আমি আগ্রহ ও বেপরোয়া ভাবটা দেখালেও ভাবছিলাম কি আবার উনি বলতে যাচ্ছেন। আচ্ছা এই কম্যান্ডার বন্ড কি আপনার জন্য কোন নির্দেশ রেখে গেছেন, কোন চিঠিপত্র? তিনি আমাকে বলেছিলেন যে আজ সকালবেলা আপনাকে ঘুমন্ত অবস্থায় রেখে তিনি চলে আসছেন। অর্থাৎ সকাল ছ টা নাগাদ আন্দাজ তিনি চলে গেছেন এবং আপনাকে আর জাগাতে চাননি। খুব ঠিক কথা, নিশ্চয়ই। তবে ক্যাপ্টেন স্টোনর তার সিগারেটের অবশিষ্ট টুকরোটা মন দিয়ে দেখলেন– আপনার এবং কম্যান্ডারের সাক্ষ্য এই মর্মে রয়েছে খুব স্বাভাবিক। গত রাত্রে আপনি আর একা থাকতে ভরসা পাননি। তবে কি জানেন, এটা যেন একটা আচমকা দুম করে বিদায় নেওয়া–ওই রকম একটা উত্তেজক রাত্রির পরে বিশেষ করে। তার সঙ্গে কোন গণ্ডগোল হয়নি আশা করি? তিনি হয়ত…আপনার সঙ্গে সম্পর্কটা স্বাভাবিক করে নিতে অনিচ্ছুক ছিলেন, যদি আমার কথার অর্থটাও বুঝে থাকেন। তার চোখ আমার দৃষ্টি তল্লাসী করছিল। তাঁর দৃষ্টিতে ক্ষমা প্রার্থনার ভঙ্গি।
আমি লজ্জায় একেবারে লাল হয়ে গেলাম। চট করে বললাম, না ক্যাপ্টেন সাহের, মোটেই তা নয়। তিনি আমার জন্য একটা চিঠি রেখে গেছেন, সম্পূর্ণ সোজাসুজি চিঠি। আপনি যা জানালেন তার অধিকও কিছু তাতে ছিল না বলেই আমি চিঠিটার কোন উল্লেখ করিনি। সামনের জিপ খুলে ভেতরে হাত চালিয়ে আরো রাঙা হয়ে ওঠে, চিঠিটা বের করলাম।
তিনি চিঠিটা নিয়ে খুব যত্ন সহকারে সেটি পাঠ করলেন। তারপর ফিরিয়ে দিলেন, ভারি সুন্দর চিঠি। শুধু কাজের কথায় ভর্তি। আমি কিন্তু ওই সাবানের প্রসঙ্গটা খুব ভাল বুঝতে পারলাম না।
সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলাম, ও, সেটা এই হোটেলের সাবান নিয়ে একটা রসিকতা মাত্র। তিনি বলতে চেয়েছেন যে, সাবানটার খুব চড়া গন্ধ।
-তাই বলুন। বটেই তো, বটেই তো৷ তা বেশ ভাল, মিশেল। তার চোখ আবার করুণা হয়ে এল। বেশ এখন তবে…। আচ্ছা যদি ব্যক্তিগত কোন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করি তবে কি আপনার কোন আপত্তি আছে? নিজের মেয়ের মত মনে করে এক মিনিট কথা বলতে পারি? অনায়াসেই আপনি তা পারেন, জানেন প্রায় নাতনীর বয়েসীই হতেন। যদি ঠিক বয়েসে সংসার শুরু করতাম। তিনি আরামদায়ক ভঙ্গিতে হাসলেন।
-না, আপত্তি করার কি থাকতে পারে। আপনি স্বচ্ছন্দে প্রশ্ন করুন যা আপনার খুশি।
ক্যাপ্টেন স্টোনর আরেকটা সিগারেট বের করে ধরালেন।
–আচ্ছা দেখুন মিস্ মিশেল, এখন কম্যান্ডার সাহেব যা বলেছেন তা ঠিকই। আপনি বিশ্রী মোটর দুর্ঘটনার মত একটা ব্যাপারে পড়ে গিয়েছিলেন এবং এ নিয়ে কোন দুঃস্বপ্ন দেখবেন না। কিন্তু এ ছাড়াও আরো অনেক কিছু আছে এতে। আপনি আকস্মিকভাবেই বলতে গেলে, ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে পরিচিত হয়েছেন সমাজের নিচের পাতাল সুড়ঙ্গের অপরাধীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সঙ্গে, যে যুদ্ধ সব সময় চলে আসছে; যে সম্পর্কে আপনারা পড়েন এবং চলচ্চিত্র দেখেন। চলচ্চিত্রের মতই পুলিশ এসে এখানে ডাকাতদের কবল থেকে কুমারীকে উদ্ধার করেছে।
টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে আমার চোখের দিকে তাকালেন।
আমার অধস্তন কর্মচারিদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য যে বিবরণ পেয়েছি তাতে বিশ্বাস করার যথেষ্ট জোরাল কারণ রয়েছে যে গতরাত্রে আপনি কম্যান্ডার বন্ডের সঙ্গে বিশেষ অন্তরঙ্গ একটি যামিনী যাপন করেছেন। এ সব ঘটনার হদিস নেওয়াটা অবশ্য আমাদের কর্তব্যের স্বল্প আকর্ষণেরই দিক। ক্যাপ্টেন স্টোনর তার হাত একত্র করলেন। এখন আমি আর এইসব ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলাতে চাই না; সেটা আমার কাজও না। কিন্তু এটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক প্রায় অনিবার্য যে এই সুদর্শন ইংরেজ যুবকটি, যিনি সদ্য সদ্য আপনার প্রাণ রক্ষা করলেন। আপনি আংশিক বা, সম্পূর্ণভাবে আপনার হৃদয় দান করেছেন। তাঁর পিতৃজনোচিৎ স্মিত হাসির পেছনে যেন ব্যঙ্গ লুকিয়েছিল, সব কিছু ঘটনা বলার। পর উপন্যাসে এবং সিনেমায় তো ঘটে, তাই না? বাস্তব জীবনেই বা ঘটবে না কেন?
কিন্তু সে ভাবনা আপনার বিবেচনার জন্য রেখে যেতে চাই, তা হল, আমি ওয়াশিংটনে কথা বলে কম্যান্ডার বন্ডের এই বিশেষ দিকের কীর্তিকলাপ সম্বন্ধে কিছু কিছু জানতে পেরেছি
যার সারমর্ম এই যে, এইসব লোকেদের কাছ থেকে তফাতে থাকবেন। জেমস্ বন্ড বা স্লাগসি মোরা, যে নামই তাদের হোক না কেন, এরা আপনার জন্য নয়। এরা দুজনেই এবং এদের মত আরো অনেকেই এক গোপন অরণ্যের বাসিন্দা–যার ভেতরে আপনি কয়েক ঘণ্টা কাটিয়েছেন, যা থেকে আপনি নিষ্ক্রান্ত হয়ে এসেছেন। তাই এদের একজনকে নিয়ে সুখস্বপ্ন এবং বিপরীত পক্ষের অন্যজনকে নিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখার আয়োজন করবেন না। এরা আপনার পছন্দের পাত্র থেকে একেবারে আলাদা আলাদা জাতের জীব এরা। ক্যাপ্টেন স্টোনর হাসলেন, বাজপাখি আর কবুতরের মত, অবশ্য যদি তুলনাটার জন্য মার্জনা করেন, বুঝেছেন? আমার মুখের অভিব্যক্তি বেশি ভাবগ্রাহী হতে পারছিল না। তার কণ্ঠস্বর হঠাৎ শোনা গেল, আচ্ছা, তাহলে চলুন যাই।
ক্যাপ্টেন স্টোনর উঠে দাঁড়ালেন। আমিও উঠলাম। কি বলতে হবে মাথায় আসছিল না। হেমটেলের দরজায় জেমস বন্ডকে দেখে আমার তাৎক্ষণিক অনুভূতি মনে পড়ে গেল।
– হে সৃষ্টিকর্তা, এ যে ওদের দলেরই একজন। কিন্তু তার হাসি, তার চুম্বনরাশি, আমাকে বেষ্টন করে তার বাহুপাশের কথাও মনে পড়ল! এই বিশালদেহী, স্বস্তিদায়ক মানুষটি যিনি এই সব মমতাময় ভাবনা নিয়ে এসেছিলেন, তাঁর পাশে পাশে বাধ্য মেয়ের মত হেঁটে যেতে যেতে শুধু যেটুকু ভাবতে পারছিলাম তা হল–দা ড্রিমি পাইনস মোটর কোর্টের লেকে অন্তত একশ মাইল দূরে কোন জায়গায় গিয়ে পেট পুরে একটি মধ্যাহ্নভোজন এবং তারপর একটি সুদীর্ঘ ন্দ্রিা।
