কাজগুলি শেষ করে সে আমার পাশে এসে শুল। তার দুই হাত, ওষ্ঠাধার কি ধীর অথচ বৈদ্যুতিক স্পর্শে ভরা। আমার আলিঙ্গনের মধ্যে তার শরীরকে মনে হচ্ছিল অনুভবে স্নেহময় কিন্তু সক্রিয়তায় দারুণ হিংস্র।
সে আমাকে বলেছিল যে চরম মুহূর্তে আমি নাকি চেঁচিয়ে কেঁদে উঠেছিলাম। আমার কিন্তু ওরকম কোন কথা মনে পড়ে না। আমি শুধু মনে করতে পারছি যে, একটা অন্তর্ভেদী মাধুর্যের গহ্বর যেন আকস্মিকভাবে উন্মুক্ত হয়ে আমাকে গ্রাস করে নিল। আমি ডুবে গেলাম। তার গায়ে হাতের নখ বসিয়ে দিয়ে যেন নিশ্চিন্ত হতে চেয়েছিলাম যে সেও আমার সাথী হবে এই প্লাবনে। এরপর সে ঘুম-ঘুম আলস্যে আমাকে মধুর কিছু বলেছিল, আমাকে একবার চুমু খেয়েছিল। তারপর তার দেহ আমার শরীর থেকে তুলে নিয়ে স্থির হয়ে শুয়ে পড়ল। আমিও চিৎ হয়ে শুয়ে লোহিতাভ অন্ধকার দেখতে দেখতে তার শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শুনতে লাগলাম।
এর আগে আমি আর কখনো এ স্বাদ পাইনি–পূর্ণাঙ্গ মিলন, আমার সব হৃদয় ও শরীর নিয়ে। ডেরেকের সঙ্গে ব্যাপারটি ছিল মিষ্টি, কুরর্টের সঙ্গে তা ছিল শীতল অথচ তৃপ্তিদায়ক। কিন্তু এই ঘটনাটা কিছু আলাদা। শেষ পর্যন্ত আমি বুঝলাম যে, এরকম কিছুও কারো জীবনে ঘটতে পারে।
কেন যে এই মানুষটির কাছে এত সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করতে পারলাম তার কারণ আমি জানি। মাত্র ছ ঘণ্টার আলাপে কিভাবে আমি এ-কাজে সমর্থ হলাম। তার চেহারার উত্তেজক আকর্ষণ ছাড়াও তাঁর কর্তৃত্ব, তাঁর পৌরুষ সে যে রূপকথার রাজপুত্রের নাম না জানা ভূগোলবিহীন কোন দেশ থেকে এসেছিল, আমাকে ড্রাগনের হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। তার কাছে আমি এখন মৃত। সৃষ্টিকর্তা জানেন আমার পক্ষে কতটা ভোগান্তির ব্যাপার ঘটেছিল। সে তো গাড়ির চাকা বদলে তো একা নিজের চামড়া বাঁচাতে পারত। বরং সে আমার জীবনের জন্য এমনভাবে লড়াই করেছে। যেন সেটা ওর নিজের জীবনের জন্য লড়ছে এবং তারপর ড্রাগনটা যখন নিহত হয়েছে, সে পুরস্কার হিসাবে নিয়েছে আমাকে। জানতাম, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সে চলে যাবে–কোন প্রেমনিবেদন না করে। এই তো সব কিছুর উপসংহার–বিদায়। নটে গাছটি মুড়োল।
কি বোকাই না মানুষ হতে পারে? আমার পাশে শায়িত এই নগ্ন পুরুষটিকে নিয়ে অত নাটকীয়তা করা কি যে থাকতে পারে? সে তো একজন পেশাদার গুপ্তচর মাত্র, সে তার কর্তব্য পালন করেছে। বন্দুক ছুঁড়তে আর মানুষ খুন করতে তাকে শেখানো হয়েছে। তাতে চমৎকারিত্বটা কোথায়? সাহসী, শক্তিশালী, নারীসঙ্গে নির্মমতার ডাক পড়ে তো এই গুণগুলির জন্যই। এজন্য সে বেতনভোগী কর্মচারি।
সে বলতে গেলে শুধু একধরনের গুপ্তচর মাত্র–যে গুপ্তচর আমাকে ভালবেসেছিল, আমার হৃদয়ের আগন্তুক। না, ভালও বাসেনি, সহবাসে লিপ্ত হয়েছিল। কেন তাকে আমার নায়ক হিসেবে বরণ করে নিতে যাব, কেন অঙ্গীকার করব কখনও না বিস্মৃত হবার? হঠাৎ একটা ঝোঁক এল যে জাগিয়ে প্রশ্ন করি তুমি কি সুন্দর হতে পার না? পার না সহৃদয় হতে?
