এই ভাঙার শব্দটা যেন আমাকে জড়ত্ব থেকে মুক্তি দিল। আমি চেঁচিয়ে উঠলাম। পাশে হাত ছুঁড়লাম। তবে তাতে কোন কাজ হয়নি। কাঁচের শব্দ তাকেও জাগিয়ে তুলেছিল। তবে আগন্তুকের গুলিকে হয়ত লক্ষ্যভ্রষ্ট করে দিয়েছিলাম। এরপরই জোড়া গুলি বর্ষণের শব্দ হল। আমার মাথার ওপরের দেওয়ালে লাগল সেই গুলি; আবার কাঁচ ভেঙে পড়ল। ওলকপির মত মুখটা সরে গেল।
–তোমার কিছু হয়নি তো, ভিড়? সে খুব ব্যস্ত ও উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল।
আমাকে দেখেই বুঝতে পারল যে আমি অক্ষত। আর কোন উত্তরের অপেক্ষা না করে সে উঠে গেল। বিছানাটা নড়ে উঠল। দরজা খোেলার জন্য–এক ঝলক চাঁদের আলো এসে পড়ল ঘরের মধ্যে। সে এত নিঃশব্দে দৌঁড়াচ্ছিল যে গাড়ি রাখার কংক্রীটে-বাঁধানো জায়গার কোন পায়ের শব্দই উঠল না। মনে মনে তাকে কল্পনা করে নিলাম দেওয়ালের সঙ্গে মিশে এগিয়ে যাচ্ছে। আমি শুধু শুয়ে শুয়ে তাকিয়ে ছিলাম বিস্ফোরিত নয়নে আরেকটা সাহিত্যের কথা, তবে খুব অব্যর্থশাসীর ওই ভাঙা কাঁচের অসমান অংশটা দেখতে দেখতে মনে পড়ছিল সেই ভয়াবহ চকচকে ওলকপি মুণ্ডুটাকে। ওটা নিশ্চয় ভূত। জেমস বন্ড ফিরে এল। একটা কথাও বলল না। প্রথম কাজ করল তা হল এক গ্লাস পানি এনে দেওয়া। খুব গদ্যময় কাজ যা সন্তান দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে উঠলে বাবা-মা প্রথম করেন। পানি খাবার পর মনে হল রক্তাভ গুহা, ভূত-টুত, এবং পিস্তলের পটভূমি থেকে ঘরটা যেন আবার তার সুপরিচিত রূপে ফিরে এল। এরপর একটা তোয়ালে নিয়ে, ভাঙা শার্সীর নিচে একটা চেয়ার রেখে তার ওপর দাঁড়িয়ে জানালার ওপর উঠে জানালাটা তোয়ালে দিয়ে ঢেকে দিল।
তার উলঙ্গ শরীরে বিশ্রামমগ্ন অজস্র পেশী সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠলাম। বললাম, জেমস্ কখনো শরীরে চর্বি জমিয়ো না।
সে তোয়ালেটাকে পর্দার মত করে টাঙিয়ে দিল। চেয়ার থেকে নেমে অন্যমনস্কভাবে বলল, নাঃ ঠিকই, চর্বি। জমানো মোটেই উচিৎ নয়।
চেয়ারটাকে টেবিলের পাশে ঠিক আগের জায়গায় রেখে দিয়ে, টেবিলের ওপর রাখা পিস্তলটা তুলে নিল। পিস্তলটা পরীক্ষা করল। এবার সে তার পরিচ্ছদের বান্ডিলটার কাছে দিয়ে পুরোনো ক্লিপটা বদলে নতুন একটা ক্লিপ লাগিয়ে পিস্তলটা বালিশের নিচে চালান করে দিল।
সে যে কেন ওভাবে শুয়েছিল, তা এইবার বুঝতে পারলাম। অনুমান করলাম, সে বরাবরই ওভাবে ঘুমায়। তার জীবন যেন অনেকটা দমকল কর্মীদের মত–সব সময় প্রতীক্ষা করে যাওয়া, কখন ডাক পড়বে। বিপদকেই কাজ। হিসেবে নেওয়াটা যে কি অসাধারণ, সে কথাই ভাবতে লাগলাম।
