বলিষ্ঠ চেহারার যে ভদ্রলোক এরপর আমার সঙ্গে দেখা করতে এগিয়ে এলেন, তাঁকে দেখতে সর্বাংশে ছায়াছবির গোয়েন্দা বাহিনীর ক্যাপ্টেনের মতই–ধীর চলন, মমতা মাখা মুখ এবং উদ্দেশ্যপূর্ণ হাবভাব। তার সঙ্গে যে সব সহকারী এলেন, পরে দেখা গেল তারা হলেন স্টেনোগ্রাফার।
-মিস্ মিশেল! আমি হলাম ক্যাপ্টেন স্টোনর–গ্লেন ফল্স থেকে আসছি। এক জায়গায় বসেই কথা বললে ভাল হয়, কি বলেন? কোন ঘরে বসবেন, না এই বাইরেতেই কোথাও
-যদি কিছু মনে না করেন, ওই কেবিনের পালা আমার ঢের হয়েছে। ওই ওখানে, আমার ব্রেকফাস্ট টেবিলে চলুন না কেন। এই সঙ্গে আপনার বিবেচনা-বুদ্ধির জন্য আগে আমার ধন্যবাদ গ্রহণ করুন। আমার কোন খাওয়া জোটেনি ওদের আসার আগে পর্যন্ত।
-না, না, ওই ধন্যবাদ আমার প্রাপ্য নয়, মিস মিশেল। ক্যাপ্টেনের চোখ ভাবাবেশ মিটমিট করে উঠল, সেটা আপনার ইংরেজ বন্ধু কম্যান্ডার বন্ডের কৃতিত্ব। পরামর্শটা তিনিই দিয়েছিলেন। তিনি একটু থামলেন, অন্যান্য পরামর্শের সঙ্গে সঙ্গে।
তাই বল। উনি কম্যান্ডার। একমাত্র এই পদটার নামই আমি পছন্দ করি। তাহলে তো ও ক্যাপ্টেনের পিঠ চাপড়ানো পাবেই। একজন ইংরেজ, তার পদাধিকারের কর্তৃত্ব, সি,আই, এ এবং ফেডারাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টন্টিগেশন-এর সংস্থার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি! সাধারণ পুলিশকে এর চেয়ে বেশি বিরক্ত করবে আর কোন জিনিস? আমি ঠিক করলাম যে আমি অত্যন্ত কূটনৈতিক চালে কথা বলব।
আমরা বসলাম। সাধারণ পুলিশী জিজ্ঞাসাবাদের পরে আমাকে ঘটনার বিবরণ দিতে বলা হল।
পাক্কা দুটি ঘণ্টা লাগল বলতে।
ক্যাপ্টেন স্টোনরের প্রশ্নের ফাঁকে ফাঁকে সহকারীরা এসে ঘ্যাসঘেসে গলায় ফিসফিস করে তার কানে কানে কি সব বলে যাচ্ছিল। প্রশ্নোত্তরের পর,আমি একেবারে ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। কফি এল, আমার জন্য সিগারেট (আমি আমার ডিউটিতে থাকার সময় ধূমপান করি না। ধন্যবাদ মিস মিশেল)-কে, তারপর আমরা সবাই বিশ্রাম করলাম। স্টেনোগ্রাফারদের সরিয়ে দেওয়া হল। ক্যাপ্টেন স্টোনর লেফটেন্যান্ট মরোবককে ডাকিয়ে এনে একধারে চলে গেলেন। সদর দপ্তরে প্রাথমিক প্রতিবেদন বেতারযোগে পাঠাবার জন্য। ভাঙা কালো গাড়িটাকে পানি থেকে তুলে খাড়ির উপর এনে, মাঠ দিয়ে টেনে রাস্তার ওপর নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। আমি তাই দেখছিলাম।
অ্যাম্বুলেন্সটা ওই গাড়িটার পাশে নিয়ে যাওয়া হল। একটা ভেজা দলা পাকানো জিনিস সন্তর্পণে থামিয়ে ঘাসের ওপর শুইয়ে দেওয়া হচ্ছে দেখে আমি অন্যদিকে মুখ ঘোরালাম। হরর! আবার সেই শীতল, লাল ছিটওয়ালা চোখজোড়া মনে পড়ে গেল। ওর হাতের স্পর্শ পড়ল। উঃ! সত্যিই কি এসব ঘটেছিল!
