আমি তিন নম্বর ঘরের সংলগ্ন গাড়ি রাখার জায়গায় গিয়ে পৌঁছলাম এবং এবড়ো-খেবড়ো পাথরের দেওয়ালের গায়ে ঘসটে ঘসটে অন্ধকারের মধ্যে পথ করে চললাম। খুব সতর্কতার সঙ্গে তিল তিল করে শেষ কয়েক ফুট এগিয়ে গেলাম এবং কোণের দিকে তাকিয়ে অন্যান্য ঘরগুলি ও বার বাড়ির মৃত্যুপরী অগ্নিশিখা ও ছায়া দেখতে পেলাম।
কেউ সেখানে ছিল না যে দেখতে পাব। লেলিহান বহ্নিশিখার তরঙ্গ ছাড়া অন্য কোন চঞ্চলতা ছিল না। থেকে থেকে বাতাস এসে ওই–অগ্নিলীলাকে সজীব রাখছিল। এর মধ্যে ধারে কাছের গাছগুলিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ছিল। গাছপালার শুকনো ডাল-পালাগুলিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ায়, তার থেকে ফুলকি উড়ে যাচ্ছিল অন্ধকারের মধ্যে। ঝড়ের জন্য না হলেও একটা দাবানাল নিশ্চয় শুরু হয়ে যেতে পারত এবং হাতে ভাঙা লণ্ঠন নিয়ে চামড়ার জ্যাকেট পরা একটি মেয়ে নির্ঘাৎ এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তার স্মৃতিচিহ্ন রেখে যেত। বায়ুপ্রবাহ এ-ব্যাপারে একে কতটা দূরে যেতে সাহায্য করত–দশ মাইল? বিশ মাইল? কতগুলি গাছ ও পাখি, জীবজন্তুকে, কুইবেক থেকে আসা ওই মৃত মেয়েটি ধ্বংস করেছিল?
আরেকটা ঘরের ছাদ ভেঙে পড়ল এবং সেই কমলা রঙের অজস্র ফুলকি উড়তে লাগল। এখন বার-বাড়ির কাঠের ছাদটার পালা। ছাদটা আস্তে নিচে নামল এবং পরে খারাপভাবে রান্না করা ডিমের পুডিংয়ের মত, নিভে গেল। আরও ফুলকি ফুর্তি করে উড়ে যেতে যেতে মিলিয়ে গেল। আগুনের অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসে রাস্তার পাশেই দণ্ডায়মান গাড়ি দুটোকে দেখা গেল। ধূসর থান্ডারবার্ড এবং কালো লম্বা গাড়িটা–তখনও না ওই গুণ্ডা দুটো, না জেমস বন্ড-কারুরই দর্শন পাওয়া যাচ্ছিল না।
হঠাৎ মনে পড়ে গেল যে সময়ের কথা আমি বেমালুম ভুলে গেছি। ঘড়ি দেখলাম। দুটো বেজেছে। মানে পাঁচ ঘণ্টা ধরে এই সব শুরু হয়েছিল তা কয়েক সপ্তাহ মনে করাটাও বিচিত্র হত না। আমার আগেকার জীবন যেন অনেক অনেক বছর দূরে সরে গেছে। এমন কি গতকালের বিকেলবেলা–যখন বসে বসে জীবনের স্মৃতি রোমন্থন করছিলাম–তাও মনে করা কষ্টকর হয়ে উঠছিল। সব কিছুই যেন মুছে গেছে। ভয়, ব্যথা এবং বিপদ তার জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। এ যেন একটা জাহাজ ডুবি না ট্রেন অথবা বিমান দুর্ঘটনা অথবা ভূমিকম্প বা ঘূর্ণিঝড়ের পরবর্তী অবস্থা। এসব দুর্দৈব। অবস্থায় পড়লে সবার পক্ষে এরকমই হত। জরুরী আপকালীন অবস্থার কৃষ্ণপক্ষে আকাশে আবৃত হয়ে গিয়ে ভূত ভবিষ্যৎ যেন লোপ পায়। প্রত্যেকটা মিনিট, প্রত্যেকটা মুহ-জ্ঞানে অতিবাহিত করতে হচ্ছে, যেন সেটা জীবনের শেষ সীমান্ত। শুধু সেই স্থান ও কাল ছাড়া যেন অন্য কোন সময় বা জায়গা নেই।
