাবার সময় তিনি বললেন, মিস্, এখান থেকে গ্লেন ফল্স পর্যন্ত সড়কের খোদলগুলি নজরে রাখবেন। কতকগুলি এত গভীর যে তাদের কাছে যাবার আগে হর্ন বাজাবেন। এই জাতীয় স্কুটার গিয়ে হয়ত খোদলটার নিচে তখন রয়েছে। আমি হাসলাম। সে পরিচ্ছন্ন হাসিখুশি এবং তরুণ সেই সঙ্গে দুর্দান্ত এবং দুঃসাহসী–তার চেহারা ও চাকরী অনুযায়ী। সম্ভবত, যাকে নিয়ে আমার স্বপ্ন দেখা উচিত, এ সেই জাতের লোকদের কাছাকাছি চরিত্রের!।
ক্যাপ্টেন স্টোনরকে বিদায় জানালাম। তারপর পাছে বোকামিটা ধরা পড়ে যায় সেই ভয়ে মাথায় হেলমেট চড়িয়ে বড় গগলসটা চোখের ওপর টেনে স্কুটারে বসলাম। স্টার্টার চালু করলাম পা দিয়ে। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, ক্ষুদে যন্ত্রটা সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠল। এবার ওদের দেখিয়ে দেব। ইচ্ছে করেই পেছনের চাকাটা তখনো স্ট্যান্ডের ওপর রেখেছিলাম। ক্ষিপ্র হাতে ক্লাচ টিপে দ্রুত ধাক্কা দিলাম সামনের দিকে। ঝুলন্ত পেছনের দিকে চাকাটা ঝুরো মাটির মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ধুলো এবং কাঁকর ছিটকে উঠল। দশ সেকেন্ডের মধ্যে গিয়ার নিয়ে রকেটের মত ছুটে চললাম ঘণ্টায় চল্লিশ মাইল বেগে। সামনের পথ ঠিক আছে দেখে পিছন ফিরে তাকালাম এবং বিদায়সূচক ভঙ্গিতে হাত নাড়লাম।
ধোয়ানো বার-বাড়ির সামনে দাঁড়ানো ছোট পুলিশ বাহিনী তরঙ্গের মত হাত তুলে প্রত্যাভিনন্দন জানাল। দু ধারে প্রহরীর মত পাইনগাছের সারির মধ্যেকার সোজা রাস্তা দিয়ে আমি এগিয়ে চললাম। মনে হল, ক্ষতি স্বীকার না করিয়ে আমাকে ছেড়ে দিতে হচ্ছে বলে ওই তরুশ্রেণীরা যেন বিষণ্ণ।
ক্ষতিহীন? গোয়েন্দাদের ক্যাপ্টেন ক্ষতচিহ্ন বলতে কি বোঝাতে চেয়েছিলেন? তাঁর কথা বিশ্বাস করিনি। আতঙ্কের ক্ষতচিহ্ন সরিয়ে দিয়েছিল, মুছিয়ে দিয়েছিল এই আগন্তুক সে তার বালিশের তলায় পিস্তল নিয়ে শুত। সেই গুপ্তচর যাকে শুধু একটি সংখ্যা দিয়ে চেনা যায়। একজন গুপ্তচর? সে কি করে? তা নিয়ে আমার কোন ভাবনা নেই। একটি সংখ্যা? আমি তো সংখ্যাটা এর মধ্যেই ভুলে গেছি। আমি সঠিক জানি সে কি ছিল, কি করত এবং সব কিছু প্রতিটি বিষয়ের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিবরণও সবকালের জন্য লেখা থাকবে আমার হৃদয়ে।
ফর ইওর আইজ অনলি (পার্ট ১)
ফর ইওর আইজ অনলি — জেমস বন্ড
পাতালপুরীর মায়াবী
