দু জন রাজ্য রক্ষাবাহিনীর তরুণ এসেছিল। সপ্রতিভ এবং চমৎকার লোক। এরকম মানুষ যে আছে আমি তা ভুলতে বসেছিলাম। যেন আমি রাজবংশোদ্ভূত এভাবে তারা আমাকে অভিবাদন করল মিস্ ভিভিয়েন মিশেল? তাদের মধ্যে যিনি লেফটেনান্ট পদাধিকারী তিনি কথাবার্তা বলছিলেন। আর তার দু-নম্বর তাদের আগমন সম্পর্কে বেতার বার্তা পাঠাচ্ছিলেন।
-হ্যাঁ।
–আমি লেফটেনান্ট মরো। আমরা শুনতে পেলাম যে গত রাত্রে আপনি বিপদে পড়েছিলেন।
তিনি দস্তানা পরা হাত দিয়ে দগ্ধাবশেষ দেখিয়ে বললেন, মনে হচ্ছে যা শুনেছি তা ঠিকই।
–হ্যাঁ, আমি অবজ্ঞাভরে বললাম, হ্রদের মধ্যে মৃতদেহ সমেত একটা ডোবা গাড়ি রয়েছে। আরেকটা মৃতদেহ রয়েছে তিন নম্বর ঘরের পেছনে।
-হ্যাঁ মিস।
তিনি হয়ত আমার কথায় হালকা ভঙ্গিতে আমার আপত্তির কোন ইঙ্গিত দেখতে পেয়েছিলেন। পেছন ফিরে বার্তা প্রেরণরত সঙ্গীর দিকে ফিরে বললেন, ও ড্যামিয়োন, চারদিকটা ঘুরে একবার দেখে নাও না, কি বল? মিস মিশেল আসুন আমরা গিয়ে কোথাও বসি।
লেফটেনান্ট মোটরবাইকের আসনের পাশের ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বের করে বললেন, সামান্য কিছু এনেছি। আপনার ব্রেকফাস্টের জন্য। তবে…শুধু কফি আর বাদাম। এতে চলবে আপনার? তিনি মোড়কটা এগিয়ে দিলেন। তার দিকে তাকিয়ে মুখ আলো করে হাসলাম, অত্যন্ত অনুগ্রহ, আপনার। বেজায় ক্ষিদে পেয়েছে। হ্রদের পারে বসবার জন্য কিছু আসন আছে। যেখান থেকে ডোবা গাড়িটা দেখা যায় না, এরকম কোন বেঞ্চিতে বসি চলুন। ঘাসের ওপর দিয়ে আমি পথ দেখিয়ে নিয়ে চললাম। একটা আসন বেছে নিয়ে আমরা বসে পড়লাম।
লেফটেনান্ট তার পেনসিল ও নোটবুক বের করে যেন কি সব পড়ছেন। এরকম ভান করলেন, যাতে আমি খাওয়া শুরু করতে পারি।
মুখ তুলে তিনি এই প্রথমবার হাসলেন, এখন এসব নিয়ে কোন দুশ্চিন্তা করবেন না। আমি কোন বিবৃতি নিচ্ছি না। সেজন্য ক্যাপ্টেন নিজে আসছেন। যে কোন মুহূর্তে এসে পড়তে পারেন। তারা যখন আমাকে জরুরী তলব করলেন, তখন আমি কিছু কিছু ঘটনা মোটামুটি ভাবে লিখে নিয়েছিলাম। তবে যা নিয়ে আমার দুর্ভাবনার শেষ নেই, তা হল সেই থেকে বেতার নির্দেশের হাত থেকে এক মুহূর্ত বিশ্রাম পাচ্ছি না। ন নম্বর সড়ক দিয়ে এখানে আসতে। আমার বাইকের স্পীড কমাতে হয়েছে, যাতে নির্দেশগুলি পুরো শুনতে পাই। আলবেণীর সদর দপ্তর এই ব্যাপারটায় আগ্রহী, এমন কি ওয়াশিংটনের সর্বোচ্চ পদাধিকারীরাও আমাদের ঘাড়ের ওপর ঝুঁকে পড়েছেন ঘটনার গতিপ্রকৃতি লক্ষ্য করার জন্য। বেতারে এমন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ এ পর্যন্ত কক্ষনো পাইনি। প্লেন ফসে ঘটনার বিবরণ পৌঁছনোর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে খোদ রাজধানী ওয়াশিংটন যে কিভাবে এর সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়লেন, সে সম্বন্ধে কিছু কি এখন বলতে পারেন?
