রোগা লোকটাকে লক্ষ্য করছিলাম। সে প্রায় বাড়িটার কোণে এসে পড়েছিল। এখন সেখানে এসেছে। স্লাগসির একটা করে গুলি ছোঁড়া বন্ধ হল। কোন লক্ষ্য না করে অর্ধবৃত্তাকারে বাঁ হাত দিয়ে পুরো ম্যাগাজিন খরচ করে এক পশলা গুলি ছুঁড়ল কোণে, সামনের দেওয়ালের নিচের জায়গাটার যেখানে আমি ও জেমস্ বন্ড দাঁড়িয়েছিলাম।
যখন প্রত্যুত্তরে কোন গুলি ছুটে এল না সে সাপের মত কোণার দিকে সামনে পেছনে মাথা ঝাঁকাল তারপর উঠে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে ইঙ্গিত করে দেখাল যে আমরা চলে গেছি।
ঐ-রকম সময়ে দুটো পরস্পর গুলির শব্দ এল এক নম্বর ঘরের দিক থেকে। তারপরই রক্ত হিম করে দেওয়া তীব্র একটা আর্ত চিৎকার এল, যা আমার হৃৎপিণ্ডকে প্রায় থামিয়ে দিয়েছিল আর কি। স্লাগসি ছুটে বেরিয়ে মাঠের মধ্য দিয়ে দৌড়তে লাগল, ডান হাত দিয়ে ওর পাছার সঙ্গে লাগান মেশিনগান থেকে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে। ওর বাঁ হাতটা শরীরের পাশে ঝুলছিল। সে দৌড়ে যন্ত্রণায় চিৎকার করছিল, তবু ঘন ঘন গুলি ছুঁড়ে চলছিল মেশিনগান থেকে। তারপরই গাড়ি রাখার জায়গায় আলোর ঝলকানি দেখা গেল এবং ভারি স্বয়ংক্রিয় বন্দুকের নল থেকে গম্ভীর প্রত্যুত্তর আসতে শুরু করল। স্লাগসি ওর নিশানা ঠিক করে নিল। জেমস বন্ডের আগ্নেয়াস্ত্র নীরব হয়ে গেল। এরপর অন্য একটা জায়গা থেকে আবার তার অস্ত্র গর্জন করে উঠল, একটা গুলি নির্ঘাৎ এসে মেশিনগানটায় লেগেছিল কারণ স্লাগসি হঠাৎ সেটা ফেলে দিয়ে কালো গাড়িটার দিকে ছুটতে লাগল, সেখানে রোগা লোকটা নিচু হয়ে দুটো বন্দুক দিয়ে দূর পাল্লার গুলি ছুঁড়ে প্রতিরক্ষার আবরণ তৈরি করে রেখেছিল। সাব মেশিনগানটার যন্ত্রে নিশ্চয়ই জেমস্ বন্ডের গুলিতে কিছু গণ্ডগোল বেঁধেছিল, কারণ মাটিতে পড়ে যাওয়া সত্ত্বেও সেটা থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি বেরিয়ে আসছিল। ঘাসের মধ্যে দিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল সেই গুলি, তখন রোগা লোকটা গাড়িটার চালকের আসনে এসে বসল। ইঞ্জিন চালু হতে শুনলাম। পেছনের এগজস্ট দিয়ে কিছু ধোঁয়া বেরুল। সে পাশের দরজাটা খুলে ধরল, স্লাগসি এসে ঢুকে পড়ে। গাড়িটা চলা শুরু করা মাত্র দরজাটা বন্ধ করে দিল।