এক জোড়া চোখ চওড়া কালো রবার গগলস্-এর পেছনে শীতল চকমকির মতই ঝিকমিক করছিল। ঘণ্টায় সত্তর মাইল বেগে উড়ে চলেছে বি.এস.এ.এম. টোয়েন্টি মোটর সাইকেল, ধেয়ে চলেছে কক্ষচ্যুত উল্কার মত। প্রচণ্ড বেগে ঝন্ঝন্ করে কাঁপছে যন্ত্রযানের ধাতব দেহ, থরথর করে কাঁপছে আরোহীর দেহ, উত্তাল হয়ে উঠছে রক্ত, কিন্তু কাঁপন নেই, চঞ্চলতা নেই, উত্তেজনা নেই–শুধু ঐ দুটি প্রত্যঙ্গে দুটি হিমশীতল চোখ–যা পাথরের মত কঠিন আর চকমকির মতই অগ্নিগর্ভ।
গগলস আচ্ছাদিত স্থির দুই চোখের দৃষ্টি হ্যান্ডেলবারের ওপর দিয়ে সামনে বিস্তৃত অঞ্চল–করাল সে চাহনির সঙ্গে তুলনা চলে কেবল রাইফেলের নলের–কিংবা যেন একজোড়া আতস কাঁচ। যার ফোকাস সুদূরে নিবদ্ধ।
গগলস্-এর নিচে উন্মুক্ত অধরোষ্ঠের ফাঁক দিয়ে হাওয়া ঢুকছে মুখগহ্বরে প্রকট হয়ে উঠছে সারি সারি দাঁত ঠিক যেন দাঁত খিঁচিয়ে হাসছে চালক। এমন কি ঢিবি ঢিবি দাঁতের ওপর দু সারি সাদাটে মাড়িও দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। হাওয়ার ঝাপটায় ফুলে উঠেছে দু গাল। থরথর করে কাঁপছে ছোটার বেগে। লৌহ শিরস্ত্রাণের নিচেই ভয়াল মুখের দু পাশ দিয়ে নেমে এসেছে দীর্ঘ কব্জিবন্ধ আর চামড়ার দস্তানায় আচ্ছাদিত একজোড়া হাত। যেন সুবিশাল কোন পশুর আক্রমণোদ্যত কালো থাবা।
লোকটার পরনে রয়্যাল কোর অব সিগন্যালস-এর ডেসপ্যাঁচ রাইডারের ইউনিফর্ম। অলিভ গ্রীন রঙ করা মোটর সাইকেল। ভালবৃ আর কারবুরেটরের বিশেষ কয়েকটা উন্নতি সাধন আর সাইলেন্সারের কিছুটা অংশ সরানোর ফলে গতিবেগ যেন মুঠোয় এসে গেছে। ঠিক এমন মেশিনই দেখা যায় ব্রিটিশ আর্মিতে। পোশাক আর যন্ত্রন দেখে লোকটার সম্বন্ধে যে ধারণাই মনে আসুক না কেন, তা ভেঙে যায় পেট্রল-ট্যাঙ্কের ওপর ক্লিপ দিয়ে আঁটা একটা গুলি ভরা লাগার রিভলবার দেখে।
মে মাস। সকাল সাতটা। সিধে রাস্তা। দু পাশে জঙ্গল। বসন্তের সকাল। তাই ছোট ছোট আলোকময় কুয়াশা ভাসছে এখানে-সেখানে। পথের দু পাশেই শ্যাওলা আর ফুলের কার্পেটে মোড়া বনতল। দানবাকৃতি ওক গাছের সারি। ভার্সাই আর সেন্ট জার্মেন-এর মায়াবী রয়্যাল ফরেস্ট। বুক ফুড়ে এলিয়ে থাকা সিধে রাস্তাটার নাম ডি-৯৮। এই অঞ্চলের গাড়ি-ঘোড়া যাতায়াত করে এ রাস্তায়। এইমাত্র প্যারিস মন্তেজ-এর মোটর রাস্তা পেরিয়ে এল মোটর সাইক্লিস্ট। সে রাস্তায় মোটর গর্জনের আওয়াজে কান পাতা দায়। সব গাড়িই চলেছে প্যারিসের দিকে। কিন্তু মোটর সাইক্লিস্ট চলেছে উত্তরে সেন্ট জার্মেন-এর দিকে। এদিকে দিগন্ত বিস্তৃত সড়ক, স্নিগ্ধ সবুজ অরণ্য আর আধমাইলটাক সামনে দ্রুত সঞ্চরমান একটি বিন্দু ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছে না।
