জেমস বন্ড হাসল, আবার দুঃখ প্রকাশ করছি, ভিভূ! আমার চিন্তা-ভাবনা আজ রাতে সপ্রতিভ হচ্ছে না। নাঃ, শুধরে নিতে হবে। সে থামল, এখন এসো এক মিনিট ভেবে নিই।
এই মিনিটটা খুব দীর্ঘস্থায়ী হল। জ্বলন্ত বার-বাড়ির আগুনের তাপে আমি ঘামছিলাম এবং সামনের ফটকের টিকে থাকা যে অংশটার পেছনে আমরা আত্মগোপন করেছিলাম সেটা এবং উত্তরের দেওয়ালটা কেবল এখনও দাঁড়িয়ে ছিল। বাকিটা জুড়ে বিশাল এক অখণ্ড অগ্নিকুণ্ড। হাওয়া আগুনকে দক্ষিণ দিকে নিয়ে যাচ্ছিল, কাজেই আমার মনে হল যে এদিকটা, বাড়ির এই শেষ অংশটা বেশ কিছুক্ষণ রেহাই পেয়ে যাবে। বেশিরভাগ কেবিনেই পুড়ে যাচ্ছিল এবং ওই ক্লিয়ারিং-এর দিকটাই স্ফুলিঙ্গ ও আলোর ঝলকানি কম দেখাছিল। মনে হল অনেক মাইল দূর থেকে, এমন কি লোক জর্জ বা স্নেগ-ফলস্ এর থেকে এই অগ্নিকাণ্ড দৃশ্যমান হতে পারে। তবু সাহায্যের জন্য কেউ এগিয়ে এল না। সম্ভবত সড়কের ভ্রাম্যমাণ পুলিশ-বাহিনী এবং দমকল বাহিনীর হাতে ঝড়ের তাণ্ডবের জন্য যথেষ্ট কাজ জমে গেছে। এবং তাদের প্রিয় অরণ্যানী সম্পর্কে তারা ভেবে থাকবে যে কোন আগুনই এই বর্ষণসিক্ত তরু প্রাচীর পেরিয়ে আসতে পারবে না।
জেমস বন্ড বলল, এখন আমরা যা যা করতে যাচ্ছি তা হল, প্রথমত আমি চাই যে, তুমি এমন জায়গায় থাক যেখান থেকে তুমি সাহায্য করতে পার এবং তোমার জন্য আমাকে কোন দুর্ভাবনা করতে না হয়। অন্যথায়, যদি এদের মতলব বুঝে থাকি, এরা তোমার ওপরই মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করবে আর তোমাকে আঘাতের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে আমি বরং এদের ছেড়ে দিতেও রাজি আছি।
–সত্যি?
–বোকার মত কথা বলল না। তাই তুমি এই বাড়িটার আড়াল দিয়ে গিয়ে রাস্তায় গিয়ে থাকো। ওদের গাড়িটার দিকে গিয়ে না পড়া পর্যন্ত আত্মগোপন করে যাবে। শক্ত হয়ে ওখানে দাঁড়াও, যতক্ষণ না গুলি ছুঁড়তে বলি। ঠিক তো?
-কিন্তু তুমি কোথায় থাকবে?
-এখানে যাকে বলে আরলর অভ্যন্তরীণ রেখা, আমরা সেখানে আছি–যদি গাড়িগুলিকে নির্দিষ্ট বস্তু বলে ধরে নিই। আমি এখন কাছে পিঠে থাকব যাতে ওরা আমার দিকে এগিয়ে আসে। ওরাই আমাদের খুঁজবে এবং তারপর চম্পট দেবে। ওরা চেষ্টা করুক। সময় ওদের বিপক্ষে।
সে ঘড়ির দিকে তাকাল, এখন প্রায় তিনটে বাজে, ভোরের আলো ফুটতে আর কতই বা দেরি?
-প্রায় দু-ঘন্টা। পাঁচটা নাগাদ। কিন্তু ওরা সংখ্যায় দু জন এবং এখানে তুমি থাকবে একা! ওরা, ওই যাকে বলে সাঁড়াশি অভিযান, তাই চালাবে।
–ওদের মধ্যে একজনের তো থাবাটা জখম হয়েছে। সে যাই হোক বড় গোছের পরিকল্পনা বলতে এটাই করতে পারি। তাদের নতুন কোন আক্রমণ শুরু করার আগেই তুমি রাস্তাটা পেরিয়ে যাও। আমি ওদের ব্যস্ত রাখছি।
সে বাড়িটার কোণের দিকে চলে গেল এবং ঘুরে এক পাশে দাঁড়িয়ে ডানদিকের ঘর লক্ষ্য করে দ্রুত দু বার গুলি চালাল। দূরে কাঁচ ভেঙে পড়ার শব্দ হল, তারপরই সাংঘাতিকভাবে সাবমেশিনগানের গুলি আসতে লাগল। বাড়ি পেরিয়ে, রাস্তা পেরিয়ে গাছের সারির দিকে গুলি ছুটতে লাগল। জেমস্ বন্ড পেছিয়ে এসেছিল। সে উৎসাহপূর্ণ গলায় বলল, এইবার!