আমি জেমস্ বন্ডের জন্য আর অপেক্ষা করলাম না। ছুটে রাস্তায় এসে পড়লাম এবং গাড়িটার পিছনদিকে গুলিবর্ষণ করতে লাগলাম। গাড়ির সামনের জানালা থেকে গুলি আসছিল। হঠাৎ গাড়িটা এলোমেলো ভাবে চলতে লাগল। আচমকা একটা লম্বা বাঁক নিয়ে মাঠে জেমসের দিকে ছুটে চলতে লাগল। এক মুহূর্তের জন্য হেড লাইটের উজ্জ্বল আলোয় তাকে ওখানে দণ্ডায়মান দেখা গেল, তার নগ্ন বক্ষদেশ ঘামে চকচক করছে। সেখান থেকে দ্বন্দ্ব যোদ্ধার মত সে গুলি ছুঁড়ল, যেন তেড়ে আসা ষাড়ের দিকে গুলি করছে। ভেবেছিলাম সে গাড়িতে চাপা পড়বে। আমি ছুটে ঘাস পেরিয়ে তার দিকে যাচ্ছিলাম। ততক্ষণে গাড়িটা ঘুরে শেষ গিয়ার সম্বল করে গোঁ গোঁ করতে করতে সোজা হ্রদের দিকে ছুটে গেল।
আমি স্তম্ভিত হয়ে দেখলাম, ওখানে ঘাসে ঢাকা মাঠটা শেষ হয়েছে একটা বিশ ফুট উঁচু ছোট পাহাড়ের দুর্গম গায়ে গিয়ে। নিচে মাছ ধরার পুকুর। বনভোজন করতে যারা আসে তাদের জন্য কিছু টেবিল চেয়ার পাতা আছে। গাড়িটা ছুটে চলল। কোন বেঞ্চিতে লাগুক বা না লাগুক এর গতির জন্য নিশ্চিত এটা হ্রদে গিয়ে পড়বে। কিন্তু এটা চেয়ার গুলিতে লাগল না। ভয়ার্ত উত্তেজনায় ঠোঁটে হাত চাপা দিলাম, গাড়িটা কিনারা ঘেঁষে পানির মধ্যে ধাতু কাঁচের শব্দ এবং দারুণ আলোড়ন তুলে নামল। তারপর ধীরে ধীরে নাকটা নিচু করে ডুবে যেতে লাগল। এগজস্ট দিয়ে বেরুল গ্যাস বুদবুদ হয়ে উঠছিল ওপরে। শেষ পর্যন্ত গাড়িটার ছাদ এবং মাঝখানের একটু অংশ ছাড়া কিছুই রইল না ভেসে। পেছনের জানালাটা আকাশের দিকে মুখ করে উঠেছিল।
বন্ড বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকাল। এবং এক হাতে আমার কটিদেশ বেষ্টন করে নিয়ে শক্ত করে টেনে। নিল কাছে। অনির্দিষ্টভাবে বলল, না? আমি ঠিক আছি। সে হ্রদের দিকে তাকাল। সম্ভবত ড্রাইভার মানে রোগা লোকটার গায়ে গুলি করেছি। ও মরেছে। ওর শরীরটা অ্যাকসিলারেটরের উপর চেপে গিয়েছিল। মনে হল, সে আত্মগত হয়ে পড়েছিল। হেসে বলল, বেশ, সেটা নিশ্চয়ই পরিস্থিতিটা –পরিষ্কার করে দিয়েছে। কম্বলের টুকরোটা তো পাওয়া যেত না। মৃত ও কবরস্থরা একত্রে যাবে। দুঃখিত হয়েছি–একথা বলতে পারি না। এরা একজোড়া আসল দাগী। সে আমাকে ছেড়ে পিস্তলটা খাপে ভরে রাখল। তার গা থেকে বারুদ এবং ঘামের গন্ধ বেরুচ্ছিল। কি সুস্বাদু। সেই গন্ধ। আমি কাছে গিয়ে তাকে চুম্বন করলাম।
আমরা ফিরে ঘাসের উপর দিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটছিলাম। আগুনটা আস্তে আস্তে জ্বলছিল, যুদ্ধক্ষেত্র এখন প্রায়। অন্ধকারাচ্ছন্ন। আমার ঘড়িতে সাড়ে তিনটে বেজেছিল। হঠাৎ আমি অনুভব করলাম যে আমি যেন সম্পূর্ণভাবে, চূড়ান্তভাবে নিঃশেষ হয়ে গিয়েছি। যেন আমার ভাবনার প্রতিধ্বনি করে জেমস বন্ড বলল, এতক্ষণে বেলজিড্রেনের কার্যকারিতা শেষ হয়েছে। খানিক ঘুমিয়ে নিলে কেমন হয়–চার পাঁচটা ঘর এখনও আস্ত আছে। দুই আর তিন নম্বর ঘর দুটো কেমন হবে? ও দুটো পছন্দ হবে তো?