সে এসে এবার ধারের বিছানায় বসল। চুঁইয়ে আশা চন্দ্রালোকে তার মুখের রেখাগুলি টানটান দেখাচ্ছিল। যেন কোন ঝাঁকুনিতে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সে হাসতে চেষ্টা করল, কিন্তু শক্ত রেখাগুলি মোলায়েম হল না, কোন রকমে একটা বঙ্কিম রেখা পড়ল মাত্র। সে বলল, আবার আমি আমাদের দুজনের মৃত্যু প্রায় ডেকে আনছিলাম। দুঃখিত। ভিড়। নিজের ধারণাটা হারিয়ে ফেলছি। এভাবে চললে বিপদকেই ডেকে আনব। মনে করে দেখ, গাড়ি যখন পানিতে পড়ে গেল, তখন তার ছাতি এবং পেছনের জানালাটা পানির ওপর জেগে ছিল না কি? ভেতরের ওই কোণে যথেষ্ট হাওয়া আটকে থাকতে পেরেছিল। সেদিকে নজর না দেওয়াটা আমার পক্ষে ডাহা আহম্মকের কাজ হয়েছে। এই স্লাগসি মক্কেলের কেবল পেছনের জানালা ভেঙ্গে পারে সাঁতরে ওঠার ওয়াস্তা। সে একাধিকবার গুলির কাট খেয়েছে। তার পক্ষে এটা কষ্টসাধ্যই। কিন্তু সে আমাদের কেবিনে এসে পৌঁছেছিল। আমরা এতক্ষণে মরে ভূত হয়ে যেতাম। ভোরবেলা পেছন দিকে ঘুরতে-টুরতেও যেও না। তাকে দেখাটা এখন খুব প্রীতিকর হবে না।
সে ভরসা দেবার জন্য আমার দিকে তাকাল। যাই হোক, আমি খুব দুঃখিত, ভি এটা আবার ঘটা কখনোই উচিত ছিল না।
বিছানায় হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে আমি দু হাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলাম। তার শরীর সুশীতল। আমি তাকে আলিঙ্গন পাশে বেঁধে নিয়ে চুমু খেলাম, বোকার মত কথা বল না জেমস্! আমি যদি না থাকতাম, তবে তোমাকে এত ঝঞ্ঝাটে জড়িয়ে পড়তে হত না। আর তুমি না থাকলে, এখন আমি কোথায় থাকতাম? শুধু যে মরেই ভূত হয়ে যেতাম তা নয়, কয়েক ঘণ্টা আগেই পুড়ে ঝলসেও যেতাম। তোমার অসুবিধা এই যে তুমি যথেষ্ট ঘুমোতে পারনি। তোমার শরীর কি ঠাণ্ডা! আমার বিছানায় এস। আমি তোমাকে সেঁকে দিচ্ছি। আমি তার পা ধরে টানলাম।
সে আমাকে নিজের কাছে আকর্ষণ করে নিল। দু-হাত দিয়ে আমার শরীরকে বেষ্টন করে নিজের সঙ্গে সজোরে পিষে ফেলল। ওইভাবে কিছুক্ষণ আমাকে চুপচাপ ধরে রাখল। আমার শরীর থেকে তার দেহ আস্তে আস্তে তাপ সংগ্রহ করে উষ্ণ হয়ে উঠতে দেখলাম। তারপর সে আমাকে তুলে, আলতো করে বিছানায় বসিয়ে দিল। তারপর সে আমাকে আদিম বন্যতায়, প্রায় নিষ্ঠুরভাবে টেনে নিল। আর একবার আমার ভেতর থেকে যেন কার কাতর চিৎকার উঠে এল। আমরা পাশপাশি শুয়েছিলাম। আমার যুগল স্তনে তার বুকের উত্তাল শব্দ আছড়ে পড়ছিল। আমার ডান হাত তার চুলের মধ্যে ঢুকে মুঠো করে ধরেছিল এক গোছা চুল।
আমি আমার মুষ্টিবদ্ধ আঙুল শিথিল করলাম। তার হাত ধরলাম। বললাম, আচ্ছা জেমস, বিম্বো মানে কি?
–কেন?
–বলই না। পরে তোমাকে বলব।