তার আগ্রহের সুরে না হেসে পারলাম না। আমি তাকে প্রায় চেঁচিয়ে ও ড্যানিয়েলকে বলতে শুনলাম, কি আপদ, যে কোন মুহূর্তে আমরা দেখতে পারি যে জ্যাক কেনেডীও আমাদের পেছনে লেগে পড়েছেন। আমি বললাম, দেখুন জেমস বন্ড নামে একজন ভদ্রলোক এতে জড়িত। তিনিই আমাকে রক্ষা করেন এবং এই দুটো গুণ্ডাকে গুলি করেন। তিনি ব্রিটিশ গোয়েন্দা ধরনের বা গুপ্ত বিভাগ বা ওই জাতীয় কোন বিভাগে কাজ করেন। কোন একটা কাজের ব্যাপারে প্রতিবেদন দেবার জন্য তিনি টোরেন্টা থেকে গাড়িতে ওয়াশিংটনে যাচ্ছিলেন। পথে তার টায়ার ফেঁসে যায় এবং এই হোটেলে এসে আশ্রয় নেন। যদি তিনি না আসতেন, তবে এতক্ষণে আমার মৃতদেহ এখানে পড়ে থাকত। যাই হোক, আমার মনে হয় তিনি বেশ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তিনি আমাকে বলেছিলেন যে তিনি সুনিশ্চিত হতে চান যে এই মিস্টার সানুগুইনেত্তি মেক্সিকো বা অন্য কোথাও পালিয়ে না যেতে পারে। তার সম্পর্কে যা জানি তা এই। এছাড়া কিছু বলতে গেলে, বলতে হয় যে তিনি একজন চমৎকার মানুষ। লেফটেনান্ট সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকালেন।
– সেরকমই অনুমান করেছিলাম মিস্। তিনিই আপনাকে বিপদমুক্ত করেন। তবে নিশ্চয়ই তাঁর সঙ্গে ফেডারল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন, মানে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বিভাগের কোন যোগাযোগ আছে; তা না হলে এই জাতীয়। আঞ্চলিক ঘটনার সঙ্গে তারা বড় একটা জড়ান না নিজেদের, যতক্ষণ না তাদের ডাকা হয় বা কেন্দ্রের কোন একটা ব্যাপারে তাতে সায় থাকে।
সাইরেনের তীক্ষ্ণ ধ্বনি উঠেছিল পথ থেকে। লেফটেনান্ট মরো উঠে দাঁড়িয়ে মাথায় টুপি পরে নিলেন, ধন্যবাদ মিস। আমি শুধু নিজের কৌতূহল মেটালাম। এখন থেকে ক্যাপ্টেন এসে দায়িত্ব নেবেন ব্যাপারটার। তিনি ভারি ভাল লোক।
ও ড্যানিয়েল এসে গেল। যদি কিছু মনে না করেন, মিস, বলে ও ড্যানিয়েল নিয়ে লেফটেনান্ট সরে গিয়ে তার সরেজমিন তদন্তের বিবরণ শুনতে লাগলেন। এই ফাঁকে আমিও কফিটা শেষ করে ধীরে ধীরে ওদের পেছন পেছন যেতে যেতে দক্ষিণের দিকে ছুটে চলা ধূসর থান্ডারবোর্ড আর তাই স্টিয়ারিং-ধরা রৌদ্রালোকে তাম্রাভ হাত দুটির কথা ভাবলাম।
পাইন গাছের মধ্যেকার পথ দিয়ে রীতিমত একটি পদাতিক বাহিনী এসে উপস্থিত সৈন্যবোঝাই গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স, দুটি পুলিশের গাড়ি, মাল সরাবার একটি ট্রাক–এরা সব আমাকে পেরিয়ে হ্রদের কাছে এগিয়ে গেল। মনে হল যে এরা প্রত্যেকেই নির্দেশানুযায়ী কাজ করছে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গোটা এলাকাটা জলপাই-সবুজ অথবা গাঢ় নীল পোষাক পরা ভ্রাম্যমাণ মূর্তিতে ভরে উঠল।