ক্যাপ্টেনকে বলতে শুনলাম, প্রতিবেদনের ভাষ্য যাবে আলবেণীর সদর দপ্তরে আর ওয়াশিংটনে। কেমন, ঠিক হয়েছে তো? তিনি এরপর ফিরে এসে আমার বিপরীত দিকে বসলেন।
তিনি সদয় চোখে আমাকে দেখে কিছু প্রশংসাসূচক বাক্য উচ্চারণ করলেন। আমিও সাগ্রহে ও কিছু না বললাম। জিজ্ঞেস করলাম কখন আমি ছাড়া পেতে পারি বলে তিনি ভাবছেন।
ক্যাপ্টেন স্টোনর তক্ষুনি জবাবটা দিলেন না। উত্তরের বদলে তিনি ধীরে-সুস্থে মাথার ওপর টুপিটা খুলে ফেলে টেবিলের ওপর রাখলেন। অস্ত্র সংবরণের ইঙ্গিত, ঠিক সেনাপতিদের মত এই কায়দাটা দেখে মনে মনে হাসলাম। তিনি পকেট হাতড়ে সিগারেট ও লাইটার বের করে আমাকে একটা দিয়ে নিজেরটা ধরালেন, আমার দিকে তাকিয়ে তার প্রথম বেসরকারী সিটি হাসলেন, এখন আমার ডিউটি শেষ, মিস মিশেল। তিনি বেশ আরাম করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বাঁ পায়ের পাতা ডান পায়ের হাঁটুর ওপর তুলে বসলেন। এক হাত পায়ের পাতায় রাখলেন। হঠাৎ তাকে দেখাল, স্বচ্ছলভাবে পরিবার প্রতিপালন করে থাকেন এমন একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোকের মত। সিগারেটে লম্বা একটি টান দিয়ে গলগল করে ধোয়া বের করে, ধোঁয়া ওড়া দেখলেন; তারপর বললেন : এখন থেকে যে কোন সময়ে আপনি যেতে পারেন, মিস্ মিশেল। আপনাকে যত সম্ভব কম কষ্ট দেবার জন্য আপনার বন্ধু কম্যান্ডার বন্ড বিশেষভাবে বলেছেন। আমিও তার উদ্বেগ বুঝে আপনাকে সেই অনুযায়ী জিজ্ঞাসাবাদ করতে পেরেছি বলে খুব আনন্দিত বোধ করছি। আর তিনি অপ্রত্যাশিত রসিকতা ও শ্লেষ মিশিয়ে হেসে বললেন, ওয়াশিংটন এই ব্যাপারে তাদের অভিপ্রায় চাপিয়ে দিক, আমার দরকার নেই।
আপনি ভারি সাহসী মেয়ে। খুব জঘন্য একটা অপরাধের আবর্তে পড়ে গিয়েছিলেন। আর তখন আপনি যেভাবে তার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন, আমি চাই আমার কোন সন্তান যেন সেরকম করতে পারে। ওই দুটো গুণ্ডার নামেই গ্রেফতারী পরোয়ানা ঝুলছে। আমি পুরস্কারের জন্য আপনার নাম সুপারিশ করব। সেই রকম বীমা কোম্পানিকেও সুপারিশ করব। তারা নিশ্চয়ই ঐদার্য দেখাবেন।
ওই ফ্যান্সি দম্পতিকে আপাতত জালিয়াতির ষড়যন্ত্রের মামলায় ফেলা হচ্ছে। আর কম্যান্ডার বন্ড যেমন আভাস দিয়েছিলেন সেই মত দেখছি মিস্টার সান্গুইনেত্তি আজ সকাল থেকে পলাতক। আমরা ট্রয়ে খোঁজ করেছি, যা আমরা করতামই এবং পুলিশের পররাষ্ট্র বিভাগকে তাকে গ্রেফতার করার জন্য সক্রিয় করে তোলা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগ থাকবে, যদি এবং যখন তাকে গ্রেফতার করা হবে, তখন অকুস্থলের সাক্ষী হিসেবে আপনাকে প্রয়োজন হবে। সরকার আপনার আসা যাওয়ার রাহা খরচা, থাকার খরচের যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করবেন। এই আর কি ক্যাপ্টেন স্টোনর সিগারেট ধরা হাত ছুঁড়ে ফেলার একটা ভঙ্গি করলেন, পুলিশের ধরাবাধা নিয়ম, নিজের ধরনেই চলবে। তার চতুর নীল চোখজোড়া সাবধানতার সঙ্গে আমার চোখে দৃষ্টিনিবদ্ধ করল। তারপর আবার অন্তর্মুখী হল। তবে আমার পক্ষে কেসটার সন্তোষজনক উপসংহার হল না।তিনি হেসে বললেন, তার মানে, এখন আমি কর্তব্যরত নই। বলতে গেলে শুধু আপনি আর আমি।
