তারপর গায়ের শার্টটা খুলে বিছানার কাছে একটা চেয়ারের ওপর মেলে দিলাম। আরেকটা প্রয়োজনীয় ধাপ্পা, যা বুঝিয়ে দেবে যে শার্টের মালিক বিছানায় শুয়ে আছে–আর তেলের বাতির পলতেটা কমিয়ে বিছানার কাছেই রাখলাম যাতে যদি গুলি ছোড়ে তার নিশানা ঠিক হয়। খুব অপটুভাবে দরজার নিচে কাগজের মণ্ড পাকিয়ে কীলক তৈরি করে রাখলাম এবং স্বাভাবিক আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি বশে যেন চেয়ারটা টেনে দরজার ওপর দিয়ে রাখলাম। তারপর আমার ব্যাগটা বাইরের গাছপালার মধ্যে রেখে অপেক্ষা করতে লাগলাম। বলে জেমস্ বন্ড হাসলেন, ওরা আমাকে একটি ঘণ্টা সময় দিয়ে, ফিরে এসেছিল–এত নিঃশব্দে যে কিছু শুনতে পাইনি। তারপর দরজা খোলার এবং জিনিসপত্র পড়ার দ্রুত শব্দ হল–ওরা শব্দহীন পিস্তল ব্যবহার করেছিল।
-তারপর ঘরের ভেতরটা থার্মাইট বিস্ফোরণে উজ্জ্বল আলোকিত হয়ে উঠল।
আমি ভেবেছিলাম খুব চালাকির চাল চেলেছি। কিন্তু দেখা গেল যে খুব চালাক হবার অন্তত ধারে কাছে যাইনি আমি। গাছপালার মধ্যে দিয়ে তোমার ঘরে যেতে আমার প্রায় পাঁচ মিনিট লাগল। কোন উদ্বিগ হয়নি। আমি ভেবেছিলাম তোমার ঘরে ঢুকতেও ওদের এরকমই সময়ই লাগবে। আর তোমার পিস্তল ছোঁড়ার শব্দ পেলেই আমি গিয়ে পড়ব ঠিক করেছিলাম। কিন্তু বিকেলের দিকেই কোন সময়ে, যখন স্লাগসি কেবিনগুলি দেখতে বেরিয়েছিল বলে তুমি আমাকে বলেছিলে, তখন সে তোমার কেবিনের জামা-কাপড়ের কাবার্ডের দেওয়ালের ওপাশ থেকে একটা গর্ত করে রেখে গিয়েছিল। শুধু প্লাস্টার বোর্ডের আস্তরণটুকু না কাটে। পরে একটা ধারাল ছুরি দিয়ে কেটে গর্তটা সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করার জন্য।
ওরা পাথরটা আলতোভাবে দিয়ে থাকতে পারে আবার নাও থাকতে পারে। তা জানি না। তবে যাই হোক, তার দেবার কোন দরকার ছিল না। আট নম্বর ঘরের গাড়ি রাখার জায়গায় যাবার মত কোন কারণই আমাদের কারুর ঘটেনি। যদি তুমি এখানে থাকতে তবে ওরা দেখত যাতে তুমি ওদিকে গিয়ে না পড়। যাই হোক, তোমার কেবিন থেকে থার্মাইটের আলো দেখে আমি প্রথম ব্যাপারটা জানতে পারি। তারপরই আমি প্রাণপণে এগোই গাড়ি রাখার জায়গার পেছন দিকের খালি অংশ ধরে। ওরা ওই সারি বরাবর ঘরে ঘরে বোমা ছেড়ে, তারপর দরজাটা যত্ন করে বন্ধ করে যায়, যাতে সব কিছু নিখুঁত হয়।
এতক্ষণ জেমস বন্ড থেকে থেকে, প্রজ্জ্বলিত ঘরের সারির ওপর দিয়ে, মাথা উঁচু করা বৈঠকখানা বাড়িটার দিকে তাকাচ্ছিল। এবার সে বলল, ওরা ওটাতেও ধরিয়েছে। ওদের পেছনে এবার লাগতে যেতে হচ্ছে। তোমার কেমন লাগছে ভিভ গুমোট লাগছে না তো? মাথাটা ভার লাগছে না তো?
আমি অধীর স্বরে বললাম, না, না, আমি ঠিক আছি। তবে জেমস, তোমার ওদের পেছনে ধাওয়া না করলেই নয়? ওদের যেতে দাও। ওরা থাকলে কি এসে যায়? তুমি আহত হতে পার।
সে দৃঢ়স্বরে বলল, তা হয় না। ওরা আমাদের দুজনকেই প্রায় খুন করে ফেলেছিল আর কি। এখন থেকে যে কোন সময়ে ওরা ফিরে এসে দেখবে যে ভেসপাটা উধাও হয়েছে। তখন হতচকিত করে দেবার উপাদানটা আর আমার হাতে থাকছে না। আর এ নিয়ে ওদের ছেড়ে দেওয়া যায় না। ওরা পেশাদার খুনে। আগামীকালই ওরা আর কাউকে খুন করতে যাবে। সে উৎফুল্লভাবে হাসল, তাছাড়া ওরা আমার শার্টটারও সর্বনাশ করেছে!