এরকম সময়ে লোক দুটোকে দেখতে পেলাম। দুজনের প্রত্যেকেই একটা করে বাক্স হাতে নিয়ে ঘাসের ওপর দিয়ে আমি যেখানে ছিলাম সেদিকে আসছিল। বাক্স দুটো ছিল টেলিভিশন সেটের। সেই দুটো ওরা নিশ্চয়ই বাঁচিয়েছে, যাতে সেগুলি বিক্রি করে কিছু নগদ পয়সা পাওয়া যায়। ওরা পাশাপাশি হাঁটছিল। রোগা এবং বেঁটে লোক দুটো। জ্বলন্ত কেবিন দুটো থেকে আলোর আভা ওদের ঘর্মাক্ত মুখে চকচক করছিল। ওরা ফাঁকা পথটার অঙ্গারে পরিণত খিলানের পাশ দিয়ে তাড়াতাড়ি যেতে যেতে প্রজ্বলন্ত বার-বাড়িটার দিকে তাকাল সে জ্বলন্ত ছাদটা ওদের দিকে হেলে পড়বে কিনা। জেমস বন্ড কোথায়? ওদের হাত এখন জোড়া, এটাই তো ওদের ধরার প্রকৃষ্ট সময়।
আমার কাছ থেকে এখন ওরা চল্লিশ হাত দূরে, ডাইনে ঘুরছে গাড়ির কাছে যাবার জন্য। আমি খুঁড়িমেরে গাড়ি রাখার জায়গার অন্ধকারে খোদলে ঢুকে গেলাম। কিন্তু জেমস্ কোথায় গেল? একাই ছুটে গিয়ে পাকড়াও করব কি? আহাম্মকী করো না! যদি লক্ষ্যভ্রষ্ট হই, আর নিশ্চিত তা হব, তাহলেই আমি খতম! এখন মুখ ঘোরালে কি আমাকে দেখতে পাবে? আমার সাদা ওভারঅল কি অন্ধকারে দৃষ্টিগোচর হবে? আরো পেছিয়ে গেলাম। এখন ওরা আমি যে গাড়ি ঘরটায় রয়েছি তারই সামনের চৌকা খোলা উঠোনে উঠে এসেছে তৃণপথ থেকে। বার-বাড়ির এখনও অটুট উত্তর : দিকের দেওয়াল থেকে কয়েক হাত দূরে। ওই দেওয়ালটার এখনও বেশি আগুন জ্বলেনি। শিগগীরই ওরা কোন দিকে বেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাবে এবং একটা সুবর্ণ সুযোগও হাতছাড়া হয়ে যাবে সেই সঙ্গে।
এবার ওরা থামল, হাতে ধরা জিনিসটা ছিলই। ওদের দু জনের মাঝ বরাবর জায়গায় পিস্তল দৃঢ়ভাবে তাক করে জেমস ওদের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছেন। চাবুকের মত ওরা গলা আছড়ে পড়ল তৃণচ্ছাদিত মাঠে।
-ঠিক হ্যায়। এই ব্যাপার তবে! ঘুরে দাঁড়াও! যে প্রথম টেলিভিশন সেট নামাবে হাত থেকে, তাকেই গুলি করব। তারা আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়াল। ওদের মুখ আমার লুকোনোর জায়গার দিকে ফিরল। এরপর জেমস্ আমাকে ডাকল, ভিড়, বেরিয়ে এস! আমার লোক দরকার।
আমার ওভারলের কোমরবন্ধ থেকে ভারি রিভলবারটা বের করে নিয়ে ঘাসের ওপর দিয়ে ছুটে গেলাম। লোক দুটো হাত-বিশেকের মধ্যে আসতেই জেমস নির্দেশ দিল, ঠিক ওখানে দাঁড়িয়ে পড় ভিভ, এরপর যা করতে হবে বলব। আমি থেমে গেলাম। জোড়া শয়তানের মুখ দুটো আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। রোগা লোকটার দাঁতগুলো বিস্ময়ে হতচকিত হয়ে বেরিয়ে পড়েছিল আকৰ্ণবিস্তৃত হাসির মতই। স্লাগসি এরগাদা–শাপান্ত করে চলছিল। ওর পেটের সামনে ধরা টেলিভিশন সেটের দিকে আমি তাক করে ধরেছিলাম পিস্তলটা, কথা বন্ধ কর, নইলে গুলি করে মারব, বললাম, স্লাগসি নাক কোঁচকালে–তুমি আবার কে? গুলির শব্দে মূৰ্ছা যাবার ভয়ে।