পাশ ফিরে শুলাম। সে ঘুমোচ্ছিল। শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছিল। ছড়ানো বা হাতের উপর মাথা রেখে, ডান হাত বালিশের নিচে রেখে সে অকাতরে ঘুমোচ্ছিল। বাইরে চাঁদ আবার জ্যোত্স সুধা বর্ষণ করতে লাগল। লাল পর্দার মধ্যে চুঁইয়ে আসতে লাগল সেই লাল চন্দ্রালোক। আধো ঘুমে ভরা চোখে আমার মনে হল–কেন এই আয়োজন। বাইরের বাতাস শান্ত হয়ে এসেছিল, কোন শব্দ হচ্ছিল না। অলসভাবে চোখ তুলে ওপরে তাকালাম। ঘরের এই প্রান্তে, আমাদের বিছানার ওপর পর্দাটা নিথর।হ্রদের দিক থেকে ধীর সমীর বয়ে এসে থাকবে। আসুক! স্বর্গের নামে বলছি; আয় ঘুম!
হঠাৎ উল্টোদিকের দেওয়ালে উঁচুদিকে কি একটা ছিঁড়ে ফেলার শব্দ হল। পর্দার একটা ধার কাৎ হয়ে ঝুলতে লাগল। একটা চকচকে বড় ওলকপির মত ফ্যাকাসে মুখ চাঁদের আলোর মধ্যে কাঁচের ভেতর দিয়ে তাকাল!
গায়ের লোম কাটা দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল, সে অভিজ্ঞতা কখনো হয়নি। বরাবর ধারণা ছিল সেটা লেখকদের বানানো। কানের কাছে বালিশের ওপর একটা আঁচড়ানোর শব্দ পেলাম। রাত্রির বিশুদ্ধ বাতাস আমার মাথায় এসে ছুঁয়ে গেল।
আমি চেঁচিয়ে উঠতে চাইছিলাম, কিন্তু চেঁচাবার কোন ক্ষমতা ছিল না। আমার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেন জমাট বেঁধে গিয়েছিল, আমি আমার হাত পা কিছুই নাড়তে পারছিলাম না –এই সব উক্তিকেও আমি কাল্পনিক বলেই ভাবতাম। কিন্তু দেখলাম তা তো নয়। আমি শুধু শুয়ে তাকিয়ে রইলাম–আমার শারীরিক অনুভূতি লক্ষ্য করছিলাম–এমন কি অমন চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকার জন্য যে চোখ ব্যথা হয়ে আসছিল–তাও লক্ষ্য করছিলাম। কিন্তু একটা আঙুল নাড়াবারও ক্ষমতা ছিল না। ওই বই থেকেই আর একটা বর্ণনা ধার করে বলছি–আমি হয়ে পড়েছিলাম আতঙ্কিতা, অসাড়, কাঠের মত অসাড়।
জানালার শার্সীর পেছনে মুখটা হাসিতে ভরে উঠল। জন্তুদের মত দাঁতের পাটি বের হয়ে হাসছিল, চেষ্টা করে। দাঁত চোখ এবং কেশহীন মাথার ওপরে জ্যোৎস্না এসে পড়ায় মনে হচ্ছিল সেটা যেন শিশুর মুখের প্রতিচ্ছবি।
সেই ভৌতিক মুখখানা ধীরে ধীরে ঘুরে সারা ঘর তাকিয়ে দেখল, সাদা ফরসা বিছানায় বালিশে মাথা রেখে যুগল। শরীর শায়িত।
দেখে সে থামল। তারপর আস্তে আস্তে চেষ্টা করে চকচকে ধাতুনির্মিত কি একটা জিনিস ধরে হাতটা মাথার কাছে তুলল এবং নিচের দিকে কাঁচের শাসীটা ভেঙে ফেলল।