আমি দৌড়ে ডানদিক দিয়ে বার-বাড়িটাকে আমার ও ওই ঘরগুলির মধ্যে রেখে রাস্তা পেরিয়ে গেলাম এবং তরুশ্রেণীর মধ্যে আত্মগোপন করলাম। আরেকবার ওরা আমার উদ্দেশ্যে গুলি ছুঁড়ল, কিন্তু এতক্ষণে আমার পায়ে জুতার ফিতে বেঁধে নিয়েছি। ওভারলের কাপড়টাও বেশ মজবুত ছিল। আমি বনের মধ্যে ঢুকে বাঁ দিকে এগোলাম। যখন মনে হল যে বেশ খানিকটা এসে পড়েছি তখন অগ্নিশিখার আলোর দিকে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে যেতে লাগলাম। এভাবে যেখানে যেতে চাইছিলাম, সেখানে এসে থামলাম–অর্থাৎ ওদের কালো গাড়িটার কাছে প্রথম যে গাছের সারিটা গেছে তার মধ্যে। জায়গাটা রাস্তার ওপাশ থেকে প্রায় হাত চল্লিশেক দূরে এবং এখান থেকে অগ্নিময় যুদ্ধক্ষেত্রের দৃশ্য পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল।
যখন এসব হচ্ছিল, আকাশে তখন সঞ্চরমান মেঘমালার মধ্যে চাঁদ লুকোচুরি খেলছিল-ফলে সব কিছু উজ্জ্বলভাবে আলোকিত হয়ে উঠেছিল, পরে আবার সেই আলো নিভে যাচ্ছিল। বার-বাড়ির বাঁ দিকের পানিও অর্ধাংশ থেকে যে পরিবর্তনশীল আভা এসে পড়ছিল, তাই শুধু–থাকছিল। এখন চাঁদ পরিপূর্ণভাবে মেঘমুক্ত হয়ে আমাকে এমন কিছু দেখাল যার ফলে আমি প্রায় চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিলাম। রোগা লোকটা সরীসৃপের মত বুকে হেঁটে বার-বাড়ির উত্তরদিকে এগিয়ে যাচ্ছিল; ওর হাতের বন্দুক জ্যোত্সায় চকচক করছিল।
আমি সেখান থেকে একা চলে এলাম, জেমস্ বন্ড সেখানেই রয়েছে। আর তাকে সেইখানেই ব্যস্ত রাখার জন্য স্লাগসি ক্রমাগত গুলি ছুঁড়ছিল। কয়েক মুহূর্ত পর পরই রোগা লোকটা যেদিকে এগিয়ে যাচ্ছে সেদিকের দেওয়ালে এসে। লাগছিল। সম্ভবত জেমস্ বন্ড এই ক্রমাগত গুলিবর্ষণের ফিকিরটা আন্দাজ করতে পেরেছিল। সে বুঝতে পেরে থাকবে যে এর অর্থ তাকে এক জায়গায় আটকে রাখা। কারণ, সে বদিক দিয়ে বাড়িটার জ্বলন্ত অর্ধাংশের দিকে এগিয়ে। যাচ্ছিল। সে দৌড়াতে শুরু করল, মাথা নিচু করে, বাদামী হয়ে ওঠা ঘাসে এবং কুণ্ডলী পাকানো ধোয়া এবং ফুলকির। রাশি পেরিয়ে আঁধারে পরিণত? আগুন নিভে আসা বা-দিকের ঘরের সারির দিকে। পনের নম্বর ঘরের কাছের গাড়ি রাখার জায়গাটা আমি একবার তাকে চকিত দর্শন পেলাম। তারপর তাকে দেখা গেল না। খুব সম্ভব পেছনের গাছপালার মধ্যে সে ঢুকে পড়েছে, পথ করে এগিয়ে গিয়ে স্নাসিকে পেছন দিক থেকে ধরার জন্য।