তবে আমাকেও সাহায্য করতে দাও। আমি তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম। আর খুব সাবধানে চলবে, কেমন? তোমাকে ছাড়া কিছু করতে পারব না। আমি আবার একা হয়ে যাব।
আমার প্রসারিত হাতটা সে তেমন লক্ষ্য করল না। সে প্রায় নিরুত্তাপ গলায় বলল, লক্ষ্মী মেয়ে, হাত ধরে ঝুল না। একটা ব্যাপার আছে। আমাকে যেতেই হবে। এটা একটা কর্তব্য। তখন সে স্মিথ অ্যান্ড ওয়েসেনের তৈরি পিস্তলটা আমাকে দিল। গাছপালার মধ্য দিয়ে তুমি তিন নম্বর ঘরের গাড়ি রাখার জায়গায় আস্তে আস্তে চলে যাও। ওখান থেকে নিজে লুকিয়ে থেকে সব কিছু দেখতে পাবে। যদি তোমার সাহায্যের দরকার হয় তবে তোমাকে ঠিকই খুঁজে নেব। কাজেই স্থান ত্যাগ কর না। আমার ডাক শুনলে তাড়াতাড়ি ছুটে আসবে। যদি আমার কিছু হয়ে যায় তবে হ্রদের ধার থেকে যতটা পার এগিয়ে যেও। এই অগ্নিকাণ্ডের জন্য আগামীকাল পুলিশ থেকে অনেকে এখানে এসে পড়বে। তখন ফিরে এসে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ কর। তারা তোমার কথা বিশ্বাস করবে। যদি তারা তর্ক করে তবে তাদের বলে তারা যেন ওয়াশিংটনে সি.আই.এ.–অর্থাৎ সেন্ট্রাল ইনটেনিজেন্স এজেন্সিকে ফোন করে। প্রচুর কর্মতৎপরতা দেখাবে। শুধু বললো আমি কে ছিলাম। আমার পোশাকে একটা নম্বর লাগানো আছে–অভিজ্ঞান সংখ্যা। সেটা হল ০০৭–জিরো জিরো সেভেন–এটা ভুলে না যেতে চেষ্টা করো।
.
পিস্তলের শব্দ
আমি ছিলাম, বল আমি কে ছিলাম… ও কেন এরকম কথা বলতে গেল! সৃষ্টিকর্তা অথবা নিয়তি যিনিই আজকে এই রাতকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকুন না কেন, তার চিন্তা মনের মধ্যে ছাড়িয়ে দিল।
জেমস্ বন্ড অবশ্য লঘুভাবেই কথাটা বলেছে। অনেকটা এই আঙুলে কি ভেবেছি জাতীয়, বা ইউরোপে শী করার সময় যেমন সবাই উত্রাইর বরফের উপর দিয়ে যাত্রা শুরু করার আগে বন্ধুদের বলে, ঘাড় মটকে আসবে, প্রার্থনা করি।
পা ও ঘাড় ভেঙে এসো বলে বন্ধুদের শুভেচ্ছা জানানোর অন্তলীন আকাক্ষাটা হচ্ছে দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য, অশুভ দৃষ্টির বিপরীত শক্তিকে জাগরিত করা। জেমস্ বন্ড শুদ্ধ ইংরেজ হবার জন্য হয়ত একটা সাধারণ কথা ছুঁড়ে দিয়েছে আমাকে অনুরূপভাবে উৎসাহিত করার জন্যই। তবে মনে হচ্ছে, আহা যদি ও কথা না বলত। পিস্তলের গর্জন, গুণ্ডা, খুনের চেষ্টা–এগুলো ওর কাজের অংশ, ওর জীবনেরও অংশ। কিন্তু সেগুলি তো আর আমার জীবনেরও অংশ নয়। আমি তাই আরেকটু অনুভূতি প্রবণ, আরেকটু মানবিক না হবার জন্য ওকে দায়ী করলাম। এখন সে কোথায়? অগ্নিশিখার লেলিহান বিস্তারের আড়ালে আড়ালে ছায়া-বিছানো পথ দিয়ে সে কি এগিয়ে চলেছে, বিপদের জন্য তার অনুভূতিকে সজাগ করে আলো নিয়ে? আর শত্রুরা কি করছে? তারা কি ওৎ পেতে অপেক্ষা করছে? এখনই-ই হঠাৎ পিস্তলের গর্জন শোনা যাবে? তারপর আর্তনাদ।
